
‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে বন্ধু?’
‘কবরে।’
সহকর্মী ক্রিশ্চিয়ানের মুখ দেখে মনে হচ্ছে ভিরমি খাবে। পাশে দাঁড়ানো আরেক সহকর্মী ক্লদিয়ার মুখও বিস্ময়ে হাঁ। দুজনেরই মাতৃভাষা স্প্যানিশ বলেই কিনা খাতির একটু বেশিই। ল্যাটিন কোয়ার্টার ঘুরতে বের হয়েছে। তাদেরকে ওই অবস্থায় রেখেই ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে বের হলাম হোটেল থেকে। প্যারিসে সাপ্তাহিক ছুটি দুদিন—শনি এবং রোববার। ছুটির দিনগুলো কাজে না লাগানো অপরাধ, তাই আজকের দিনের প্রথম গন্তব্য প্যারিসের বিখ্যাত কবরস্থান পের লাসেজ।

দুনিয়ার প্রত্যেক মানুষই আলাদা। একেকজনের পছন্দ একেক রকম। এই যেমন নতুন কোনো জায়গায় ঘুরতে গেলে সেখানকার প্রাচীন স্থাপনা ঘুরে দেখা আমার এক নম্বর পছন্দ। এই তালিকায় কবরস্থান নিয়ে আসার বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। সারা জীবন ভৌতিক মুভিগুলোতে কবরস্থানের বিশেষ সব দৃশ্য দেখে এসেছি। ভবিষ্যৎ লেখালেখির সুবিধার্থে একটু বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ ছাড়ব কেন? সিটাডিন হোটেল থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা চমৎকার। ৮ নম্বর মেট্রোতে চেপে রিপাবলিক স্টেশন, সেখান থেকে ৩ নম্বর মেট্রোতে করে সোজা ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় কবরস্থান পের লাসাজ।
এই কবরস্থান এমনিতেই বিখ্যাত। ১৮০৪ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এটি নির্মাণ করেছিলেন। ১১০ একর আয়তনের এই কবরস্থানে দশ লাখের অধিক মৃতদেহ সৎকার করা হয়েছে। প্রতিবছর সাড়ে তিন মিলিয়নের অধিক দর্শনার্থী এখানে ঘুরতে আসেন, ভাবা যায়?
কী আছে এখানে? চমৎকার সব স্থাপনা, সৌম্য পরিবেশ, মনোহর ফুলবাগিচা এবং বিখ্যাত সব লোকদের সমাধি। আইরিশ কবি, নাট্যকার এবং ঔপন্যাসিক অস্কার ওয়াইল্ড, মার্কিন গায়ক জিম মরিসন, হোমিওপ্যাথির আবিষ্কারক জার্মান বিজ্ঞানী হানিম্যান, ফরাসি রসায়নবিদ গে লুসাকসহ অনেকেই এখানে শায়িত আছেন। এতজনকে ছাড়িয়ে আমার চোখগুলো খুঁজছিল বিশেষ একজনের সমাধি। তিনি গিয়ম আপোলিনেয়ার। ফরাসি এই কবি বিখ্যাত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক আন্দোলন সুররিয়ালিজমের প্রবক্তা হিসেবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মাথায় কামানের গোলা খেয়েও তিনি মারা যাননি, কিন্তু হেরে গিয়েছিলেন স্প্যানিশ ফ্লুর কাছে। তাঁকে খুঁজছিলাম কারণ তিনি তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘লা সাঁজও দু মাল এইমে’তে কালিদাসের বিখ্যাত শকুন্তলা চরিত্রটিকে তুলে এনেছিলেন। বলা যায়, তাঁর মাধ্যমেই ইউরোপের সাহিত্যে শকুন্তলার অভিষেক হয়।

সংস্কৃত কবি কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’–এর বাংলা অনুবাদ করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, উচ্চমাধ্যমিকে আমাদের পাঠ্য ছিল বিধায় শকুন্তলার প্রতি সহানুভূতি ছিল; একইভাবে শকুন্তলার স্বামী দুষ্মন্তের প্রতিও একটা ক্ষোভ কাজ করত। এহেন শকুন্তলাকে যিনি ইউরোপের সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন, তাঁর প্রতি আগ্রহ থাকাটা একজন সাহিত্যপ্রেমী হিসেবে স্বাভাবিক। সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই আগ্রহটা আরও বাড়িয়ে তুলেছিলেন। বান্ধবী মার্গারিটকে নিয়ে তিনি আপোলিনেয়ারের সমাধি ঘুরে গিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, আপোলিনেয়ারকে নিয়ে অ্যালেন গিনসবার্গের লেখা একটা কবিতাও অনুবাদ করে শুনিয়েছিলেন মার্গারিটকে।
দুঃখের বিষয়, গিয়ম আপোলিনেয়ারের সমাধি আমি খুঁজে পাইনি। আগে থেকে জানা না থাকলে দশ লক্ষেরও অধিক সমাধি থেকে সেটা খুঁজে বের করা আর মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে পৃথিবীকে খুঁজে বের করা একই কথা। গাইড সার্ভিস আছে কিন্তু সেটার জন্য ভালোই পয়সা খরচ হবে। আবার একটা দল না হলে গাইড বাবাজি এককভাবে কাউকে নিয়ে ঘুরবেন না। কী দরকার এত ঝামেলার? এর চেয়ে একা একা ঘোরাই ভালো।

বাংলা সাহিত্যের আরেক দিকপালের সমাধিও কিন্তু এই প্যারিসেই আছে। তিনি লালসালুর রচয়িতা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। একটা উপন্যাস দিয়েই ভদ্রলোক বাংলা সাহিত্যে অমরত্ব নিশ্চিত করেছেন। বৈচিত্র্যময় জীবন তাঁর। প্রেমে পড়েছিলেন ফরাসি মেয়ে আন–মারির, বিয়েও করেছিলেন। শেষ জীবনে থিতু হয়েছিলেন প্যারিসে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরিতে ছোটাছুটি করতে গিয়ে অসুখ বাধিয়ে ফেলেন। দুর্ভাগ্য, স্বাধীন বাংলাদেশ দেখে যেতে পারেননি। মারা যান ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর। এই প্যারিসেরই কোনো এক কবরস্থানে তিনি ঘুমিয়ে আছেন। আফসোস, জানা নেই সেই সমাধির অবস্থান কোথায়। জানা থাকলে অবশ্যই একবার শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসতাম।
কত ডিজাইনের কবর যে দেখলাম পের লাসাজে। সরু পায়ে চলা পথের দুধারে সারি সারি সমাধি। হঠাৎ দেখলে মনে হবে রাস্তার দুপাশে সারি সারি ঘর। মনে হচ্ছে কড়া নাড়লেই ভেতর থেকে কেউ এসে দরজা খুলে দেবে। প্রকৃতপক্ষে একেকটা দরজা একেকটা সমাধির ফটক হিসেবে কাজ করছে। শোনা কথা, অনেকেই নাকি মৃত্যুর আগে কবরের ডিজাইন স্থপতিদের দিয়ে তৈরি করিয়ে নেন। বাহারি সব আকৃতি আর রঙের মিশেল কেমন যেন জীবন্ত করে তুলেছে কবরগুলোকে। এমন কাঠফাটা রোদ্দুরেই যদি গা ছমছম করে, তাহলে রাতের বেলা উড়ুক্কু ড্রাকুলার দেখা পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কবরে শায়িত মৃত ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজন যে নিয়মিতই এখানে আসেন, সেটা বোঝা যায় বিভিন্ন কবরে তাজা ফুলের উপস্থিতি দেখে। প্রথমে ভেবেছিলাম আহা, কতই না টান নিজের স্বজনদের প্রতি এখানকার বাসিন্দাদের। কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হয়েছিলাম আরও পরে। যখন জেনেছিলাম যে নিয়মিতভাবে কবরস্থান কর্তৃপক্ষকে পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে মাসোহারা দেওয়া হয় যেন প্রতি সপ্তাহে কবরগুলোকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে ফুল দেয়। যেসব কবরমালিকের পরিবার থেকে পয়সা আসে না, তাঁদের কবরের পরিচর্যাও হয় না।

ভাবতেই কেমন লাগে, যে পরিবারের জন্য সবকিছু রেখে গেলাম, সেই পরিবারই কেবল অল্প টাকা দিয়ে দায়িত্ব পালন করছে। বেশির ভাগ তো সেটাও করে না। কবরস্থান থেকে বের হওয়ার সময় তাই ভাবছিলাম, কত ক্ষুদ্র আমাদের জীবন। মরে গেলে ছারপোকাও পাত্তা দেবে না। আর এখন কতই না অহংকার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অথচ এই অহংকারের বিন্দুমাত্র দাম নেই শরীরের শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেলে। সবকিছু বোঝার পরও ধনসম্পদের আকর্ষণ আমরা ছাড়তে পারছি না। সম্ভবত একেই প্যারাডক্স অব লাইফ বলে।
ছবি: লেখক