
সিডনির সার্কুলার কিয়ে একটা নৌবন্দর। পাশাপাশি এটাকে সিডনির প্রাণকেন্দ্র বললেও ভুল হবে না। কারণ, সার্কুলার কিয়েতেই অবস্থিত পৃথিবী বিখ্যাত ‘অপেরা হাউস’ এবং ‘হারবার ব্রিজ’। এ ছাড়াও এখানে আছে বাস এবং ট্রেনস্টেশন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজারো পর্যটক প্রতিবছর সার্কুলার কিয়েতে আসেন এসব স্থাপনার নান্দনিক সৌন্দর্য নিজ চোখে দেখতে। সিডনির যেকোন প্রান্ত থেকে ট্রেনযোগে এখানে আসা যায়। এছাড়াও এখান থেকে ফেরিযোগে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া যায়।

সার্কুলার কিয়েতে এসব স্থাপনার পাশাপাশি আছে ‘মিউজিয়াম অব কনটেম্পোরারি আর্ট’ সংক্ষেপে এমসিএ। বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায় সমসাময়িক শিল্পকলা জাদুঘর। পাচঁতলাবিশিষ্ট এই ভবনের প্রায় পুরোটা জুড়েই সারা বছর ধরে প্রদর্শনী চলে। দ্বিতীয় তলা থেকে চতুর্থ তলা পর্যন্ত বিভিন্ন রকমের স্থায়ী ও অস্থায়ী প্রদশর্নীর ব্যবস্থা আছে। ১৯৯১ সালে এটাকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য এখানকার সব প্রদশর্নী বিনা মূল্যে দেখা যায়। তবে আপনি চাইলে অর্থ সাহায্য করতে পারেন।
এমসিএর সামনেই আছে হাউই সদৃশ একটি স্থাপনা যার নাম ‘সিক্রেট ওযার্ল্ড অব এ স্টারলিট অ্যাম্বার’ এটা দিনের বেলায় দেখতে ততটা নান্দনিক না হলেও রাতের বেলায় এর সৌন্দর্য দর্শকদের আকর্ষণ করে। রাতের বেলায় এটার দিকে তাকালে মনে হয় যেন কোনো এক নক্ষত্ররাজির দিকে তাকিয়ে আছি। সেখানে হাজার হাজার তারা জ্বলছে। কিছুক্ষণের জন্য হলেও আপনার মনে হবে আপনি যেন মহাশূন্যে অবস্থান করছেন। এমন একজন দর্শনার্থীও খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি এটার সঙ্গে ছবি তুলে স্মৃতিটাকে ধরে রাখতে চান না।

নিচের তলায় রয়েছে ‘ফাউন্ডেশন হল’ নামের বিশাল জায়গা। এগুলো ভাড়া নিয়ে যেকোন অনুষ্ঠানাদি পালন করা যায়। এর পাশের সিঁড়ি দিয়ে দুই তলায় উঠে গেলেই আপনাকে স্বাগত জানানো হবে। স্বাগত জানিয়ে আপনাকে এমসিএ সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়া হবে। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ আর পঞ্চম সব তলাতেই প্রদশর্নী চলে। এ ছাড়াও পাঁচতলার কক্ষগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। এই জায়গাগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে বসে আপনি একইসঙ্গে হারবার ব্রিজ এবং অপেরা হাউস দেখতে পারবেন।
আমরা পুরো এক দিন সময় নিয়ে এমসিএতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। এখানে বিভিন্ন প্রকারের চিত্রকলা, ভাস্কর্যের পাশাপাশি প্রদর্শন করা হচ্ছে বিভিন্ন রকমের উপভোগ্য অডিওভিজ্যুয়ালও। আপনি চাইলেই যেকোনটার সামনে বসে দেখতে পারেন। উচ্চতর রেজুলেশন এবং পরিষ্কার শব্দের জন্য প্রত্যেকটা প্রদর্শনী অত্যন্ত উপভোগ্য। দ্বিতীয় তলায় এখন চলছে ‘টেন থাউজেন্ড সানস’ নামের একটা প্রদর্শনী যেটা সম্মিলিত প্রতিরোধের উত্তরাধিকার এবং অন্যায়ের মুখে উন্নতির জন্য একত্রিত হওয়া থেকে অনুপ্রাণিত। এখানকার চিত্রকর্ম এবং ভাস্কর্যগুলো অত্যন্ত বর্ণিল এবং ভাবনার খোরাক জোগায়।

অন্যান্য তলাগুলোতেও চলছে হরেক রকমের প্রদর্শনী। সেখানে বৈশ্বিক বিষয়াদির পাশাপাশি প্রদশর্ন করা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস এবং ঐতিহ্য। আছে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা। এ ছাড়া আছে বিশ্বের জন্য ভবিষ্যৎ হুমকি কী কী সেসব বিষয়ের অবতারণা। প্রতিটি প্রদর্শনী নিজ বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। আমি আমার ১৪ বছর বয়সী মেয়ে এবং ৯ বছর বয়সী ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। মনে মনে একটু চিন্তিত ছিলাম এই ভেবে যে ওরা এগুলোর মর্ম বুঝবে কি না। কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর আমার ভুল ভেঙে গেল। ওরা দুইজন আগে আগে সব প্রদর্শনী দেখে আমাকে বলে দিচ্ছিল কোনটা কী।
প্রদর্শনীগুলো দেখতে দেখতে বারবারই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার প্রদর্শনীর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। এভাবে চলতে চলতে ক্ষিদে পেয়ে গিয়েছিল। তখন একেবারে উপর তলার রেস্তোরাঁয় বসে একটু খেয়ে নিলাম। খাওয়ার টেবিলের ওপর দিয়ে তাকালেই হারবার ব্রিজ এবং অপেরা হাউস আমাদের দেখে মুচকি হাসি দিচ্ছিল। শেষে এসে দ্বিতীয় তলার দোকানে গেলাম। সেখানে গিয়ে জিনিসপত্র দেখে মনে হচ্ছিল সব কিনে নিয়ে গিয়ে বাড়ি ভর্তি করি কিন্তু দাম দেখে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলাম। আপাতত দেখেই চোখের সাধ মেটালাম।

দোকানের এক কোনে দেখি প্লাস্টিকের চরকি সাজানো রয়েছে যেগুলো দেখতে হুবহু বাংলাদেশের চরকির মতো। আসলে আমরা বিশ্বের যে প্রান্তেই যাই না কেন, সারাক্ষণই মনের মধ্যে লালন করে চলি এক খণ্ড বাংলাদেশের ছবি।
ছবি: লেখক