মৎস্যকন্যার খোঁজে ২
শেয়ার করুন
ফলো করুন

আকাশপথে পৃথিবী অনেক ছোট। মানুষ এখন সাত দিনের পথ ঘণ্টায় পাড়ি দেয়। আমরা দুই ঘণ্টার কম সময়ে ফ্রান্সের তুলুজ থেকে ইতালির নেপলসের বিমানবন্দরে পৌঁছে গেলাম। খুব সুন্দর বিমানবন্দর।

তুলুজ বিমানবন্দরের হরেক রকমের পণ্যের একটি বিশাল বুটিক
তুলুজ বিমানবন্দরের হরেক রকমের পণ্যের একটি বিশাল বুটিক

মার্চের প্রথমে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় নেই। আমরা এ সময়টা বেছে নিয়েছি প্রধানত এ কারণেই। আমাদের ভাগ্য ভালো, সূর্য উদার। হালকা মেঘ থাকলেও, হাড় কাঁপানো শীত নেই। সাথে আছেন আমার স্ত্রী রানা এবং আমাদের কন্যা এলিন। আমাদের তিনজনেরই ভ্রমণ খুব পছন্দ। মনটা বেশ ফুরফুরে হলো।

বিজ্ঞাপন

যে নগরীতে আজও বেঁচে আছেন ফুটবলের দেবতা

আমরা খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বাস ধরলাম। মিনিট দশক পরেই বাস নেপলসের পুরোনো শহরে প্রবেশ করল। এর পরে বাস এসে থামল এই নগরীর কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন এলাকায়। বাস থেকে নামতেই অদূরে একটি আকাশচুম্বী ভবন চোখে পড়ল। এই বহুতল ভবনের এক পাশের দেয়ালের পুরোটাজুড়ে ফুটবলের দেবতা দিয়েগো ম্যারাডোনার বিশাল একটি ছবি টানানো। গায়ে ১০ নম্বর জার্সি। মাথাভর্তি ঘন ঝাঁকড়া চুল। চোখে দীপ্তির ছটা, যেন ইগল দৃষ্টিতে দেখছেন এই নগরীতে নতুন আগন্তুকদের। পরে দেখেছিলাম, পৌরাণিক কাহিনির এই নগরীর এখানে রাস্তাঘাটে, দেয়ালচিত্রে, বুটিকে, সর্বত্র তরুণ ম্যারাডোনার প্রতিকৃতি, সর্বত্র তাঁর জীবন্ত উপস্থিতি।

নগরীর এখানে রাস্তাঘাটে, দেয়ালচিত্রে, বুটিকে, সর্বত্র ফুটবলের দেবতা দিয়েগো ম্যারাডোনার জীবন্ত উপস্থিতি
নগরীর এখানে রাস্তাঘাটে, দেয়ালচিত্রে, বুটিকে, সর্বত্র ফুটবলের দেবতা দিয়েগো ম্যারাডোনার জীবন্ত উপস্থিতি

মনে করিয়ে দেয় ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের সেই পৃথিবী মাতানো ‘শতাব্দীর সেরা গোল’-এর কথা। ১৯৮৪ সালে বার্সেলোনা ছেড়ে এসে তিনি নেপলসের এসএসসি নাপোলি ক্লাবের হয়ে খেলতে নামেন। ফলে ঝিমিয়ে পড়া এই ক্লাব দপ করে জ্বলে ওঠে। ফুটবলে পা ছোঁয়াতেই কেঁপে ওঠে ভূমি। ভূমিকম্পের সেই প্রবল ঝাঁকুনি মাঠ ছেড়ে পৌঁছে যায় নগরের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক তথা সমাজিক অঙ্গনের সর্বত্র। প্রায় দুই হাজার বছর আগে ভিসুভিয়াস যেমন কাঁপিয়ে দিয়েছিল নেপলস। ইতিহাসের সূতিকাগার ইতালির নেপলস নগরী, একজন দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা আজও বেঁচে আছেন এই নগরীতে।

বিজ্ঞাপন

সাড়ে সাত শতাব্দীর পুরোনো অথচ চিরনতুন এক দুর্গ ‘ক্যাসতেল নুওভো’

আমরা গারিবাল্ডি পাতালরেল স্টেশন থেকে ১ নম্বর লাইনের ধরে পৌঁছে গেলাম মিউনিসিপিও স্টেশনে। পাতালপুরী থেকে ওপরে উঠতেই পৌঁছে গেলাম নগরীর একদম প্রাণকেন্দ্রে। চারদিকে লোকারণ্য, একদম এক প্রাণবন্ত জনপদ। প্রথমেই চোখে পড়ল সুউচ্চ এক বিশাল দুর্গ ‘ক্যাসতেল নুওভো’ অর্থাৎ নতুন দুর্গ। ১২৬৬ সালে অঁজুর ফরাসি রাজা প্রথম শার্লস নেপলস রাজ্য জয় করেন। তিনি জমজমাট বন্দরের কাছে একটি আধুনিক এবং দুর্জেয় দুর্গ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। স্থাপত্যসৌকর্যের চমৎকার নিদর্শন এই দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু হয় সেই ১২৭৯ সালে এবং শেষ হয় ১২৮২ সালে।

অঁজুর ফরাসি রাজা প্রথম শার্লস নেপলস জয় করার পর তাঁর উদ্যোগে নির্মিত হয় এক বিশাল দুর্গ ‘ক্যাসতেল নুওভো’
অঁজুর ফরাসি রাজা প্রথম শার্লস নেপলস জয় করার পর তাঁর উদ্যোগে নির্মিত হয় এক বিশাল দুর্গ ‘ক্যাসতেল নুওভো’

প্রায় সাড়ে সাত শ বছরের প্রাচীন এবং সুরক্ষিত এই রাজপ্রাসাদ ঘিরে ঘনীভূত হয়েছে এই জনপদের বহু ইতিহাস, বহু কাহিনি। যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণার কাহিনির সঙ্গে মিশে আছে বীরত্ব, প্রেম-ভালোবাসা, গৌরবময় ঐতিহ্য, শিল্পকলা, সৃষ্টির জৌলুশপূর্ণ আখ্যান। ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী আজও এই বন্দরনগরীর অন্যতম আকর্ষণ। মানুষের নির্মিত প্রায় সাড়ে সাত শতাব্দীর পুরোনো এই বিশাল স্থাপনা ‘নতুন দুর্গ’, পর্যটকটদের চোখে আজও নতুন, আজকে এক বিস্ময়। দর্শনার্থীর জন্য এই দুর্গের বিশাল তোরণ খোলা থাকে সোমবার থেকে শনিবার। এ জন্য ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে প্রায় সব দর্শনার্থীকে মাথাপিছু গুনতে হবে ছয় ইউরো।  

গ্যালেরিয়া উমবার্তো

গ্যালেরিয়া উমবার্তো, কৌতূহলী পর্যটক এবং নগরীর নাগরিকেরা এখানে আসেন কেনাকাটা করতে এবং ইতালিয়ান কফির স্বাদ নিতে
গ্যালেরিয়া উমবার্তো, কৌতূহলী পর্যটক এবং নগরীর নাগরিকেরা এখানে আসেন কেনাকাটা করতে এবং ইতালিয়ান কফির স্বাদ নিতে

দুর্গ ছাড়িয়ে খানিকটা অগ্রসর হতেই চোখে পড়ল চোখজুড়ানো উনিশ শতকের শেষের দিকে নির্মিত আরেকটি বিশাল স্থাপনা, গ্যালেরিয়া উমবার্তো। এমন স্থাপনাটি চোখে পড়তেই বেশ বিস্মিত হলাম। কারণ, ইতালির মিলান নগরীতে ঠিক একই নকশার ইস্পাত এবং কাচের তৈরি ছাদের দৃষ্টিকাড়া স্থাপনা দেখেছিলাম। সে স্থাপনাটির নাম গ্যালেরিয়া ভিক্টর ইমানুয়েল। কারিগরি সৌকর্যে, দক্ষতার অপূর্ব নিদর্শন এই নান্দনিক এবং সুবিশাল স্থাপনা ইতালির এই দুই নগরীতে পর্যটকদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণ, নাগরিকদের মিলনকেন্দ্র। তা ছাড়া অনেকেই এখানে আসেন এই বিচিত্র এবং ভিন্ন ধরনের স্থাপত্যকর্মটি নিজের চোখে দেখতে। এই গ্যালারির মেঝেতে মোজাইকের কাজগুলো দেখার মতো। এ ছাড়া এখানে আছে নামীদামি ব্র্যান্ডের বুটিকগুলো, আছে ইতালির মজার স্বাদের সব কফির কফিশপ। ইতালির এক কাপ ক্যাফে এসপ্রেসোর আসল স্বাদ অনেক দিন মনে থাকবে। নেপলসে অথবা মিলানে বেড়াতে এসে এই চমৎকার গ্যালেরিয়াতে একবার ঢুঁ না দিয়ে ফিরে গেলে বেশ খানিকটা আক্ষেপ হবে।

পাঁচ শ বছরের পুরোনো বাড়ি

আমাদের থাকার জায়গা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, গ্যালেরিয়া উমবার্তোর কাছেই। আমরা পাতালরেল থেকে নেমে হেঁটেই সেখানে পৌঁছে গেলাম। বিশাল বহুতল ভবন। আগেরকালের দশাসই এক কাঠের দরজা ঠেলে, পাথর আর ইটে নির্মিত বিশল ভবনের সামনের চত্বরে প্রবেশ করলাম। সেখানে আলোক–স্বল্পতার কারণে, বৈদ্যুতিক বাতি জ্বললেও অন্ধকার দূর হয়নি। কেমন যেন রহস্যময় একটি বহু পুরোনো কিন্তু মজবুত এক বাড়ি। আমাদেরকে যিনি অভ্যর্থনা জানালেন, তিনি প্রথমেই আমাদেরকে বললেন, এই বিশাল ভবনটি পাঁচ শতাব্দী পূর্বে নির্মিত হয়েছিল।

গ্যালেরিয়া উমবার্তোর মেঝেতে মোজাইকের কাজগুলো দেখার মতন
গ্যালেরিয়া উমবার্তোর মেঝেতে মোজাইকের কাজগুলো দেখার মতন

এ কথাটি শোনার পর থেকেই আমার মাথায় ‘পাঁচ শতাব্দী’ কথাটি ঘুরপাক খাচ্ছিল। মনে পড়ছিল সপ্তদশ শতকে ইতালিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি মহাবিশ্বের কেন্দ্রে থেকে ‘স্থির পৃথিবীকে’ সরিয়ে সেখানে সূর্যকে স্থান দেওয়ার বৈজ্ঞানিক ধারণাকে সমর্থন করেছিলেন বলেই তৎকালীন ধর্মযাজকেরা খুবই অস্থির হয়েছিলেন। তবে এমন ভাবনা মোটেই বেশিক্ষণ আমাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। কারণ, ততক্ষণে পেটের ক্ষুধা মাথা থেকে আজগুবি সব ভাবনা দূর করে দিল। আমরা মুখ–হাত ধুয়ে অর্থাৎ একদম সতেজ হয়ে এবার দুপুরের খাবার খেতে বের হলাম।

পিৎজার জন্মস্থানে নাপোলিতা

‘পিয়াজ্জা দেল প্লেবিসিতো’র বিশাল চত্বরের আশপাশে আছে বেশ কয়েকটি পিৎজা রেস্টুরেন্ট
‘পিয়াজ্জা দেল প্লেবিসিতো’র বিশাল চত্বরের আশপাশে আছে বেশ কয়েকটি পিৎজা রেস্টুরেন্ট

পিৎজা আমাদের তিনজনেরই খুব পছন্দের। পিৎজার জন্মস্থানে পিৎজার স্বাদ আস্বাদনের খুব ইচ্ছা হলো। আমরা খানিকটা দূরে পায়ে হেঁটে গিয়ে হাজির হলাম ‘পিয়াজ্জা দেল প্লেবিসিতো’র বিশাল চত্বরে। আমরা এখানেই একটি চমৎকার সাজানো-গোছানো পিৎজার দোকানে আসন নিলাম। কথিত আছে, পিৎজা জন্ম নিয়েছিল নেপলসের রাস্তায়। সপ্তম থেকে অষ্টম শতাব্দীতে এই সুস্বাদু খাবারটি সামর্থ্যবানেরা সযতনে এড়িয়ে চলত। কারণ, তখন তা ছিল ‘গরিবদের খাবার’। সাধারণ মানুষেরা রাস্তার ধারে বসেই এমন পুষ্টিকর খাবার তৃপ্তি করে খেত। অথচ আজ এই পিৎজা ইতালীয় সুবাস নিয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে মানুষের মন জয় করছে। বর্তমানে পিৎজা পরিণত হয়েছে ইতালির একটি জাতীয় প্রতীকে।

পিৎজার জন্মস্থান নেপলসে এসে নাপোলিতার স্বাদ অনন্য
পিৎজার জন্মস্থান নেপলসে এসে নাপোলিতার স্বাদ অনন্য

আমি নিলাম একটি আস্ত পিৎজা নাপোলিতা। টমেটো, পনির মোজারেলা, রসুন, সুগন্ধি হার্ব বাসিলিক এবং অ্যাঙ্কোভিস মাছ দিয়ে সাজানো এই গরম–গরম খাবারটি টেবিলে পৌঁছাতেই ঘ্রাণের মৌতাতে মন উৎফুল্ল হলো। বিল পরিশোধ করার সময় বলা হলো, মূল বিলের ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ অর্থাৎ বকশিশ, সেটা বিলে উল্লেখ করা হয়নি। বুঝলাম যে আমাকে বিলে উল্লেখ করা অর্থের অঙ্কের সাথে এই বাড়তি অর্থ দিতে হবে। আমি বিস্মিত হলাম না। কারণ এখানে এটাই স্বাভাবিক।  (চলবে)
মইনুল হাসান: ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক।
ছবি: লেখক।

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন