
এক ছুটির দিনে ঢাকার কাছেই চেনাজানা স্থান ধামরাইকে বেছে নিলাম ভ্রমণ করার জন্য। ঢাকার মূল শহর পেরোতেই দেখি মহাসড়কের সংস্কারের কাজ চলছে, চেনা স্থানও তখন অচেনা লাগে। কেন জানি পথে বেরোলেই চেনা পথও নতুন লাগে। যেতে যেতে ধামরাই উপজেলার ওপর লেখা ‘ধামরাই অঞ্চলের ঔপনিবেশিক স্থাপত্য’ বইটি পড়ছিলাম। লেখক শামীমা আক্তার লিখেছেন, ‘প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে সমৃদ্ধ মানববসতির চিহ্ন আবিষ্কৃত হয়েছে।

ঔপনিবেশিক সময়ে এখানে নতুন স্থাপত্যশৈলীর সূচনা হয়। প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যকলার সাথে ইউরোপীয় ধারার মেলবন্ধন ঘটে। ফলে স্থাপত্যকলায় একটি নতুন ধারার প্রবর্তন হয়। ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব এবং স্থাপত্যের নানা দিক নিয়ে দারুণ এক গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত করেছে ধামরাই।
‘ধামরাই একটি প্রাচীন জনপদ। জানা যায়, খ্রিষ্টীয় একাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ধামরাই পাল বংশীয় বউদ্ধ রাজাদের শাসনাধীন ছিল। পালদের পতনের পর এ এলাকা গাজী বংশীয় নৃপতিরা শাসন করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে এটি পাঠান বংশের শাসনে চলে যায়।
“ধামরাই” নামকরণের পেছনে রয়েছে নানা কিংবদন্তি। জনশ্রুতি অনুসারে অশোক স্তম্ভ কিংবা ধর্মরাজিকা থেকে “ধামরাই” নামটি এসেছে। আবার কেউ কেউ বলেন, চতুর্দশ শতাব্দীতে শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গী সুফি দরবেশরা এ অঞ্চলে এসে ধামা গোপ ও রাই গোয়ালিনীর সাথে মিলিত হন। সেই দম্পতির সম্মানে এ অঞ্চল “ধামরাই” নামে পরিচিতি পায়। “ধাম” অর্থ পবিত্র স্থান এবং “রাই” হলেন শ্রীকৃষ্ণপ্রণয়িনী শ্রীরাধিকা। ধামরাইয়ের বিখ্যাত রথযাত্রা ও যশোমাধব জিউর মন্দিরের কারণে একে “শ্রীরাধিকার ধাম” বা সংক্ষেপে ধামরাই বলা হয়।’

বই থেকে চোখ সরালাম ধামরাই সদরে এসে। উপজেলা সদরে গিয়ে যখন জিজ্ঞাসা করলাম, গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়ন কোন দিকে? চার-পাঁচজন একই উত্তর দিলেন। উত্তরটাও আজব, ‘জীবনে প্রথম শুনলাম এই ইউনিয়নের নাম।’ এ রকম চলতে চলতে দশম জনের কাছে সঠিক তথ্য পেলাম, ‘এখান থেকে সোজা পথ ধরে ১৫ কিলোমিটার যাবেন। পথে লেখা দেখবেন বারবাড়িয়া, সেখানে গিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করলেই হবে।’
আসলে পথ ধামরাই সদর থেকে ১৫ কিলোমিটারের বেশি। যাহোক খুঁজে পাওয়া গেল বাড়ি। সবকিছুর বদল হলেও এ বাড়িতে আসার পথ বদলায়নি। সেই ইটবিছানো পথ ছিল বছর পাঁচেক আগে, এখনো তা–ই । গ্রামের সরু পথ দিয়ে পাশাপাশি দুটি বাহন চলতে পারে না।
ইটের রাস্তা পেরোনোর সময় দুই পাশের সবুজ ধানখেত, গাঙ্গুটিয়ার ছোট বাজার, মাটির বাড়িগুলো দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। খাঁ খাঁ করা তপ্ত দুপুরেও মন প্রশান্তিতে ভরে গেল।


পৌঁছে রায়বাড়ির গেট বন্ধ পেলাম। আশপাশে কাউকে খুঁজছিলাম কথা বলার জন্য। সে সময় এক নারী এলেন, তিনিও ভেতরে প্রবেশ করবেন। রায়বাড়ির উত্তরসূরিরা অতিথিদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেন আগে থেকেই। অল্প অপেক্ষা করার পরই এক তরুণ এসে সদর দরজা খুললেন। তরুণটি সে রকম কিছুই জিজ্ঞাসা করেননি। আমি নিজ থেকেই এখানে আসার উদ্দেশ্য বললাম।
ভেতরে প্রবেশ করতেই হাতের বাঁ দিকে একটি বাউন্ডারি দেওয়া স্থান চোখে পড়ল।
সোজাসুজি তাকালে দেখা যায়, একতলা একটি ভবনের সংস্কারকাজ চলছে। ভবনের সামনের পিলারগুলোর গায়ে চিনি টিকরির কারুকাজ। ওপরে ছাদের সম্মুখভাগে প্রাণী ও নারীর প্রতিমূর্তি রয়েছে। ধীরপায়ে এগোলাম। একাধারে কয়েকটি স্থাপত্য। লম্বা একটি সারি। একেকটি স্থাপনা একেক রকম; কোনোটি দ্বিতল, কোনোটি একতলা। কোনোটি কিছুটা ক্ষয়ে গেছে। আবার কোনোটি ক্ষয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ইউরোপীয় আদলে আয়রনের কারুকাজের নিদর্শন দেখতে পেলাম জানালা ও দরজাগুলোয়।


বসতবাড়িগুলোর সারিতে সরু প্রবেশপথ রয়েছে আরও ভেতরে যাওয়ার জন্য। জানি না অন্দরমহল বলা ঠিক হবে কি না। সেই পথ ধরে ভেতরে গেলাম। প্রবেশপথে লেখা রয়েছে ‘গোবিন্দ ভবন; স্থাপনকাল ১২৭০ বঙ্গাব্দ’। ভেতরের অবস্থা আরও বেশি ক্ষয়ে যাওয়া। কিছু ভবন স্যাঁতসেঁতে। ভেতরের ভবনগুলোর একটি ভবনের বারান্দার পিলারগুলো দেখলাম গথিক স্টাইলে নির্মিত। বাকি ভবনগুলোর স্থাপত্যশৈলী উনিশ বা বিশ শতকের বাড়িগুলোর মতোই। গথিক স্থাপত্যের মতো সেই বারান্দা ধরে চললে সামনেই দেখা মিলবে একটি দিঘির।
দিঘির ঘাট নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। এ বাড়িতে অনেকগুলো পাতকুয়া কিংবা ছোট জলাধার রয়েছে। একটি দেখতে পেলাম। আবারও বারান্দা ধরে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলাম!


দেখলাম, এক নারী কাজ করছেন। এগিয়ে গিয়ে কথা বললাম। তাঁর নাম প্রতিমা সাহা। তিনি নাতবউ। আমিও সহজ করে নাতবউ বললাম। কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে, প্রপৌত্রের ঘরের নাতবউ তিনি। প্রতিমা সাহার কাছেই এ বাড়ির ইতিহাস জানলাম। এখন এ বাড়িতে বসবাস করছেন জমিদারের সপ্তম বংশধরেরা। তাঁরা সবাই মিলে কিছু সংস্কারকাজে হাত দিয়েছেন।
গোবিন্দ চন্দ্র রায় এখানকার ভবনগুলো নির্মাণ করেন। গোবিন্দ চন্দ্র রায়ের ছয় ছেলে, এক মেয়ে। তাঁদের নাম নবদ্বীপ রায়, রাধাচরণ রায়, অম্বিকাচরণ রায়, জগবন্ধু রায়, দীনবন্ধু রায় ও সাধুচরণ রায়। সে জন্যই এ বাড়ির নাম গোবিন্দ ভবন। ভবনের দরজায় লেখা বাংলা সাল থেকে অনুমান করা যায় যে এ বাড়ির বয়স ১৭০ বছর। প্রতিমা সাহা বলেন, ছয় ছেলের জন্য গোবিন্দ চন্দ্র রায় ছয়টি ভিন্ন ভবন নির্মাণ করেন।


প্রথমে প্রবেশমুখে বাউন্ডারি দেওয়া স্থানটি সমাধিভূমি আর যে ভবনের কাজ চলছিল, সেটি ছিল বৈঠকখানা বা কাছারি। প্রতিমা সাহা বললেন, কাছারির বয়স ১০০ বছর। ছয়টি ভবনের সঙ্গে ছয়টি কুয়া রয়েছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এ বাড়ির সদস্যদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। জানা যায়, ১৯৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালে গোবিন্দ চন্দ্র রায়ের বংশের চারজনকে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। তাঁরা হলেন সুধীর কুমার রায়, কালীপ্রসন্ন রায়, মৃণালকান্তি রায় ও বিজয়রত্ন রায়। ১৯৭১ সালের ৩১ আগস্ট দুপুরবেলায় এ বাড়ি থেকে ৪ জনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় সাটুরিয়া মিলিটারি ক্যাম্পে।

তারপর তাঁরা আর কোনো দিন ফিরে আসেননি। দীর্ঘ ২৪ বছর পর গোবিন্দ ভবনের চত্বরে তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্মৃতিসমাধি নির্মাণ করা হয়। পরিবার-পরিজনেরা অপেক্ষায় ছিলেন ২৪ বছর। বর্তমানে ভবনগুলোয় রামগোপাল রায়, স্বদেশ রঞ্জন রায়সহ গোবিন্দ চন্দ্র রায়ের ছয় ছেলের বংশধরেরা বসবাস ও দেখাশোনা করেন। গোবিন্দ ভবনের বাইরের প্রাচীরে একটি ফলকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চারজনের পেশা ও পরিচয় লেখা রয়েছে।
প্রতিমা সাহার কাছে বিদায় নিয়ে ধীরে ধীরে মূল ফটকের দিকে গেলাম। বৈশাখের গরম অনুভূত হলো জমিদারবাড়ি ভ্রমণ শেষ হওয়ার পর। জমিদারবাড়ির কোল ঘেঁষে রয়েছে গাজিখালী নদী। নদীতে এই ভরদুপুরেও দেখলাম, স্থানীয় জেলেরা ছিপ ফেলে বসে আছেন। নদীতে পানি অনেক কম এখন। গাজীখালী নদী মানিকগঞ্জ জেলায় পড়েছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি ঢাকা জেলার গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়নে। নদীর ওপারেই দেখতে পাচ্ছি মানিকগঞ্জ জেলা।

গাঙ্গুটিয়া জমিদারবাড়িটি একটি সীমান্তবর্তী বাড়ি। গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়ন শেষ হলো, শুরু হলো মানিকগঞ্জ জেলা। একবিংশ শতাব্দীতেও এ এলাকা কোলাহলমুক্ত ছিল। এখানে আসার পথটি সরু ইটের পথ। ১৮৬৩ অব্দে এ অঞ্চল কেমন ছিল, ভাবার চেষ্টা করলাম। তখন কি পথ ছিল, নাকি একেবারে জঙ্গলাকীর্ণ ছিল! এই গাজীখালী নদীই হয়তো ছিল চলাচলের একমাত্র পথ। হয়তো এ কারণেই নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছিল এই ধ্রুপদি স্থাপত্য। গাজীখালী নদী ও গোবিন্দ ভবনের যৌবন আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছিলাম।
রাজধানীর এত নিকটে, আপনিও ঘুরে আসুন না একদিন সময় করে।
ছবি: লেখক