বুদাপেস্টে ধ্রুপদি সিনেমার ম্যারাথনে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

মাথার সিঁথি দানিউব

পর্ব ১
মধ্য ইউরোপের দেশ হাঙ্গেরি। স্থলবেষ্টিত দেশটির ওপরে স্লোভাকিয়া। ডানে ইউক্রেন ও রোমানিয়া। নিচে সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়া। বাঁ দিকে স্লোভেনিয়া ও অস্ট্রিয়া। দেশটির মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী দানিউব। হাঙ্গেরির লোকজন একে দুনা নদী বলে ডাকে। চমৎকার শান্ত এই নদী আবার দ্বিখণ্ডিত করেছে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টকে। নদীর পশ্চিম তীরে পার্বত্য অঞ্চলটি পরিচিত বুদা নামে আর পূর্বের সমতল পরিচিত পেস্ট নামে। দুয়ে মিলে বুদাপেস্ট।

ছবির মতো দেশটিতে আসার আমন্ত্রণ পাই চলচ্চিত্র সমালোচকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ফিপ্রেসির (FIPRESCI) সুবাদে। এবার সংগঠনটির শতবর্ষ উদ্‌যাপিত হচ্ছে। বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফিপ্রেসির সাধারণ সভা। ফিপ্রেসির বাংলাদেশ অধ্যায় ইফক্যাবের (IFCAB) সহকারী সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি আমন্ত্রিত হয়েছি। ফিপ্রেসির সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি থাকায় একই সঙ্গে আমন্ত্রণ পাই হাঙ্গেরির ন্যাশনাল ফিল্ম ইনস্টিটিউটেরও। তাদের তত্ত্বাবধানে প্রতিবছরই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বুদাপেস্ট ক্ল্যাসিকস ফিল্ম ম্যারাথন। ধ্রুপদি চলচ্চিত্রকে পুনরুদ্ধার ও প্রদর্শন করা হয় এই ম্যারাথনে। ২০২৫ সালের অষ্টম আসরে তারা আমাকে উদ্বোধনী তথা গালা অনুষ্ঠানে থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। সেই সুবাদে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে চিরযৌবনা, কার্পাথিয়ান অববাহিকায় পাহাড়-পর্বতে ঘেরা, ঊনবিংশ শতক ও আধুনিক কালের অপূর্ব স্থাপত্যকলার সহাবস্থানের অন্যতম নিদর্শন, পশ্চিম ও পূর্ব ইউরোপের সংস্কৃতিকে একত্রে ধারণ করা হাঙ্গেরিতে আমার পদার্পণ।

বিজ্ঞাপন

বুদাপেস্টের আকাশে চক্কর কেটে কেটে যখন আমিরাতের বায়ুযান নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই নিচে তাকিয়ে দেখেছি মাথার সিঁথির মতো দানিউবকে। চোখে পড়েছে তার পারে দেশটির সংসদ ভবন। কী অপরূপ মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। উড়োযানে পাশের আসনে বসা ছিল তরুণ দম্পতি। আলাপে জানলাম তারা রোমানিয়ার। মধুচন্দ্রিমা করতে গিয়েছিল মালয়েশিয়া। বুদাপেস্টের বিমানবন্দরে নেমে দুই ঘণ্টার যাত্রা করে বাড়ি ফিরবে। তাদের ফেরা, আর আমার আসা। বিমানবন্দরে নেমে লাগেজ সংগ্রহ করতে একটুও সময় ব্যয় করতে হয়নি। মুদ্রা ভাঙাতেও কোনো সমস্যা হয়নি। ভাবলাম, বাহ, এত তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে সব, আমার কপাল তো এমন হওয়ার কথা নয়। আমার সব ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো ঝামেলা হবেই। একটু পরই চিন্তামুক্ত হলাম। কারণ, ঝামেলা উপস্থিত হলো। একেবারে এক্সিট পয়েন্টে দেখি দাঁড়িয়ে আছে ওদের ইমিগ্রেশন পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

এক নারী পুলিশ আমাকে আটকে বলল, ‘পাসপোর্ট দেখাও।’ জানতে চাইল, ‘কোত্থেকে এলে?’
বললাম, বাংলাদেশ থেকে।
বলল, ‘ও, দুবাই হয়ে এসেছ? আসো, আমার সঙ্গে আসো। একটু পরীক্ষা–নিরীক্ষা করতে হবে।’
আমি মনে মনে আশ্বস্ত হলাম। যাক, সব ঠিকঠাকই এগোচ্ছে। ঝামেলা হবে না আমার সঙ্গে, সেটা কী করে সম্ভব?
তো ভদ্রমহিলা বাংলাদেশি পাসপোর্ট আর আমাকে দেখেই উত্তেজিত হয়ে গেছে, সে আমি বেশ বুঝতে পারছি। জিজ্ঞেস করল, ‘অ্যালকোহল আছে?’ বলতে চাচ্ছিলাম, সেকি, এই বিমানবন্দরেই পার্টি শুরু করে দেবে আমার সঙ্গে? কিন্তু বললাম, দুঃখিত, নেই। কত অর্থকড়ি এনেছি, লাগেজের ভেতর অস্ত্রপাতি আছে কি না! আরে, আমাকে দেখতে কি দুবাইয়ের অস্ত্র ব্যবসায়ীর মতো লাগে? বললাম, আমি ছাপোষা লেখক, লোকে ফিল্ম ক্রিটিক বলে। তোমাদের ফিল্ম ইনস্টিটিউটের দাওয়াতে এসেছি। এবার ভদ্রমহিলার ঠোঁটে হাসি ফুটল; কিন্তু মন গলল না। বলল, ‘ব্যাগ খোলো।’ ভাগ্যিস, শুধু ব্যাগই খুলতে বলেছে। যাহোক আমি লাগেজ খুলে দিলাম। পিয়ানোর রিডের ওপর যেভাবে পিয়ানিস্টের হাত নেচে বেড়ায়, তার হাতের আঙুলও আমার লাগেজের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াল। এরপর সঙ্গে থাকা ছোট ব্যাগটিও ছাড় পেল না। ভদ্রমহিলার উত্তেজনার পারদ নিম্নগামী হলে সে আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিল।

মূল বিমানবন্দর এলাকা থেকে বেরিয়েই দেখি মোবাইল ফোনের সিমের দোকান। ৯ হাজার হাঙ্গেরিয়ান ফরিন্ত বা হাফ দিয়ে সিমকার্ড কিনলাম। চিন্তা করলাম, রাত ও পরের দিন সকালের জন্য খাবার একবারে কিনে নিই। পাশেই ছিল সুপারশপ। চিকেন ম্যাকারনি, কিছু বেকারি আইটেম, কলা কিনে নিলাম। এর ভেতর হোয়াটসঅ্যাপে দুবার ফোন চলে এসেছে। মারিয়ানা কল করছে। ফিপ্রেসি গেস্টদের যাতায়াতের বিষয়টি ও দেখভাল করছে। ফোন ধরলে জানাল, আমার জন্য গাড়িচালক অপেক্ষা করছে। দোকান থেকে বেরিয়ে দেখি আসলেই আমার জন্য একজন দাঁড়িয়ে, হাতে নাম লেখা কাগজ। কাছে যেতেই অমায়িক হাসিতে জানাল, তার নাম থমাস। আমি দুঃখ প্রকাশ করে বললাম, আগেই বের হতাম, কিন্তু ভেতরে ইমিগ্রেশন অফিসাররা আমার সঙ্গে গল্পটল্প করল। থমাসের সেন্স অব হিউমার দেখলাম ভালোই। আমাকে বলল, ‘তোমার কাছে মারিজুয়ানা আছে কি না জিজ্ঞেস করেনি?’ বললাম, বোতল পর্যন্ত নেমেছিল।
ছবি ১: বুদাপেস্টের মাটি ছুঁয়েছে উড়োযান

আমাকে থমাস নিয়ে গেল সাদা রঙের পোর্শের কাছে। দেখি গাড়িতে লাগানো রয়েছে বুদাপেস্ট ক্ল্যাসিকস ফিল্ম ম্যারাথনের লোগো। থমাস বলল, ‘তুমি চাইলে সামনেও বসতে পারো।’ আমি সামনে ওর সঙ্গেই বসলাম। আধা ঘণ্টার পথ। পেস্টের পাহাড়ি এলাকা পেরোতে পেরোতে থমাস দেখিয়ে দিচ্ছিল হ্যান্ডবল ও ফুটবল স্টেডিয়াম। বলল, হাঙ্গেরিতে নাকি হ্যান্ডবল বেশ জনপ্রিয়।

হোটেলে নেওয়ার জন্য ম্যারাথন কর্তৃপক্ষের পাঠানো গাড়িতে উঠছেন লেখক
হোটেলে নেওয়ার জন্য ম্যারাথন কর্তৃপক্ষের পাঠানো গাড়িতে উঠছেন লেখক

কিছু সময় পর আমাদের গাড়ি দানিউব নদীর সমান্তরালে চলতে লাগল। ওই পারে, বুদাতে, দেখি পুরোনো আমলের বনেদি সব ভবন। দেখলেই মনে হয় কত শত ইতিহাস ইটের পরতে পরতে আগলে দাঁড়িয়ে আছে এরা। চোখে পড়ল ওদের বিখ্যাত পার্লামেন্ট ভবন। দানিউবের বুকে লোহার বক্ষবন্ধনীর মতো চেইন ব্রিজটা দেখাল থমাস। ১৮৪৯ সালে তৈরি করা এ সেতুটিই দানিউব নদীর ওপর করা প্রথম স্থায়ী ব্রিজ, যা বুদা ও পেস্টকে ধরে রেখেছে। নদীর ওপর পরে আরও সেতু হয়েছে, তবে এটিই সবচেয়ে প্রাচীন। দেখতেও রাজকীয় লাগে একে।

আমার এক রাতের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে ভারকের্ট এলাকার ১৭ নম্বর সাকিনে। পরের দিন চলে যাব রুমবাখ হোটেলে। সেখানে থেকেই বৈঠক ও ম্যারাথন উপভোগ করব। থমাসের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চলে এলাম ভারকের্টের অ্যাপার্টমেন্টে। বাড়িটি বেশ পুরোনো। লিফট তো কম করে হলেও ১০০ বছরের পুরোনো হবে। মুরগির খাঁচার মতো দরজা টেনে লাগিয়ে ওঠানামা করতে হয়। লাগেজসহ একজনই দাঁড়াতে পারে, এত কম জায়গা। চতুর্থ তলায় ওঠার পর ১৪ নম্বর ফ্ল্যাটটিতে ঢুকলাম। ছোট্ট, কিন্তু গোছানো। ঢুকতেই ডানে রান্নাঘর, বাঁয়ে স্নানাগার ও প্রক্ষালনের স্থান। সামনে আরেকটি দরজা ঠেলে দিলেই শোবার ঘর। ডাবল বেডের ওপর একটা কাঠের বাঙ্ক বেড। ঘরের সজ্জা দেখে মনে পড়ে হাঙ্গেরি কত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে অবগাহিত হতে হতে আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। ঘরটার ভেতর টাঙানো পেন্ডুলামের ঘড়ি, চেয়ার, বইয়ের তাক—সবকিছুর ভেতর সাবেকিয়ানার ছাপ স্পষ্ট। দুটো জানালার পর্দা সরিয়ে তাকালাম বাইরের দিকে। শেষ বিকেলের কমলা আলো। আর সেকেলে ভবনটির ভগ্নদশা, কিন্তু কী গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বুদাপেস্টে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল কেল্টরা, সেই মধ্যযুগে। এরপর রোমানরা শাসনভার নিল। আজকের বুদাপেস্টে প্রতিষ্ঠা করল তাদের নগরী আকুইনকাম। শুরুটা হয়েছিল প্রথম খ্রিষ্টাব্দে, রোম সাম্রাজ্য পাহারা দেওয়ার নিমিত্তে দানিউব নদীর তীরে প্রথমে সামরিক ঘাঁটি নির্মিত হয়। পরে ধীরে ধীরে তারা নগর গড়ে তোলে। সেখানে বাড়িঘরের পাশাপাশি বাণিজ্য ও সংস্কৃতিও জমে উঠতে থাকে। কাজেই বলা যায়, সেই দুই হাজার বছর আগে রোমানদের প্রভাব, এরপর নানা রাজার হাত ঘুরে ষোড়শ শতাব্দীতে অটোমান সাম্রাজ্যের দখলে আসে হাঙ্গেরি। দেড় শ বছরের শাসনকালে তারাও ব্যাপক প্রভাব রেখে যায় স্থাপত্যকলায় এবং বলা বাহুল্য নয়, গোসলখানায়। তাদের পর সপ্তদশ শতকে অস্ট্রিয়া করায়ত্ত করে হাঙ্গেরিকে। অধীন জনতা ধীরে ধীরে নিজেদের স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে থাকলে, কিছুটা আপস করে অস্ট্রিয়ার হাবসবুর্গ শাসকেরা। শুরু করে দ্বৈত রাজতন্ত্রের, যেটি অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান মনার্কি নামে পরিচিত। ১৮৬৭ সালে আরও স্বায়ত্তশাসন পেতে থাকে হাঙ্গেরি। বুদা, পেস্ট ও অবুদা—তিন এলাকা একত্র হয়। ঊনবিংশ শতকে এই অঞ্চল হয়ে ওঠে আধুনিক ইউরোপের অনন্য স্থান।

কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভুল দল বেছে নিয়েছিল হাঙ্গেরি বা তৎকালের অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান মনার্কি। তারা জার্মানি, অটোমান সাম্রাজ্য ও বুলগেরিয়ার সঙ্গে জোট বাঁধে। জোটের নাম হয় কেন্দ্রীয় শক্তি বা সেন্ট্রাল পাওয়ার। যুদ্ধটা লাগে এলাইড পাওয়ার বা মিত্রশক্তির ফ্রান্স, ব্রিটেন, রাশিয়া, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র—এদের সঙ্গে। যুদ্ধে কেন্দ্রীয় শক্তি পরাজিত হলে ভেঙে যায় অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। তারা নতুন দেশ পায় বটে, তবে বিশাল ক্ষতি স্বীকার করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের খেসারত হাঙ্গেরিকে দিতে হয় ট্রাইয়ানন চুক্তির মাধ্যমে। অর্ধেকের বেশি জায়গা ও জনপদ ছেড়ে দিতে হয় হাঙ্গেরিকে। যেমন ট্রানসিলভেনিয়া চলে যায় রোমানিয়ার দখলে। স্লোভাকিয়া ও কার্পেথিয়ান রুথেনিয়া চলে যায় চেকোস্লোভাকিয়ায়। ক্রোয়েশিয়া-স্লাভোনিয়া, বুর্গেনল্যান্ডও চলে যায় প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে। কাজেই দেশের অর্ধেকের বেশি হারিয়ে, দেশের জনগণ হারিয়ে, এক ক্ষুদ্র দেশে পরিণত হয় হাঙ্গেরি। সে জন্য ট্রাইয়ানন চুক্তির দিনটি হাঙ্গেরীয়দের কাছে এক ট্র্যাজেডির দিন।

নদীর দুই তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বুদা ও পেস্ট
নদীর দুই তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বুদা ও পেস্ট

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি হাঙ্গেরির। প্রথমে তারা জার্মানদের অধীন যায়, পরে তারা রাশিয়ার হস্তগত হয়। ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরীয় গণ–অভ্যুত্থান ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। অভ্যুত্থানকে দমন করা হলেও, তার মধ্য দিয়ে সোভিয়েত আধিপত্য খর্ব হয়। এরপর ১৯৮৯ সালে শান্তিপূর্ণভাবে তারা সমাজতন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত হয়, যা আজও তারা অব্যাহত রেখেছে।
বোঝাই যাচ্ছে কত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজকের হাঙ্গেরি দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ভেতর এত এত সংস্কৃতির মিশেলের কারণটাও বোঝা যায় ইতিহাসের দিকে তাকালে। এ জন্যই তাদের স্থাপত্যবিদ্যা, সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্র এতটা সমৃদ্ধ।

আমার প্রাচীন ভবনের জানালা দিয়ে এ ভবনেরই আরেকটা অংশ দেখা যায়। টালি দিয়ে ছাউনি দেওয়া ছাদ। চিমনি বেরিয়ে আছে। তার ওপর কয়েকটি কবুতর। ভবনের বাইরের দেয়ালের কিছু অংশ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। অনেক পুরোনো বাড়ি। এদের গোসলখানা ও টাট্টিখানা একই সঙ্গে। হাঙ্গেরীয় টাট্টিখানা দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ। এমন কমোডের কথা শুনেছিলাম প্রথম স্লোভেনিয়ার দার্শনিক স্লাভয় জিজেকের মুখে। মানে এদের কমোডের ছিদ্র থাকে সামনের দিকে। এই প্রথম নিজের চোখে দেখলাম। এক বক্তৃতায় জিজেক বলছিলেন, ইউরোপের মূল বা বড় তিন জাতি সভ্যতার মানসিক গড়ন বোঝা যায় তাদের কমোড দেখে। ফরাসিদের কমোডে ছিদ্র থাকে পেছনে, অর্থাৎ কমোডে বসার পর আমাদের গুহ্যদ্বারের সরাসরি। যাতে পুরীষ নির্গমনের সঙ্গ সঙ্গই তা গহ্বরে পানির সঙ্গ মিলিয়ে হারিয়ে যায়। অন্যদিকে জার্মানদের কমোডে মল নিষ্কাশনের ছিদ্র থাকে সামনে, মলদ্বারের উল্টো দিকে, যদিও আজকাল এমন কমোড কমে যাচ্ছে। এটা তারা নিজের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ওভাবে নকশা করেছে। কারণ, মানুষের মলমূত্র শরীরের অনেক খবরাখবর বহন করে। অপর দিকে অ্যাংলো-স্যাক্সন বিশ্বে কমোডে মলদ্বারের সোজাসুজি ছিদ্র থাকলেও, তার ওপরটা থাকে পানি দিয়ে ভর্তি, যেখানে ত্যাগের পর মল সন্তরণ করতে থাকে। ভেসে থাকে।

এসব আলাপ আমার না, জিজেকের। তিনি তালাশ করেছেন মনে মনে এবং উত্তর দিয়েছেন জনে জনে। যদিও সেই উত্তর অত্যন্ত কল্পিত! তিনি বলছেন, ছিদ্রের এই অবস্থানের পেছনে কারণ হলো: ফরাসিরা রাজনৈতিকভাবে বেশ সচেতন, বিশেষ করে বামপন্থা ও বিপ্লবের সঙ্গে তাদের যোগ বহুদিনের। ইংরেজরা মধ্যপন্থী ও অর্থনীতিতে উদার। জার্মানরা হলো রক্ষণশীল ও কবিতার ভেতর অধিবিদ্যা খোঁজা জাতি। এই চিন্তার সঙ্গে মলপাত্রের নকশা মিলে যেতেই নাকি জিজেকের মাথা ঘুরে গেছে। ফরাসিরা যেহেতু বিপ্লবী চরিত্রের, তাই মলমূত্র যত দ্রুত সম্ভব তারা উধাও করে দিতে চায়। অনেকটা গিলোটিনে কেটে দ্রুত প্রাণ নেওয়ার মতো। জিজেক এখানে ফরাসি বিপ্লবকে ইঙ্গিত করছেন। অ্যাংলো-স্যাক্সনরা অনেক বেশি বাস্তববাদী, যৌক্তিক ও উদার। তাই তারা পুরীষকে ভাসতে দেয়। আর জার্মানরা কবিতায় অধিবিদ্যা খোঁজার মতোই পুরীষের ভেতর রোগজীবাণু খোঁজে। জিজেক বলেছেন, এমন করে ভাবার ভেতর পাগলামি আছে, কিন্তু সামান্য টয়লেটের নকশা নিয়েও আমাদের ক্রিটিক্যালি ভাবতে হবে। জিজেকের আলাপটি অশ্লীল হলেও, তাঁর মতো আমিও মনে করি, দুনিয়ার সবকিছুকেই প্রশ্ন ও চিন্তার ছাকনি দিয়ে গ্রহণ করা উচিত।

দুপুরে কিনে আনা খাবার খেতে খেতে, ঢাকায় পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অনেক রাত হয়ে এল। এখানে বাজে রাত সাড়ে ১২টা। ঘুমিয়ে পড়ব। এমন সময় ফোন দিলেন রাজীব নন্দন। তিনি বুদাপেস্টেই থাকেন। একসময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করতেন। অনুযোগ করলেন, কেন আমি আগে তাঁকে জানাইনি। বললাম, ভাই রাজীব, ভুলেই গিয়েছিলাম আপনি এখানে আছেন। তবে দেখা হবে নিশ্চয়। তাঁর সঙ্গে কথা শেষ করে ঘুমাতে গেলাম।
(চলবে)

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন