
আতাকামার সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন শহর হল ‘সান পাদ্রু দে আতাকামা’। এ শহরে কোনো উঁচু দালান নেই। শহরের প্রধান অংশে সব এক চালা মাটির ঘরের দোকান। পণ্য বিক্রির দোকানের চাইতে ট্যুর এজেন্সির অফিস বেশি। সব রাস্তা মাটির। একটা ট্যুর এজেন্সি অফিসে ঢুকে ‘ভ্যালি ডি লা লুনা’ আর ‘ফ্লোটিং লেগুন’ ভ্রমণের দুটি প্যাকেজ বুকিং দিলাম। ফিরে এসে দিলাম ঘুম।
মরুভূমির ঝড়ের শব্দে ঘুম ভাঙলো আমার। হোয়াটসআপে খুদে বার্তা এসেছে ট্যুর এজেন্সি থেকে। স্প্যানিশে লেখা। আমি সেটা গুগল ট্রান্সলেটরে ফেলে অনুবাদ করলাম। তারা লিখেছে, “আতাকামা মরুভূমিতে অতি বৈরী আবহাওয়ার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সকল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পরবর্তী অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। তুমি হয় তোমার ভ্রমণ রিশিডিউল করতে পারো অথবা তোমার টাকা ফেরত নিয়ে যেতে পার।“
আমার ভ্রমণ ভোগান্তির ষোলকলা পূর্ণ হলো। আমরা কয়েক হাজার পর্যটক আতাকামায় আটকা পড়লাম। পাঁচ মাস আগে পেরু গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি রেল ধর্মঘট। সেখান থেকে গেলাম বলিভিয়া। সেখানে গিয়ে পেলাম হরতাল। বলিভিয়া থেকে গেয়েছিলাম আর্জেন্টিনা। সেখানে পেলাম গণআন্দোলন। আমি যেদিন গেলাম সেদিন তো এক মন্ত্রীই পদত্যাগ করে বসলো। যদি আমি কুসংস্কারে বিশ্বাস করি, তবে আমি অপয়া!
মরুভুমির ঝড় দেখতে দেখতে রাত গেলো। আমার কিছু খাবার কিনতে হবে। আমার সব খাবার-দাবার শেষ। দেখি দোকান খুঁজে বের করি। এখানকার মরু ঝড় আমাদের বৈশাখী ঝড়ের মতো। আসতে যেমন বেশি প্রস্তুতি নেয় না, চলেও গেলো তিন ঘণ্টা পর। সন্ধ্যের আগে আগে তার তান্ডব থামলো। রাস্তা কর্দমাক্ত। আমি একজোড়া স্যান্ডেল পরে বেরিয়ে পড়লাম। যে রাস্তা ধরে হাঁটছি তাঁর নাম কাহে কারাকলিস (Calle Caracoles)। ঘরবাড়ি বা স্যুভেনিরের দোকান সব দেখতে একচালা মাটির ঘরের মতো। আমার হোস্টেলের পাশের হোস্টেলটির পাশে দাঁড়িয়ে ফাঁকফোকর দিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করছি। বেশ আলো-ঝলমল। যেন সুনীলের কবিতার ‘রাস উৎসব’ চলছে সেখানে। এমন দুর্যোগে বাদ্যবাজনা বেজেই চলছে বেজেই চলছে।
কাহে কারাকলিস রাস্তাকে মরুভুমির এক মানবিক রাস্তা মনে হচ্ছে। এখানে নারীপুরুষে ভেদাভেদ নেই , আদি আর বর্তমানে নেই কোন্দল। এখানে কোন নারীকে কুণ্ঠিত হয়ে হাঁটতে হয় না। নিজের শরীরকে দুমড়ে মুচড়ে লুকানোর চেষ্টা করতে হয় না। দুপাশে ঘরগুলি হালকা মাটির-বাদামি। রঙের অনুপস্থিতিই এখানে সৌন্দর্য। কাঠের দরজা আর জানালায় বয়সের দাগ লেগে আছে। ওদের আছে নিজস্ব গল্প যা তারা লুকিয়ে রেখেছে। ছোট ছোট ক্যাফে থেকে ভেসে আসছে কফির সুবাস।
দূর থেকে উঁকি দিচ্ছে এখানকার একটি পুরানো চার্চ—মোটা দেওয়াল, সাদা চুনের প্রলেপ। তার সাদামাটা সরলতার মধ্যেও আছে শতাব্দীর ভার। এটি চিলির প্রাচীনতম চার্চগুলোর একটি। ভেতরে তার নিঃশব্দ প্রার্থনার আমেজ। চার্চের পাশে পুরানো কবরফলক। এখানে চার্চ আছে কিন্তু ধর্ম জাঁকজমক নয়। একদিকে রাস্তার কোলাহল আর অন্যদিকে চার্চের নীরবতা— এই দুয়ের মাঝে আমি যেন একই সাথে কঠোর ও গভীর।
বেশ অনেকগুলি কারুশিল্প, বস্ত্র আর স্যুভেনিরের দোকান ডিঙিয়ে সামনে হাঁটছি। লামা এবং আলপাকার রঙিন উলের তৈরি পঞ্চো এবং শাল বিক্রি হচ্ছে। তারা তাদের জ্যামিতিক নকশায় আর বুননে ব্যবহার করেছে প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ— সূর্য, চাঁদ, গাছপালা। দিশেহারা হয়ে যাবার মতো অবস্থা। আমি কিনতে না পেরে হতাশ হই। তবু ধন্য আমি এদের প্রাণবন্ত রং আর বয়নদক্ষতা দেখে। একটা চুল্লো মাথায় দিয়ে একটু ভাব নেবার চেষ্টা করছি। আমায় দেখে আতাকামেনো আদিবাসী নারী দোকানদার এগিয়ে আসে। ভেবেছে কিনেই ফেলব। আমার পকেটের অবস্থা দুর্বল। চুল্লো হল ঐতিহ্যবাহী আন্দিয়ান টুপি যা ইয়ারফ্ল্যাপসহ লামা বা আলপাকা উল দিয়ে তৈরি। ইউরোপ- আমেরিকায় এগুলো চড়া দামে বিক্রি হয়।
আমি হেঁটে হেঁটে এ দোকান ও দোকান করছি। যেহেতু অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য সব পর্যটন আকর্ষণ বন্ধ আর সেগুলি বহু দূরে তাই এই দুর্যোগে এ রাস্তাই আমার আপাতত একমাত্র ভরসা। আমার সময়ও আছে অনন্ত। রাস্তার জটলা দেখে মনে হচ্ছে কয়েক হাজার পর্যটক সব হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়। কতক্ষণ আর রুমে বসে থাকবে। এ শহর নিরাপদ। সামনে গয়নার দোকান। আতাকামা অঞ্চল খনিজ সমৃদ্ধ। স্থানীয় কারিগররা রূপা ও তামা ব্যবহার করে সুন্দর গয়না তৈরি করে। ল্যাপিস লাজুলি দেখে মন কাঁদে। গভীর নীল মূল্যবান পাথর হাতে নিয়ে দেখতে চাইলে দোকানদার আপত্তি করে না। রাস্তার উপর বসেছে স্থানীয় খাবারের দোকান। পর্যটকরা দিব্বি খাচ্ছে সে খাবার।
রাস্তায় এক পথশিল্পী ভৌতিক খেলা দেখাচ্ছে। তার হাতে কিছু সাদা বল। অন্ধকারে সেখান থেকে চারদিকে আলো ঠিকরে বেরিয়ে পড়ছে। দু’ ঠোঁটে মাঝে এক বৃহৎ লম্বা বাঁশি ধরে ভৌতিক শব্দ তৈরি করছে শিল্পী। পুরাণে আছে—দেবতা আর অসুরদের মধ্যে সংঘাত লেগেই থাকত। মর্ত্য থেকে স্বর্গে গিয়ে অসুররা দেবতাদের খুব জ্বালাত।
অসুররা কখনো যজ্ঞস্থল দখল করত, কখনো যজ্ঞের সামগ্রী নষ্ট করত, ঋষিমুনিদের অত্যাচার করত, স্বর্গের বাগান ধ্বংস করে দিত। কিছু অসুর স্বর্গে গিয়ে অপ্সরা ও দেবকন্যাদের ধরে নিয়ে যেতে চাইত। দেবতারা থাকত অসুরদের জ্বালায় অস্থির। 'ময়' নামে এক অসুর ছিল। জাদু আর ভেলকিবাজিতে দেবতাদের অসহায় করে ফেলত ময়। আমি এ মর্ত্যে ময়–এর দেখা পেলাম এ পথশিল্পীর ভেলকিবাজি দেখে। আতাকামার পথ শিল্পীর এ লম্বা বাঁশি দেখে কেয়ামতের কথা মনে পড়লো। কেয়ামতের দিন ফেরেস্তা ইস্রাফিল বোধয় এমন শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন। অবশ্য এখন এখানে এক প্রকার কেয়ামতের মাঝেই আছি!
রাতের খাবার বাইরেই খেলাম। স্থানীয় লামার মাংস দিয়ে বানানো এম্পাদা। দেখতে আমাদের সমুছার মতো। সমুছার তিন কোনা, এদের চার কোনা। কামড় দিলেই টের পাচ্ছি মাংস, পেঁয়াজ আর মসলায় ঠাসাঠাসি। আতাকামার সন্ধ্যায় এ আরেক উষ্ণতা।
ছবি: লেখক