চিলি: এক দেশ, বহু পৃথিবী ৬
শেয়ার করুন
ফলো করুন

মঙ্গল গ্রহের ম্যাজিক বাস

চিলির সান্তিয়াগোতে যে হোস্টেলে উঠেছিলাম, সেটির ম্যানেজার একজন নারী। তাঁর নাম বারবারা। বারবারা একটা সাদা কাগজ টেনে নিলেন। কলম তাঁর হাতেই ছিল। আমি উল্টা দিকের চেয়ারে বসেছিলাম তাঁর অফিস কক্ষে।

বারবারা জানতে চেয়েছিলেন, ‘আপনি আগামীকাল কালামায় গিয়ে কোথায় থাকবেন, মহুয়া?’

আমি বলেছিলাম, ‘কালামায় এয়ারপোর্টের কাছেই একটা হোস্টেল নিয়েছি। আমি কালামা থেকে আতাকামা মরুভূমির ভ্যালি ডি লা লুনা দেখতে যাব।’

বিজ্ঞাপন

বারবারা বলেছিলেন, ‘আপনি ভুল জায়গায় হোস্টেল বুকিং দিয়েছেন। কালামা শহর থেকে আতাকামা মরুভূমির বিস্ময় দেখার অসুবিধা অনেক। আতাকামা মরুভূমি দেখতে গেলে আপনি এয়ারপোর্ট থেকেই সরাসরি প্রথমে সান পেদ্রো দে আতাকামা শহরে চলে যাবেন এবং সেখানে কোনো হোস্টেল নেবেন। সান পেদ্রো দে আতাকামা চিলির একেবারে উত্তরে, চিলি-বলিভিয়া সীমান্তে। এয়ারপোর্ট থেকে সেই জায়গার দূরত্ব বাসে এক ঘণ্টার বেশি। পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমি এই আতাকামা। রাতে কিন্তু বেশ ঠান্ডা পড়ে, শীতের কাপড় নিয়েছেন তো?’

চিলির আতাকামার মরুভুমির ‘ভ্যালি ডি লা মুয়েরতে’
চিলির আতাকামার মরুভুমির ‘ভ্যালি ডি লা মুয়েরতে’

বারবারা কাগজে বেশ বড় অক্ষরে কিছু সাধারণ নির্দেশনা লিখে দিয়েছিলেন, যাতে আমার সুবিধা হয় এবং বলেছিলেন, ‘ভ্যালি ডি লা মুয়েরতে’, ‘ভ্যালি ডি লা লুনা’ ও ‘ফ্লোটিং লেগুন’ কোনোভাবেই যেন মিস না করি।

বিজ্ঞাপন

আজ আতাকামায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বৈরী আবহাওয়ার কারণে ভ্যালি ডি লা মুয়েরতের ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। অর্থাৎ এখন পর্যটকেরা সেখানে যেতে পারবেন। আবহাওয়া নাকি ভালো। ট্যুর এজেন্সির অফিসে গিয়ে একটা ট্যুর প্যাকেজ নিয়ে নিলাম।

পরদিন সকালে গাড়িতে চড়ে বসতেই গাইড গল্প বলতে শুরু করলেন। তিনি বলছেন, ‘ভ্যালি ডি লা মুয়েরতে’–এর অর্থ মৃত্যু উপত্যকা। ব্যাপারটা এমন নয় যে এখানে অনেক মানুষ মারা গেছে, ব্যাপারটা হলো যেহেতু টানা ১০০ বছর এখানে একফোঁটা বৃষ্টি হয়নি, কোনো গাছগাছালি নেই, মাটিতে নুন, বাতাসে তীব্র গরম, তাই একে মৃত্যুপুরীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

আমাদের গাড়ি চলছে, তাঁর গল্পও পেখম মেলছে। গাইড বলে যাচ্ছেন, ‘মনে করেন, আমরা মঙ্গল গ্রহের দিকে যাচ্ছি। আমাদের গাড়ি পৃথিবী বিচ্ছিন্ন হয়ে ভিনগ্রহের পথে চলছে। দুই ধারে লালচে-বাদামি পাহাড়। পাহাড়গুলো বেশি উঁচু নয়। এখানে কোনো মানুষ নেই, ঘর নেই, বসতি নেই। এখান থেকে আপনাদের নিয়ে যাব এক ম্যাজিক বাস দেখাতে। সেটাও মঙ্গলের কাছাকাছি।’

চিলির আতাকামার মরুভুমির ‘ভ্যালি ডি লা মুয়েরতে’—এ লেখক
চিলির আতাকামার মরুভুমির ‘ভ্যালি ডি লা মুয়েরতে’—এ লেখক

ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে গন্তব্যে পৌঁছে বাস থেকে মাটিতে কদম ফেলেই মনে হচ্ছে, সত্যি সত্যি মঙ্গল গ্রহে নেমেছি। গাইডকে অনুসরণ করে যে পাহাড়ে উঠছি, তার চূড়ায় সরু পথ, দুই পাশ ঢালু। ভূগোলের ভাষায় একে বলে রিজ। একবার যদি পিছলে এই ঢাল বেয়ে পড়ি, তবে এ জীবনে এই দেহঘড়ি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। চারদিকে লালচে শিলা আর বালু। এখানে–সেখানে আরও জমে উঠেছে বালুর উঁচু ঢিবি পাহাড়ের মতো আকৃতি নিয়ে। এদের বালিয়াড়ি বলে। বালিয়াড়ি এড়িয়ে হাঁটছি। এখানে পা পড়লে পা দেবে যায় হাঁটু পর্যন্ত।

এক দম্পতি বছর দেড়েকের এক বাচ্চা নিয়ে এসেছে। এরা পারেও! এ বাচ্চা দেখি কাঁদেও না। কখনো বাপের কোলে কখনো মায়ের। আর আমরা পাতানো পর্যটক মামা-খালারা তো আছিই। দিব্যি আছে বাচ্চাটি। আমি হাত বাড়াতেই আমার কোলেও এল সে।

চিলির আতাকামার মরুভুমির ‘ভ্যালি ডি লা মুয়েরতে’—এ পর্যটকের দল
চিলির আতাকামার মরুভুমির ‘ভ্যালি ডি লা মুয়েরতে’—এ পর্যটকের দল

আমি একদিন হোস্টেলের ম্যানেজারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘ব্যাপার কী বলত, আপনাদের বাইরের চেয়ে গরম কিছুটা কম রুমে।’ তিনি বলেছিলেন, কক্ষের দেয়ালগুলো পাথরের তৈরি, দেয়ালের ওপর প্রলেপ দেওয়া হয়েছে মাটির। ফলে শীতে কক্ষ খানিকটা গরম আর গরমের দিনে আরামবোধ হয়। এটাই নাকি আতাকামার বাড়িঘর তৈরির স্থানীয় প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তিকে বলে পুকারা। পুকারা একটি কেচুয়া শব্দ। যাহোক, আমি পাহাড়চূড়ায় বসেই পড়লাম। আমার আর পা চলছে না। চারদিকে যত দূর চোখ গেল একফোঁটা সবুজের চিহ্ন নেই।

সূর্যের যে আছে মঙ্গল গ্রহ, সেখানে এখনো যদিও মানুষ যেতে পারেনি, শুধু গেছে রোবট ও রোভার; কিন্তু পৃথিবীর এ ‘মঙ্গল গ্রহে’ হেঁটে বেড়িয়ে মন আনন্দে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। আকাশে তাকালে মনে হয়, এই বুঝি নাসার কোনো রোভার এখনই পাশ দিয়ে চলে যাবে। এ কারণেই কথিত আছে, মহাকাশ গবেষণার যন্ত্রপাতি পরীক্ষার জন্য আতাকামার মতো জায়গা বেছে নেওয়া হয়।

আতাকামা মরুভুমির ‘ভ্যালি ডি লা মুয়েরতে’ এ পরিত্যক্ত বাস
আতাকামা মরুভুমির ‘ভ্যালি ডি লা মুয়েরতে’ এ পরিত্যক্ত বাস

একসময় আমরা সবাই গাইডের ডাকে আবার গাড়িতে উঠে এলাম। এবার সত্যি সত্যি গাইড আমাদের পুরান মরিচা ধরা একটা বাসের সামনে নামিয়ে দিল। এ তো সত্যই ম্যাজিক! এই দূর মুলুকে এই জং ধরা বাসটির সঙ্গে লাতিন জাদুবাস্তবের মিল পাচ্ছি। গাড়ি তো নয়, যেন লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতার গল্প—শিল্পীরা আবার যেমন খুশি তেমন এঁকেছে এর গায়ে। একে গ্রাফিতি—আঁকা একটি আর্ট—অবজেক্টে পরিণত করেছে। বাসটি নাকি মরুভূমির অদ্ভুত আকর্ষণের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এগিয়ে এর কাছে গেলাম। নিস্তব্ধ প্রকৃতির বিপরীতে এর রং, রূপ, অবয়ব নিখুঁত গল্পের পটভূমি তৈরি করেছে।

লাতিন জাদুবাস্তবতার সব অসম্ভব যেমন স্বাভাবিক, এই ম্যাজিক বাস তা–ই। এ গাড়ি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের একশ বছরের নিঃসঙ্গতা নিয়ে বসে আছে এখানে। মারিও ভার্গাস য়োসার গল্পের হঠাৎ অস্বস্তিকর বাস্তবতার সঙ্গে আমি এর মিল পাচ্ছি।

‘ভ্যালি ডি লা মুয়েরতে’—এ ট্যুর এজেন্সির দেওয়া খাবার
‘ভ্যালি ডি লা মুয়েরতে’—এ ট্যুর এজেন্সির দেওয়া খাবার

গাইড কিছু খাবার নিয়ে এসেছিলেন। সূর্যাস্তের মুহূর্তটি উপভোগ করলাম সুস্বাদু পানীয় আর খাবার দিয়ে। আতাকামার অদ্ভুত ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং নাটকীয় ও সিনেমাটিক ল্যান্ডস্কেপ দেখতে দেখতে আমরা এই মঙ্গল মৃত্যুপুরী থেকে বেরিয়ে এলাম একসময়।
ছবি: লেখক

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৫: ০০
বিজ্ঞাপন