সূর্যের সোনালি আঁচলে পোখারার দিনলিপি
শেয়ার করুন
ফলো করুন

কুয়াশার একটা পাতলা চাদরে চারপাশ ঢাকা। তাপমাত্রা নেমেছে ৪ ডিগ্রিতে। দুই প্রস্থ শীতের কাপড় গায়ে দেওয়া সত্ত্বেও ঠকঠক করে কাঁপছি। জোরজবরদস্তি সত্ত্বেও মৌকে সঙ্গে আনা সম্ভব হয়নি। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় সারাংকোটের সূর্যোদয় দেখার চেয়ে কম্বলের নিচে দুই ঘণ্টা বাড়তি ঘুমানো তার কাছে অধিক মূল্যবান। অবশ্য তাকে দোষ দেই–ই বা কী করে? হোটেলকক্ষের আরামদায়ক উষ্ণতা ছেড়ে সারাংকোটের এই ঠান্ডায় আসার জন্য ইতিমধ্যে দু–একবার নিজেকে শাপশাপান্ত করেছি। সান্ত্বনা একটাই, কেবল আমি একা নই, আরও শ দুয়েক আদমসন্তান একসঙ্গে অপেক্ষায় আছি, কখন সূর্য তার অবগুণ্ঠন উন্মোচন করবে।

সূর্যোদয় দেখার জন্য সাতসকালে জমেছে ভিড় ভিড়
সূর্যোদয় দেখার জন্য সাতসকালে জমেছে ভিড় ভিড়

অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। পুবের আকাশ থেকে আলোকরশ্মি ছিটকে গেল পশ্চিমে। সেই আলোয় উদ্ভাসিত হলো হিমালয় পর্বতমালা। প্রথমে দেখা দিল অন্নপূর্ণার ধবল চূড়া। তারপর মাছুপুছারি, মাছের লেজের আকৃতির কারণে যার অপর নাম ফিশটেইল। সবশেষে ধবলগিরি এবং মানাসলু। একসঙ্গে এতগুলো সুউচ্চ পর্বতের প্যানারোমিক দৃশ্যাবলি দেখা যায় বলেই সারাংকোটের এত খ্যাতি। সাধে কি আর মানুষ সাতসকালে পাঁচ হাজার ফুট উচ্চতার এই ভিউ পয়েন্টে ঘুরতে আসে? যদিও দার্জিলিংয়ের টাইগার হিলে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শনের জন্য এর থেকেও বেশি জনসমাগম ঘটে। সেখানে ব্যর্থ হলেও এইখানে হিমালয় দর্শন সফল হয়েছে, তাতেই আমি খুশি।

বিজ্ঞাপন

আজ সারা দিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করেছি। চালক ভদ্রলোকের নাম কৃপা। কৃপার সঙ্গে কথা হয়েছে এখান থেকে দুটো জায়গায় যাব। তারপর হোটেলে ফিরে বউকে নিয়ে বাকি দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখব। প্রথমে গেলাম শ্বেতী রিভার গর্জ নামক জায়গায়। এইটা অবশ্য কৃপারই সুপারিশ ছিল। খুবই হতাশ হলাম। ভেবেছিলাম কোন ঝরনা হবে। আদতে দুই পাহাড়ের মাঝখানে এক সরু জায়গা যেখান দিয়ে দ্রুতগামী পানির প্রবাহ যাচ্ছে। বান্দরবানের কথা বাদই দিলাম, সিলেটের পাহাড়ি ছড়ার মধ্য দিয়েও এর থেকে বেশি পানি প্রবাহিত হয়। কাজের কাজ যেটা হলো কৃপার সুপারিশের ওপর থেকে ভরসা উঠে গেল। তাই যখন বলল এইবার কুমারী গুহা ঘুরিয়ে দেখাবে, সোজা ফেওয়া লেকে ফেরত যেতে বললাম। লেকের ওই পাশে পাহাড়চূড়ায় একটা পিস প্যাগোডা আছে। সেইটাতে ট্রেকিং করে উঠব।

পিস প্যাগোডার সামনে লেখক
পিস প্যাগোডার সামনে লেখক

সারা দুনিয়ায় শান্তির বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিশিদাতসু ফুজি নামক জাপানি এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে একই রকমের বৌদ্ধ স্তূপ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। সে মতে সারা দুনিয়ায় ৮০টি শান্তি স্তূপ নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটো আছে নেপালের লুম্বিনি আর পোখারায়। আনাদু পাহাড়ের ওপর ১৯৭৩ সালে নির্মাণ শুরু হলেও সরকারি বাধার মুখে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৯২ সালে আবারও নতুন করে নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে এর উদ্বোধন হয়।

বিজ্ঞাপন

উদ্বোধনের পর থেকেই এটি পোখারার অন্যতম পর্যটক গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। এখান থেকে একই সঙ্গে ফেওয়া লেক এবং অন্নপূর্ণা রেঞ্জের পাহাড়গুলো দেখা যায়। দুভাবে স্তূপটিতে যাওয়া যায়। পাহাড়ি সড়ক ধরে গাড়ি চালিয়ে, যদিও শেষের কিছু অংশ হেঁটে উঠতে হয়। অথবা ফেওয়া লেকের পাড় থেকে ওপর দিকে উঠে যাওয়া হাঁটাপথ ধরে। নাশতার পর মৌকে নিয়ে গাড়িতে করে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। কিন্তু তাই বলে ট্রেকিংয়ের সুযোগটা কেন হারাব?

পিস প্যাগোডায় যাওয়ার পথ
পিস প্যাগোডায় যাওয়ার পথ

নৌকায় লেক পাড়ি দিয়ে অপর পাশের হাঁটাপথটাতে পৌঁছালাম। এই পথে না এলে যে সারা জীবন আফসোস করতে হতো, সেটা ট্রেকিং শুরুর পরই পরিষ্কার হয়ে গেল। কিছু কিছু সৌন্দর্য প্রকাশ করার ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। পিস প্যাগোডায় পৌঁছানোর পথের ব্যাপারে শুধু এই অনুভূতিটুকুই ব্যক্ত করা যায়। ঘন সবুজ আচ্ছাদন ভেদ করে ওপর দিকে এগিয়ে চলার পথে নিচে তাকালে ক্ষণে ক্ষণে ফেওয়া লেক দৃশ্যমান হয়।

প্রতিবারই মনে হয় এর রূপ বদলে গেছে। মেঘ এবং কুয়াশার মিতালি যদিও অন্নপূর্ণাকে অদৃশ্য করে রেখেছে, তথাপি ঘন কুয়াশার ভেতর থেকে ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠা পোখারা শহরকে কেমন জানি মায়ায় আচ্ছন্ন কল্পনগর বলে ভ্রম হয়। লেকের পানি থেকে ওপর দিকে উঠতে থাকা কুয়াশা যেন পানির নিচের কোন দৈত্যের আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠার প্রশ্বাস। যতই ওপরে ওঠা যায়, পথ ততই সরু হয়ে আসে। সবুজের আচ্ছাদন বিরহী প্রেমিকার মতো জড়িয়ে ধরতে চায়, ভালোবাসতে চায়।

অনেক উপর থেকে দেখা যাচ্ছে ফেওয়া হ্রদকে
অনেক উপর থেকে দেখা যাচ্ছে ফেওয়া হ্রদকে

শান্তি স্তূপের অবস্থান সমুদ্র সমতল থেকে সাড়ে তিন হাজার ফুটের বেশি উচ্চতায়। মোবাইলে স্ট্রাভা অ্যাপ চালু করে ওঠা শুরু করেছিলাম। প্রায় তিন কিলোমিটার ট্রেকিং করে অবশেষে চূড়ায় পৌঁছাতে পেরেছি। সকাল বলেই কিনা মানুষজনের চিহ্নও নেই। ভুল বললাম, তিনজনের ছোট্ট একটা দল আছে। প্যাগোডা ঘিরে চক্কর দিচ্ছিল বিধায় চোখে পড়েনি। ফাঁকা চত্বরে দেড় শ ফুট উঁচু প্যাগোডাটি সটান দাঁড়িয়ে আছে। এর আগে দার্জিলিং ভ্রমণে প্রথমবার কোন পিস প্যাগোডা দেখার সুযোগ হয়েছিল। এটিও একদম সেটিরই হুবহু প্রতিরূপ। এমনকি মূল প্যাগোডার পাশে যেই ছোট স্তম্ভটি আছে সেটিও একই রকম। একই শান্তির মন্ত্র উৎকীর্ণ আছে স্তম্ভটিতে। প্যাগোডার চারপাশে গৌতম বুদ্ধের চার ভঙ্গিমার চারটি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। বুদ্ধ হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন, চোখ বন্ধ করে ধ্যান করছেন, এক হাতের তর্জনী দিয়ে অন্য হাতের তালুর দিকে নির্দেশ করছেন এবং ধর্মচক্রের নিচে শুয়ে আছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই চার মূর্তি আবার চার দেশ থেকে (জাপান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড এবং নেপালের লুম্বিনি) আনা হয়েছে।

ওপরে ওঠার সময় যেখানে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছিল, নামতে লেগেছে মাত্র ১৫ মিনিট। একরকম দৌড়েই নেমেছি বলা চলে। হোটেলে পৌঁছে দেখি অর্ধাঙ্গিনীর ঘুম ভেঙেছে কেবল। সকালের ঘুমের কারণে সে কী কী মিস করল, এই নিয়ে নাতিদীর্ঘ লেকচার ঝাড়লাম। জবাবে ভেংচি কেটে বাথরুমে ঢুকে গেল। লম্বা ট্রেকিংয়ের কারণে পেটের ভেতর ছুঁচোর কেত্তন শুরু হয়ে গেছে। নাশতার পর আরেক দফা বেড়ানো হবে।

পোখারা শহর
পোখারা শহর

নাশতার সময় মনোজদা পরিচয় করিয়ে দিলেন কল্পনাদির সঙ্গে। দিদি পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রামের ইন্টারন্যাশনাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটিতে। অনার্সের পর নেপালে ফিরেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন। চমৎকার বাংলা বলেন। আমরা বাংলাদেশি বলেই হয়তো নাশতার ব্যবস্থা করেছেন ওনাদের বাসার ভেতরেই। এমনিতে বাকি অতিথিরা হোটেলের রেস্টুরেন্টেই নাশতা করে থাকেন। গল্প এবং আড্ডায় সময় কেটে যায়। গল্পের মাঝেই মনোজদা তাঁর বাবা এবং মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমাদের আড্ডায় স্থান পায় পোখারা তথা নেপালের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনীতি এবং অর্থনীতির নানা দিক। ভারতীয় রুপি নেপালে চললেও ভারতের সঙ্গে নেপালের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে ইদানীং। বামপন্থী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পুরোনো রাজতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কের মতো মসৃণ নয়। তড়াই অঞ্চলের মানচিত্র বদল কিংবা জ্বালানিসংকটের সময় ভারতের ভূমিকা নেপালি জনগণ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। ওই সময়টাতে বাংলাদেশ সরকার নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছিল বলে বাংলাদেশিদের আবার তাঁরা বেশ পছন্দ করেন। নিজেদের দেশের রাজনীতিবিদদের ছেলেমেয়েদের বিলাসবহুল লাইফস্টাইল নিয়েও তাঁরা ক্ষুব্ধ। সলতে তৈরিই আছে। যেকোনো সময় বারুদে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে (শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালে জেন–জি বিক্ষোভ ঘটেছিল)। যা বুঝলাম, সমস্যা ছাড়া কোনো দেশই নেই। একেক দেশ একেক রকম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

কৃপা গাড়ি নিয়ে তৈরিই ছিল। আমরাও বেরিয়ে পড়লাম পিস প্যাগোডার উদ্দেশে। প্যাগোডায় যখন পৌঁছেছি, তখন মিষ্টি রোদে চারপাশ ভরে আছে। প্রচুর লোকের ভিড়ে ভোরের সেই সৌম্য পরিবেশ উধাও হয়েছে। মৌকে পুরো জায়গাটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে গাড়ির কাছে ফিরে চললাম। এখান থেকে যাব একটা জলপ্রপাত দেখতে, দেবীর প্রপাত নাম। কৃপা যদিও খুব উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলে জায়গাটার কিন্তু সকালের অভিজ্ঞতা এখনো তাজা, তাই খুব একটা ভরসা করতে পারলাম না। এবং সত্যিকার অর্থেই দেবীর ঝরনা দেখে হতাশ হয়েছি। প্রথমত ঝরনার আকৃতি ছোট, পানিপ্রবাহের গতিও তীব্র নয়। ঝরনার কাছাকাছি কেউ যেন যেতে না পারে, সে জন্য আবার লোহার প্রাচীর দেওয়া আছে। অনেকেরই জায়গাটা ভালো লাগবে। সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশেই এত চমৎকার সব ঝরনা দেখে এসেছি যে সেই তুলনায় এই ঝরনা নিতান্তই শিশু। তবে চারপাশটা সুন্দর। প্রিয়জনের সঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়ার জন্য জায়গাটা মন্দ নয়।

দেবীর প্রপাত দেখে অত্যন্ত হতাশ হয়েছি
দেবীর প্রপাত দেখে অত্যন্ত হতাশ হয়েছি

মৌয়ের কাছেও জায়গাটা যে খুব আহামরি লাগেনি, সেটা তার মুখাবয়বেই স্পষ্ট। তাই কৃপা যতক্ষণে মুখে প্রশংসার তুবড়ি ছুটিয়ে আমাদের গুপ্তেশ্বরের গুহায় নিয়ে গেল, ততক্ষণে প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে সমতল থেকে বেশ খানিকটা ভেতরে প্রবেশের আগ্রহ আমাদের দুজনের মন থেকেই উবে গেছে। প্রবেশমুখ থেকেই আমরা ফিরে চললাম। এবারের গন্তব্য আন্তর্জাতিক পর্বত জাদুঘর। এই জায়গাটা আমার কাছে দারুণ লেগেছে। পাহাড় আমার অনেক পছন্দের, বিশেষ করে এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্পে ট্রেকিংয়ের সুপ্ত ইচ্ছা মনের গহিনে লালন করি বলেই হয়তো জায়গাটার ব্যাপারে কিছুটা পক্ষপাত কাজ করেছে।

বেশ বড় জায়গা নিয়ে জাদুঘরটা স্থাপন করা হয়েছে। ২০০৪ সালে উদ্বোধনের পর থেকে প্রতিবছর গড়ে এক লাখ দর্শনার্থীর পদচারণ ঘটে এখানে। মূল ভবনে প্রবেশের আগেই চোখে পড়বে ছোট একটা স্মৃতিস্তম্ভের। হিমালয় অভিযানে যেসব ব্যক্তি মারা গেছেন, তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশেই এই স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। স্তম্ভের চারদিকে এবং ওপরে পতপত করে উড়ছে প্রার্থনা পতাকার গুচ্ছ। হিমালয়ের মানাসলু পর্বতের ৩১ ফুট উঁচু এক প্রতিরূপ পাথর দিয়ে তৈরি করে রাখা আছে ফাঁকা চত্বরে। অনেকেই উঠছে সেটিতে। নিজে তো উঠলামই, চাপাচাপি করে বউকেও বেশ কিছু দূর পর্যন্ত ওঠানো হলো। পাহাড়ে আরোহণ তাঁর কাছে সময় এবং শ্রমের নিদারুণ অপচয় বলেই প্রতীয়মান হয়। আমাকে ইতিমধ্যে শাসানো হয়েছে এভারেস্ট বেজক্যাম্পে ট্রেকিংয়ের চিন্তা মাথা থেকে বের করতে। ‘হয় আমি, না হয় পর্বতারোহণ। যেকোনো একটা’—এমন আলটিমেটাম পেতে কার ভালো লাগবে?

মরিস হারজং দেয়াল
মরিস হারজং দেয়াল

আরে বাহ্‌, পর্বতারোহণের দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর সুবিধা দেওয়ার জন্য একটা দেয়ালও বানানো হয়েছে দেখছি। দেয়ালটির নামকরণ করা হয়েছে কিংবদন্তি ফরাসি পর্বতারোহী মরিস হারজংয়ের নামে। মরিস হারজং সেই ব্যক্তি, যিনি প্রথমবার কোনো আট হাজার মিটার উচ্চতার পর্বতে আরোহণ করেছিলেন, সেটিও সেই ১৯৫০ সালে।

অভিযান থেকে ফিরে পরের বছরই প্রকাশ করেছিলেন সাড়া জাগানো ভ্রমণকাহিনি ‘অন্নপূর্ণা’। তাঁকে সম্মান জানানো হয়েছে দেখে ভালো লাগল। মূল জাদুঘরের ভেতরে তিনটি প্রদর্শনী কক্ষ আছে। হিমালয়ের বিভিন্ন পর্বতের বর্ণনা, হিমালয় পর্বতমালার চমৎকার সব আলোকচিত্র, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহের গলে যাওয়া, হিমালয় পর্বতমালার গাছাগাছালি ও ফুলের বর্ণনা, বিখ্যাত পর্বতারোহীদের গল্প, হিমালয়ের বাসিন্দাদের সংস্কৃতি বিভিন্ন বিষয় চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেটুকু সময়ই কাটিয়েছি, জায়গাটিতে ভালো লেগেছে। কৃপার সঙ্গে চুক্তি ছিল দুপুর পর্যন্ত। দুপুরের খাবারের পর হোটেল পৌঁছে তাঁকে বিদায় দিলাম। পরদিন যদি আবারও বের হই, তাহলে যেন ওকে ফোন দিই সেই কথা বারবার বলে গেল। পরের দিনটা আমরা রেখেছি কেবল বিশ্রামের জন্য। ফেওয়া লেকের পাশ দিয়ে দুজন হাঁটব আর গল্প করব। ঘোরাঘুরি যা করার আজকেই করে ফেলব।

জাদুঘরে আছে পর্বত বিষয়ক অনেক নিদর্শন
জাদুঘরে আছে পর্বত বিষয়ক অনেক নিদর্শন

কোনো একটা জায়গাকে আপনি যদি ভালোভাবে অনুভব করতে চান, তাহলে সেখানকার বাজারে ঘুরতে হবে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে। দু–একটা ট্যুরিস্ট স্পট ঘুরে এলে ভেতরের চিত্র বোঝা কঠিন। সে জন্যই পরদিন নাশতার পর আমরা শহর ঘুরতে বের হলাম। মনোজদার পরামর্শ অনুযায়ী রাস্তার মোড়ের বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখি একটা বাস দাঁড়ানো আছে। বাসটা চক্রাকারে পুরো শহর ঘুরে এখানেই এসে থামবে। আমাদের গন্তব্য শহরের কেন্দ্রস্থলের বিপণিবিতানগুলোয়। মাত্র তিরিশ রুপি খরচ করে আধা ঘণ্টায় গন্তব্যে পৌঁছালাম। বাস থেকে নেমে দেখি পোখারার ইউরোপীয় আবেশ উধাও হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার গড়পড়তা বাজারগুলোর মতোই একটা এলাকা। লোকের ভিড়, গাড়ির শব্দ, হকারদের হাঁকডাক, ভিক্ষুকদের আনাগোনা দেখে মনে হয় পুরান ঢাকায় চলে এসেছি। পার্থক্য হচ্ছে পুরান ঢাকা ঘিঞ্জি, এখানটায় দম ফেলার জায়গা আছে।

ফেওয়া লেকের পাশের দোকানগুলোতে যেকোনো জিনিসের দাম শুনেই যেখানে পিলে চমকে যাওয়ার অবস্থা হয়, সেই তুলনায় এখানকার দোকানগুলোতে জিনিসপত্রের দাম শুনে ধাক্কা ততটা খেতে হয় না। এ কারণেই লেকের পাশের দোকানগুলোতে পর্যটক ছাড়া স্থানীয়দের কেনাকাটা করতে দেখিনি। এখানটায় দামাদামি করা যায় দেখে দেখি আমার বউয়ের মুখে হাসি আর ধরে না। যদিও শেষ পর্যন্ত তার জন্য এক জোড়া জুতা আর একটা লকেট ছাড়া আর কিছুই কেনা হয়নি, বলা ভালো ম্যাডামের পছন্দ হয়নি।
‘হ্যালো। হাউ আর ইউ সুইট কাপল?’
চমকে যেতে হলো। হুট করে এমন উষ্ণ সম্বোধন তো আশা করিনি। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি মিস্টার এবং মিসেস উলরিখ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে আগের রাতে হোটেলের বাগানে। ক্যাম্পফায়ারের আগুন পোহাচ্ছিলেন পাঁচ পর্যটক। আমরাও একটু উত্তাপের আশায় সেখানে যাওয়ার পর সাদরে বসার জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলেন উলরিখ। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী জার্মানিতে সরকারি চাকরি করতেন।

অবসরের পর দুনিয়া ঘুরতে বের হয়েছেন। পশ্চিমাদের এই ব্যাপারটা আমার দারুণ লাগে। কাজের সময় কাজ, অবসরে দুনিয়া ঘুরে দেখা। একটা সময় ছিল বাঙালিরাও দুনিয়া ঘুরে বেড়াত। সেই ১৯২৬ সালেই সাইকেলে করে বিশ্ব ঘুরেছেন বিমল মুখার্জি। তারও আগে ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ গুপ্তচর হিসেবে তিব্বত ঘুরে এসেছেন চট্টগ্রামের ছেলে শরচ্চন্দ্র দাস। হবিগঞ্জের বানিয়াচং নিবাসী রামনাথ বিশ্বাসের নামই হয়ে গেছে বাংলার ইবনে বতুতা। কোথায় হারাল আমাদের সেই ভ্রমণসংস্কৃতি?

পোখারার ফল বাজার
পোখারার ফল বাজার

আমাদের মতোই মিস্টার এবং মিসেস উলরিখও শহর দেখতে বেরিয়েছেন। রাতে আবারও দেখা হবে এই কথা বলে নিজেদের পথে চলে গেলেন। আমরাও সেই লোকাল বাসে করেই ফিরলাম দুদিনেই আপন হয়ে যাওয়া ফেওয়া লেকের রাস্তায়। সূর্যাস্তের পর যতক্ষণে হোটেলে ফিরেছি, ততক্ষণে সন্ধ্যাবাতিগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মনোজদা অপেক্ষা করছিলেন আমার জন্য এক বিস্ময় নিয়ে। রিসেপশনে পৌঁছানো মাত্রই হাতে তুলে দিলেন অনেকগুলো নেপালি মুদ্রা। নেপালে কোনো মুদ্রা পাওয়া যায় না আজকাল। সব কাগজের নোট। একজন সংগ্রাহক হিসেবে আমি অনুরোধ করেছিলাম যে কিছু মুদ্রা জোগাড় করা যায় কি না।

আন্তর্জাতিক পর্বত জাদুঘরের ভেতরে
আন্তর্জাতিক পর্বত জাদুঘরের ভেতরে

বাজারে যেহেতু পাওয়া যায়নি, মায়ের মাটির ব্যাংক থেকে কয়েকটা কয়েন এনে দিয়েছেন আমার জন্য। নেপালিরা এভারেস্ট পর্বতকে ডাকে সাগরমাতা (স্বর্গের মা) বলে। সেই সাগরমাতার ছবিসংবলিত চমৎকার মুদ্রাগুলো হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়েছিলাম। যতটা না মুদ্রার জন্য, তার থেকেও বেশি মনোজদার আন্তরিকতার জন্য। এটাই ভ্রমণের সৌন্দর্য। ভ্রমণ কেবল আমাদের নতুন জায়গাতেই নিয়ে যায় না, নতুন মানুষের কাছেও নিয়ে যায়। বৈশ্বিক নাগরিক হওয়ার কঠিন রাস্তায় আমাদের যেই যাত্রা, সেই যাত্রাপথকে করে তোলে আরও মসৃণ।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন