গিলপিনের ভোর থেকে ক্যাসলরিগের প্রাচীন পাথরে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ভোররাতে গিলপিনের অবিশ্রান্ত জলধারা আর পাখির কূজনে ঘুম ভাঙল। এমন কবিতার মতো ভোর কি হেলাফেলায় কাটিয়ে দেওয়া যায়? এক কাপ ধূমায়িত চা নিয়ে তাই বসে পড়লাম কটেজের সামনেই, মিষ্টি গিলপিন ব্রিজের লাগোয়া আমাদের জন্য পেতে রাখা গোল টেবিলে।

গিলপিনের পাড়ে বসে মৌনির আঁকাআঁকি
গিলপিনের পাড়ে বসে মৌনির আঁকাআঁকি

প্রভাতের নরম রোদে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে পড়ছিলাম বার্নার্ড কর্নওয়েলের ‘ডেথ অব কিংস’। যদিও এমন আবহে রবীন্দ্রনাথ কিংবা আমার প্রিয় কবি জীবনানন্দের কোনো কবিতা পড়তে পারলে আনন্দটা হয়তো আরও গভীর হতো। সর্বশেষ এমন সকাল হয়তো এসেছিল কোনো এক কলেজবেলায়—শেষ অঘ্রানের শুকনা খড়ের ওপর আরাম করে বসে, মিষ্টি রোদের উষ্ণতায় পড়েছিলাম উইলিয়াম শেকস্‌পিয়ারের ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’।

বিজ্ঞাপন

সেই স্মৃতির পথ ধরে হঠাৎ যেন ফিরে গেলাম আরডেনের সেই অরণ্যে। শেকস্‌পিয়ারের নাটকে রাজদরবারের ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর নির্বাসনের জীবন পেরিয়ে চরিত্রগুলো আশ্রয় নেয় ফরেস্ট অব আরডেনে। সেখানে রোজালিন্ড, তার প্রিয় সখী সেলিয়া এবং নির্বাসিত সিনিয়র ডিউক খুঁজে পায় এক ভিন্ন জীবনের স্বাদ। রোজালিন্ড ছদ্মবেশ নেয় গ্যানিমেড নামের এক তরুণের; আর সেই ছদ্মবেশের আড়ালেই শুরু হয় ওরলান্ডোর সঙ্গে তার প্রেমের এক মায়াময় খেলা।

রোজালিন্ডের প্রেমে পড়ে ওরলান্ডো গাছের গায়ে গায়ে তার নামে প্রেমের কবিতা লিখে রাখে; আর গ্যানিমেড সেজে রোজালিন্ড সেই ওরলান্ডোকেই প্রেম শেখানোর অভিনয় করতে থাকে। প্রেম, ছদ্মবেশ, ভুল–বোঝাবুঝি আর রসিকতার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত উন্মোচিত হয় মানুষের আসল পরিচয় এবং হৃদয়ের সত্যিকারের আকাঙ্ক্ষা। ভুল–বোঝাবুঝির অবসান হয়, প্রেম তার কাঙ্ক্ষিত পরিণতি পায়; আর অরণ্যের জীবন হয়ে ওঠে নতুন করে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক আশ্রয়।

বিজ্ঞাপন

সেই কলেজবেলার বইটির কথা মনে করতে করতে গিলপিনের দিকে তাকালাম। সামনে ছোট্ট সেতু, নিচে স্বচ্ছ জলের অবিরাম স্রোত, দূরে সবুজ পাহাড় আর মাথার ওপর নরম সকালের আলো। মনে হলো, জীবন সত্যিই এক অদ্ভুত বুমেরাং—কবেকার সেই অঘ্রানের সকাল আর শুকনা খড়ের গন্ধ যেন ফিরে এসেছে ক্রসথওয়াইট ভ্যালির এই নীরব সকালে।

মহাভারতের প্রস্থান পর্বের মতো

সময় তখন প্রায় ১১টা। এবার বেরোতে হবে ডারওয়েন্টওয়াটারের পথে। সঙ্গে দেখব কেসউইক এবং পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো নিওলিথিক যুগের ক্যাসলিরগ স্টোন সার্কেল। এটা ব্রিটেনের অন্যতম প্রাচীন ও রহস্যময় পাথরের বৃত্ত। কটেজ থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ; কিন্তু এই পথকে শুধু ‘ড্রাইভ’ বলা যায় না। গাড়ি চালানোর সময় রাস্তার দিকে যেমন চোখ রাখতে হয়, তেমনি দুই পাশের প্রকৃতি থেকে চোখ ফেরানোও কঠিন। মনে হচ্ছিল, আমি যেন মহাভারতের প্রস্থান পর্বের কোনো এক যাত্রী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর দীর্ঘকাল হস্তিনাপুর শাসন করেছিলেন পাণ্ডবরা; কিন্তু একসময় রাজ্য, প্রাসাদ, প্রতিপত্তি ও আয়েশি জীবন ত্যাগ করে তাঁরা বেরিয়ে পড়েছিলেন মহাপ্রস্থানের পথে। মহাকাব্যের সেই যাত্রায় ছিল পর্বত, নদী, তুষার আর অজানা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলার এক গভীর বৈরাগ্য। আমাদের যাত্রা অবশ্য স্বর্গের উদ্দেশে নয়; তবু সামনে যে দৃশ্য খুলে যাচ্ছিল, তাতে সেই মহাপ্রস্থানের কথা মনে না পড়ে উপায় ছিল না।

আমার টয়োটা কখনো পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে উঠছে, কখনো ঢাল বেয়ে নেমে যাচ্ছে গভীর উপত্যকায়। একের পর এক পাহাড়—স্কাফেল, হেভেলিন, বাওফেল দূরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও দু-একটি ছোট লোকালয়, তারপর আবার নিঃসঙ্গ প্রকৃতি। মাঝেমধ্যে একটি-দুটি গাড়ি এসে সেই বিশাল নৈঃশব্দ্যকে সামান্য ভেঙে দিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে দূরের বাঁকে। পাহাড় যত এগিয়ে আসছিল, মানুষের পৃথিবী যেন তত পিছিয়ে যাচ্ছিল।

পাঁচ হাজার বছরের নীরবতা

দুপুর একটা নাগাদ আমরা পৌঁছলাম ক্যাসলরিগের পাথরের বৃত্তে। বিস্তৃত পাহাড়ি প্রান্তরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পাথরগুলো প্রথম দর্শনেই মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করে। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে নব্যপ্রস্তর যুগের কৃষিজীবী মানুষেরা এই পাথরগুলো এখানে এনে বৃত্তাকারে স্থাপন করেছিল। কেন তারা এমন করেছিল, তার নিশ্চিত উত্তর আজও ইতিহাসের কাছে নেই। আশপাশের পাথরগুলো সংগ্রহ করে বহু মানুষের সম্মিলিত শ্রমে এখানে দাঁড় করানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সম্ভবত ধর্মীয় আচার, ঋতুচক্র, সূর্যের গতিপথ কিংবা কোনো পবিত্র সমাবেশের সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল।

পাথরের হেলান দিয়ে লেখক
পাথরের হেলান দিয়ে লেখক

কিন্তু ইতিহাসের তথ্য যতটা বলে, মানুষের কল্পনা তার চেয়েও অনেক দূর যায়। সেই পাথরগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আমার ভেতরটা কেমন যেন আবেগে ভরে উঠল। পাঁচ হাজার বছর আগে যেসব মানুষ এই পাথর টেনে এনে এমন এক বৃত্তে দাঁড় করিয়েছিল, তাদের নাম আমরা জানি না, ভাষা জানি না, জানি না কী প্রার্থনা নিয়ে তারা এখানে সমবেত হতো।

অথচ তাদের ছুঁয়ে যাওয়া সেই পাথরের গায়ে হাত রাখতেই মনে হলো—সময়কে পেরিয়ে যেন ছুঁয়ে এলাম কোনো অচেনা পূর্বপুরুষের করোটি।

এই পাথরগুলো শুধু পাথর নয়। এগুলো মানুষের প্রথম বিস্ময়, প্রথম আকাশপাঠ, ঋতুচক্র বোঝার প্রথম প্রয়াস এবং কোনো এক অজানা পবিত্রতার স্মারক। সভ্যতা বদলেছে, ভাষা বদলেছে, মানুষ বদলেছে; কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হওয়ার যে মানবিক অনুভূতি, তা বোধ হয় পাঁচ হাজার বছর পরও অবিকল রয়ে গেছে। আজ সেই নীরব পাথরগুলো দাঁড়িয়ে আছে—প্রাচীন মানুষের বিশ্বাস, আকাশপাঠ এবং অজানা আচার-অনুষ্ঠানের হাজার বছরের রহস্য বুকে নিয়ে।

সময় থমকে আছে যেখানে
সময় থমকে আছে যেখানে

আরুষি আর আরিয়া জায়গাটি দেখে খুব আনন্দ পেল। বিশেষ করে আরুষি প্রতিটি পাথর ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তাকে দেখে হঠাৎ মনে হলো, পাঁচ হাজার বছর আগের কোনো শিশু হয়তো এমন করে কোনো পবিত্র পাথর ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দাবদাহে ক্লান্ত পৃথিবীর জন্য বৃষ্টির প্রার্থনা করতে।

সময়ের ব্যবধান পাঁচ হাজার বছর। শিশুটির মুখ আমরা জানি না, তার ভাষাও জানি না; কিন্তু তার প্রার্থনা আর আজকের শিশুর বিস্ময়ের মধ্যে যেন কোথাও একটি অদৃশ্য সেতু রয়ে গেছে।

ডারওয়েন্টওয়াটারের পথে

ইতিমধ্যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সকালের নাশতা একটু দেরিতে করায় ক্ষুধা তখনো তেমন মাথাচাড়া দেয়নি। তাই সিদ্ধান্ত হলো এবার যাওয়া যাক কেনউইকে। ডারওয়েন্টওয়াটারের তীরে পৌঁছতেই আবার বদলে গেল দৃশ্যপট। পাহাড়ঘেরা নীল জল, দূরে সবুজ ঢাল; আর হ্রদের ওপর নরম  আলো। লেক ডিস্ট্রিক্ট যেন প্রতিবারই নতুন কোনো দৃশ্যপট খুলে দেয়। হ্রদপাড়ের ক্যাফে হোপে বসে হলো আমাদের মধ্যাহ্নভোজন। দীর্ঘ পথ, পাহাড়ি দৃশ্য আর ক্যাসলরিগের পাঁচ হাজার বছরের নীরবতার পর সেই খাবার যেন ছিল দিনের আরেকটি ছোট্ট আনন্দ। তারপর কেসউইকের সুপারমার্কেট থেকে প্রয়োজনীয় কিছু বাজার-সদাই সেরে নিলাম। দিনের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। ফেরার পথ শুরু হলো।

ডারওয়েন্টওয়াটারের কেসউইক লেক
ডারওয়েন্টওয়াটারের কেসউইক লেক

পেছনে রয়ে গেল ডারওয়েন্টওয়াটারের নীল জল, ক্যাসলরিগের প্রাচীন পাথর আর গিলপিনের সেই কবিতার মতো সকাল। সামনে আবার দীর্ঘ পথ—পরিচিত ঘরের দিকে। তবে মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটি দিন পার করে ফিরছি না; সঙ্গে করে নিয়ে ফিরছি পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো কিছু নীরবতা, একটি পাহাড়ি নদীর সুর, শেকস্‌পিয়ারের আরডেনের অরণ্য আর এক শিশুর মতো বিস্মিত হয়ে পৃথিবীকে দেখার ক্ষমতা।
লেখক: ড. অসীম চক্রবর্তী,  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বায়োমেডিক্যাল ইনফরমেটিকস বিষয়ের শিক্ষক ও গবেষক, এংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ, যুক্তরাজ্য।
ছবি: লেখক

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন