
প্রচণ্ড পিপাসা পেয়েছে। পার্ক রয়্যাল কালেকশন হোটেলের দীর্ঘ বিরক্তিকর চেক-ইন প্রক্রিয়া শেষে কেবলই নিজের রুমে প্রবেশ করেছি। সাধারণত এসব হোটেলে দুই বোতল পানি কমপ্লিমেন্ট হিসেবে দেওয়া থাকে। পুরো ঘর তল্লাশি করে এমন কিছু না পেয়ে রিসেপশন ডেস্কে ফোন দিলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই এক ব্যক্তি নক করলেন দরজায়। ভেতরে প্রবেশ করে সোজা বাথরুমে চলে গেলেন। বিশাল বাথরুমের এক কোনায় একটা পানির কল লাগানো। সেদিকে নির্দেশ করে বললেন, ‘স্যার, এখান থেকে যত ইচ্ছা বিশুদ্ধ পানি নিতে পারবেন। পরিবেশ রক্ষা এবং অপচয় এড়ানোর জন্য আমাদের হোটেলের রুমগুলোতে পানির বোতল রাখা হয় না।’

এমন অভিনব ব্যবস্থা দেখে অজান্তেই মাতৃভাষায় বলে উঠলাম, ‘বাহ, দারুণ ব্যাপার তো।’
‘স্যার কি বাংলাদেশি? আমিও বাংলাদেশের ছেলে। ফরিদপুর বাড়ি।’
এবার ভদ্রলোকের দিকে ভালো করে তাকালাম। পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মতো বয়স হবে। সার্ভিসম্যানের পোশাক পরে হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন। বিদেশ–বিভুঁইয়ে স্বজাতির দেখা পেলে কার না ভালো লাগে! কিছুক্ষণ গল্পও হলো। জানতে পারলাম এই হোটেলে ৩০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি কাজ করেন। শুধু এ হোটেলই নয়, বুকিত বিনতাং নামের এই এলাকার প্রায় প্রতিটি হোটেল, সুপারশপ কিংবা দোকানপাটে বাংলাদেশিদের আধিক্য দেখা যাবে। যে তিন দিন হোটেলটিতে ছিলাম, তাঁর কথার সত্যতা পেয়েছি।
রাতের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত জে ডব্লিউ ম্যারিয়ট হোটেলে। ডিনারের পর ভাবলাম চারপাশটা একটু চক্কর দিয়ে নিই। নতুন জায়গা ঘুরে দেখার মাঝেও আনন্দ আছে। ম্যারিয়ট হোটেলের একদম নিচতলায় প্রবেশমুখের কাছেই পাটেক ফিলিপ ব্র্যান্ডের ঘড়ির একটা বিক্রয়কেন্দ্র আছে। ঘড়ি ও ম্যারাথনের জুতার প্রতি আলাদা প্যাশন থাকায় পাটেক ফিলিপ ব্র্যান্ডের ঘড়িগুলো দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। ছোট্ট প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র। সবচেয়ে কম দামি ঘড়িটার দাম ২৮ লাখ টাকা মাত্র(!)। ঘড়ির ডায়াল ও ভেতরের প্লেটটা ২২ ক্যারেট সোনার। পাটেক ফিলিপের হীরার ঘড়িও আছে। এগুলো কেনার যেহেতু মুরোদ নেই, তাই দেখেই শখ মেটাই।

এমনিতে বুকিত বিনতাং খুবই ব্যস্ত এলাকা। মেগা শপিং মল প্যাভিলিয়নের অবস্থানও ম্যারিয়ট হোটেলের পাশেই। এসেছিই যখন একটা চক্কর না দিলে তো হয় না। পৃথিবী বিখ্যাত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিক্রয়কেন্দ্র আছে প্যাভিলিয়নে। লুই ভিতোঁর একটা হাতব্যাগ পছন্দ করেছিলাম স্ত্রীর জন্য। মাত্র(!) ১৩ লাখ টাকা দাম দেখে চুপচাপ সটকে পড়েছি। গুচির পারফিউম ও রোলেক্সের ঘড়ির দোকানে চক্কর দিয়েও ভালো লেগেছে। লাখ টাকার নিচে কোনো ঘড়ি নেই। গুচির সবচেয়ে কম দামি সুগন্ধির ৫০ মিলি বোতলের দাম ২৮ হাজার টাকা। পিউমার একটা দৌড়ানোর জুতা পছন্দ হলো, ৩০ হাজার টাকা দাম।
‘রূপক ভাই, এসব দামি জিনিস কারা কেনে?’
সহযাত্রী আলম ভাই জীবনে প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে এসেছেন, যা দেখছেন তাতেই মুগ্ধ হচ্ছেন। তাঁকে বোঝালাম দামি জিনিস কেনার মানুষের অভাব নেই। তা না হলে এসব দোকান বহু আগেই বন্ধ হয়ে যেত।

প্যাভিলিয়ন থেকে বের হয়ে উবার ভাড়া করে চললাম টুইন টাওয়ার দেখতে। মালয়েশিয়া আসব আর টুইন টাওয়ারকে পেছনে রেখে ছবি তুলব না, সেটা হয় নাকি! উবার ড্রাইভার যখন টুইন টাওয়ারের সামনে নামিয়ে দিল, তখন রাত ১২টা। মাঝরাতেও এখানে লোকের ভিড় কমেনি। প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারদের আনাগোনা চোখে পড়ল। একজন এসে আমাদের অফার দিল ৩০ রিঙ্গিতের বিনিময়ে ছবি তুলে দেওয়ার।
দামাদামি করে সেটাকে ১৫ রিঙ্গিতে নামিয়ে আনা হলো। ফটোগ্রাফার ভদ্রলোক এমন এক জায়গায় আমাদের দাঁড় করালেন, যেখান থেকে পুরো শরীরের ব্যাকগ্রাউন্ডে টুইন টাওয়ার চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। ফেসবুকে ছবিটা পোস্ট করার পর জানতে পারলাম মাসখানেক আগে বাংলাদেশি নায়িকা পরীমনি এই স্থানে দাঁড়িয়েই ছবি উঠিয়েছিলেন। বন্ধুরা খোঁচা দিতে ছাড়ল না, ‘কিরে, পরীমনি আর তুই প্ল্যান করে বেড়াতে গেছিস নাকি?’ ধরণি দ্বিধা হও, আমি জাম্প দিই।

প্রায় ১ হাজার ৫০০ ফুট লম্বা টুইন টাওয়ার বানানো হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। ২০০৪ সালের আগপর্যন্ত এটিই ছিল পৃথিবীর সর্বোচ্চ জোড়া ভবন। সপ্তাহে ছয় দিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এখানে ভ্রমণ করা যায়। ৮৬ তলার অবজারভেশন ডেক থেকে পুরো কুয়ালালামপুর শহরের প্যানারোমিক দৃশ্য দেখা যায়। ৪১ ও ৪২ তলায় আছে বিখ্যাত স্কাই ব্রিজ, যেখানে শাহরুখ খান ‘ডন’ সিনেমার শুটিং করেছিলেন। একদম নিচে টাওয়ারকে ঘিরে আছে ১৭ একরের পার্ক। একটা মজার তথ্য জানতে পারলাম। টুইন টাওয়ারে ৩২ হাজার কাচের জানালা আছে, যেগুলো পরিষ্কার করতে পাক্কা দুই মাস সময় লাগে। শুধু তা–ই নয়, এই টাওয়ারের ভিত্তি ৩৭৪ ফুট গভীর, যা কিনা পৃথিবীর যেকোনো ভবনের মধ্যে গভীরতম।
পরদিন সারা সকাল বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে দুপুরের খাবারের পর সবাই গেল বিশ্রাম নিতে। আমি বেরিয়ে পড়লাম গাড়ি নিয়ে। এই সুযোগে শহরটাকে নিজের মতো করে দেখার। কুয়ালালামপুর শহরটা বেশ পরিচ্ছন্ন। সুপ্রশস্ত রাস্তার মাঝখানে এবং দুপাশে গাছের সারি। একেকটা জায়গা পার হচ্ছি আর সরণ, মানে গাড়িচালক, সেগুলোর বর্ণনা দিচ্ছে। সে যেহেতু ভারতীয় বংশোদ্ভূত, তাই লিটল ইন্ডিয়া নামক স্থানে কয়েকবার চক্কর দিল। মালয়েশিয়াতে সবচেয়ে বেশি অভিবাসী এসেছে ভারত থেকে। নরেন্দ্র মোদি মালয়েশিয়া ভ্রমণে এসে এখানে এসেছিলেন এবং একটা গেট উদ্বোধন করে গেছেন। মোটেই আহামরি গোছের না হলেও সরণ যেই উচ্ছ্বাস নিয়ে বলছিল, সেটা দেখার মতো। জাতীয়তা মালয়েশিয়ান হলেও ভারত তার মনে গভীরভাবে প্রোথিত আছে।

অনেকেই পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারকে মালয়েশিয়ার উচ্চতম ভবন ভেবে ভুল করে। জোড়া ভবন হিসেবে টুইন টাওয়ার উচ্চতম হলেও একক ভবন হিসেবে সেই খেতাব ছিনিয়ে নিয়েছে মারদেকা টাওয়ার। ২ হাজার ২২৭ ফুট লম্বা মারদেকা টাওয়ার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উচ্চতম এবং দুবাইয়ের বুর্জ খলিফার পর পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভবন। মালয় ভাষায় মারদেকা মানে স্বাধীনতা। টাওয়ারের পাশেই যেই মারদেকা স্টেডিয়ামটি আছে সেটির নামেই টাওয়ারটির নামকরণ হয়েছে। এ স্টেডিয়ামেই ১৯৭৩ সালে মারদেকা কাপ ফুটবলের আয়োজন হয়েছিল, যেটি ছিল বাংলাদেশের জন্য প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ।
আমাদের পরের গন্তব্য মারদেকা চত্বর। চত্বরে পৌঁছানোর আগে একটা ভবন চোখে পড়ল। মুরিশ স্থাপত্যরীতির এই দ্বিতল ভবনটি পাশের যেকোনো ভবন থেকে দেখতে আলাদা। সরণের কাছ থেকে জানা গেল এটি মালয়েশিয়ার টেক্সটাইল মিউজিয়াম। ১৯০৫ সালে যখন ভবনটি তৈরি হয় তখন সেটি ছিল ব্রিটিশ মালয় সরকারের রেলওয়ে প্রশাসন ভবন। এরপর কালে কালে পানি ভবন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, হাইকোর্ট—বিভিন্ন কাজে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। মাত্র পাঁচ রিঙ্গিত প্রবেশমূল্য দিয়ে পুরোটা ঘোরা যায়, তবে আগ্রহ হয়নি।

মারদেকা চত্বরটা চমৎকার। এখানেই ১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট মধ্যরাতে ২০ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে মালয়েশিয়ার পতাকা উড়িয়েছিলেন রয়্যাল মালয় নেভির তিনজন কর্মকর্তা। ৩৯৫ ফুট দীর্ঘ পতাকাদণ্ডটি পৃথিবীর অন্যতম উঁচু পতাকাদণ্ড। সকাল সাড়ে ৯টায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী টুংকু আবদুল রহমান। উপস্থিত জনতা গর্জে ওঠে ‘মারদেকা’ বা ‘স্বাধীনতা’ বলে। পতাকাদণ্ডের ভিত্তিতে সেই ঘটনার একটি মোজাইক চিত্র অঙ্কিত আছে। মারদেকা চত্বরে একসময় ক্রিকেট খেলা হতো। ক্রিকেট খেলা আপাতত বন্ধ থাকলেও প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবসের প্যারেড এখানেই অনুষ্ঠিত হয়।
কুয়ালালামপুর শহরের ভেতর দিয়ে দুটি নদী প্রবাহিত হয়েছে। ক্লাং ও গম্বাক নদী।
মারদেকা চত্বর থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে নদী দুটি একসঙ্গে মিলেছে। দুই নদীর একীভূত ধারার নাম দেওয়া হয়েছে রিভার অব লাইফ বা জীবনদায়ী নদী। যে মোহনায় নদী দুটি এক হয়েছে, সেই জায়গায় আছে শতাব্দীপ্রাচীন জামেক মসজিদ। এ জায়গাটিকে কুয়ালালামপুরের কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। কারণ, শহরটির ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল এখানেই। আমার নজর কেড়েছিল জীবনদায়ী নদীর সঙ্গে লাগোয়া হেরিটেজ ভবনের ম্যুরালচিত্র। বলা চলে, পুরো মালয়েশিয়ার ইতিহাস–ঐতিহ্য, ব্যবসা, কলোনিয়াল সময় এবং নদীমাতৃক জীবনধারা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তিনতলা ভবনের প্রতিটি ইঞ্চিতে। এখন পর্যন্ত কুয়ালালামপুরে যা কিছু দেখেছি, সবচেয়ে ভালো লেগেছে এই ম্যুরালচিত্র।

কুয়ালালামপুরে ধনীদের জন্য যেমন আছে ব্র্যান্ডের বাহারি সব দোকান, তেমনি মধ্যবিত্তদের জন্য আছে হানিফা স্টোর। জালান মসজিদ এলাকার হানিফা স্টোরের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। যাঁরা চকলেট কিনতে চান তাঁদের জন্য হানিফা এক স্বর্গরাজ্য। কত রকমের চকলেট যে আছে, সেটা এখানে না আসলে বুঝতেই পারতাম না। সাবান, শ্যাম্পু কেনার জন্যও মানুষজন ভিড় করেন এখানে। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে হানিফা স্টোরের বাইরে যে ফাঁকা জায়গাটা আছে সেখানে প্রচুর বাংলাদেশি আড্ডা দেন। বেশ সস্তায় ট্রলিব্যাগ পাওয়া যায় সংলগ্ন দোকানগুলোতে। মোদ্দা কথা, পকেটে যদি টাকার আধিক্য থাকে তাহলে ব্র্যান্ডের দোকানে যান, না হলে চোখ বন্ধ করে হানিফায় ঢুকে যান।
হোটেলে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। প্রবেশপথে যে ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে তার বাড়িও বাংলাদেশে। নাম জুনায়েদ। এখানকার একটা কলেজে পড়াশোনা করছে। সেই সঙ্গে পার্ক রয়্যাল হোটেলে পার্টটাইম কাজ করছে। থাকে শহরের বাইরে। যে কদিন কাজ থাকে মেট্রোতে করে আসে, কাজ করে রাতে আবার চলে যায়।

হোটেলের ঠিক পাশেই মেট্রোস্টেশন থাকায় তাঁর জন্য খুব সুবিধা হয়েছে। বাসায় অল্প করে হলেও নিয়মিত টাকা পাঠায়। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কষ্ট হয় কি না। হেসে উত্তর দিল, ‘কষ্ট না করলে কি আর ওপরে উঠতে পারব স্যার?’ এমন অসংখ্য জুনায়েদের শ্রমে আর ঘামে উপার্জিত রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে টিকে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। জুনায়েদরা তো দেশের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করছে, বাংলাদেশ সরকার কি তাদের মতো প্রবাসীদের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করছে?
ছবি: লেখক