
আগস্ট ২৪, ১৫১১।
মধ্যরাতের স্থিরতাকে ভেঙে দিয়ে মালাক্কা প্রণালির ঢেউ ফিসফিস করে যাচ্ছে অদৃশ্য ইতিহাসের কথা। যুদ্ধজাহাজের ডেকে অস্থির পায়চারি করছেন আফোনসো ডি আলবুকার্কি, পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের এক দুর্ধর্ষ সেনানায়ক, ভারতের গভর্নর জেনারেল। অথচ এই মুহূর্তে তিনি ভারতভূমিতে নন, বরং হাজার মাইল দূরে, অনিশ্চয়তা আর রক্তক্ষয়ের এক সীমান্তে দাঁড়িয়ে। সুলতান মাহমুদ শাহের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে চল্লিশ দিন ধরে চলা যুদ্ধ তাঁকে ক্লান্ত করেনি; বরং তীক্ষ্ণ করেছে তাঁর সংকল্প। মালাক্কা—পূর্বের বাণিজ্যের হৃৎস্পন্দন, মসলার গন্ধে মোড়ানো এক স্বপ্ননগর। এ নগরীর নিয়ন্ত্রণ মানেই সমুদ্রবাণিজ্যের শিরায় শিরায় আধিপত্য। সেই আকাঙ্ক্ষার আগুনে দগ্ধ হয়ে আজ তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, শেষ আঘাতটি আজ রাতেই হবে। কাল সকালেই তিনি মালাক্কার মাটিতে জয়ী হিসেবে পা রাখতে চান।
আলবুকার্কির মন চলে যায় লিসবনের রাজপ্রাসাদে। যেখানে পর্তুগালের রাজা প্রথম ম্যানুয়েল তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মালাক্কা দখলের। বিখ্যাত নাবিক ভাস্কো-দা-গামা উত্তমাশা অন্তরীপ পার হয়ে প্রথম যখন ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছান, তখন তাঁর কানে আসে দূর প্রাচ্যের সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র মালাক্কার সংবাদ। সে খবর তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন রাজা ম্যানুয়েলের দরবারে। রাজাও আগ্রহী হয়ে পর্তুগিজ ভারতের প্রথম ভাইসরয় ফ্রান্সিসকো ডি আলমেইদাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মালাক্কার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এক বাণিজ্যদুর্গ স্থাপনের। কিন্তু আলমেইদা সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন। এরপর দিয়েগো লোপেজ ডি সেকুইরা নামের প্রখ্যাত এক অভিযাত্রীকে চারটি জাহাজসহকারে পাঠানো হয়ে মালাক্কার উদ্দেশ্যে।

সেকুইরা ১৫০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মালাক্কায় পৌঁছান, এমনকি একটি বাণিজ্যদুর্গ স্থাপনের অনুমতিও আদায় করে নেন সুলতানের কাছ থেকে। কিন্তু স্থানীয় মুসলিমরা ব্যাপারটাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। কারণ, গোয়া দখলের সময় সেখানকার মুসলিমদের ওপর পর্তুগিজদের নির্যাতনের খবর ইতিমধ্যে মালাক্কায় পৌঁছেছে। তাঁদের প্ররোচনায় সুলতানের বাহিনী সেকুইরার নৌবহরে হামলা চালিয়ে অনেক নাবিককে গ্রেপ্তার করে। সেকুইরা কোনোমতে প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে আসেন।
সেকুইরার পলায়ন এবং পর্তুগিজ নাবিকদের বন্দিত্বের খবর লিসবনে পৌঁছানোর পর রাজা ম্যানুয়েল সিদ্ধান্ত নেন মালাক্কা দখলের। পরীক্ষিত যোদ্ধা আলবুকার্কিকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় বারো শো সৈন্য এবং আঠারোটি যুদ্ধজাহাজের এক বিশাল বহর নিয়ে আলবুকার্কি মালাক্কায় পৌঁছান এবং সুলতান মাহমুদ শাহকে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন। স্বাভাবিকভাবেই সুলতান সেটি প্রত্যাখ্যান করেন। ১৫ জুলাই শুরু হয় যুদ্ধ। পর্তুগিজদের কামান এবং গুলির মুখে শুরু থেকেই বেকায়দায় পড়ে মালাক্কান বাহিনী, যদিও সৈন্য সংখ্যায় তারা ছিল পর্তুগিজ বাহিনীর তুলনায় দশ গুণ বড়। আবার শহরের ভেতর থেকে চায়নিজ, পার্সিয়ান এবং হিন্দু ব্যবসায়ীরাও আলবুকার্কিকে বিভিন্ন খবর পৌঁছাতে থাকে।

এত কিছুর পরও সুলতানের বাহিনী প্রায় চল্লিশ দিন শহরটিকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু ২৫ আগস্ট যখন আলবুকার্কি চূড়ান্ত আক্রমণ শানায়, তখন তাঁদের সব প্রতিরোধ ভেস্তে যায়। পতন ঘটে মালাক্কার। সুলতান মাহমুদ শাহ পিছু হটেন, আর সমুদ্রের বুকে ভেসে ওঠে এক নতুন ক্ষমতার পতাকা। মসলার সুবাস মিশে যায় বিজয়ের গন্ধে। বর্তমান সময়েও মালাক্কা প্রণালির গুরুত্ব একবিন্দু কমেনি। সাম্প্রতিক ইরান-আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তায় মালাক্কা কিংবা বাব-এল-মান্দেবের মতো প্রণালিগুলোর গুরুত্বকে সামনে তুলে এনেছে।
কুয়ালালামপুর থেকে আমাদের গাড়ি ছুটে চলে মসৃণ আট লেনের মহাসড়ক ধরে। আধুনিকতার স্পর্শে ঝকঝকে রাস্তা, কিন্তু গন্তব্য এমন এক শহর, যেখানে প্রতিটি ইটের গায়ে লেগে আছে শতাব্দীর গল্প। তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে আমরা পৌঁছাই মালাক্কায়; একটি শহর, যা একদিকে ব্যস্ত, অন্যদিকে পরিপাটি; একদিকে আধুনিক, অন্যদিকে সযত্নে আগলে রাখা অতীত।

রেড স্কয়ার মালাক্কা শহরের হৃদয়। চারদিকে লালচে স্থাপনা, যেন সময় নিজেই রঙিন হয়ে উঠেছে। ডাচ স্থাপত্যের ছাপ, ইংরেজদের স্পর্শ, পর্তুগিজ ইতিহাস সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মিশ্রণ। সবচেয়ে আইকনিক স্থাপনা নিঃসন্দেহে খ্রিষ্টীয় চার্চ এবং ক্লক টাওয়ার। মালয়েশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চটির ইতিহাস বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। পর্তুগিজরা ছিল ক্যাথলিক খ্রিষ্টান। মালাক্কা দখলের পর যেসব চার্চ তারা তৈরি করেছিল, সবই ছিল ক্যাথলিক চার্চ।
পক্ষান্তরে ডাচরা ছিল মূলত প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান। পর্তুগিজদের হটিয়ে মালাক্কা দখলের পর তারা সব কটি ক্যাথলিক চার্চকেই প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চে রূপান্তর করে। মালাক্কা দখলের এক শ বছর পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তারা নতুন একটি চার্চ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৭৫৩ সালে চার্চটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। রেড স্কয়ারে আগে থেকেই নির্মিত স্টডহ্যাস বা সিটি হলে ডাচদের প্রশাসনিক কার্যক্রম চলত। জায়গাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে নতুন চার্চটিও সেখানেই নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মালাক্কার দখল ইংরেজদের হাতে চলে যাওয়ার পর চার্চের পরিচালনার ভারও তাঁদের হাতে অর্পিত হয়। ইংরেজরা বিভিন্ন সময় প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করে। যদিও বাহ্যিক রূপ অক্ষুণ্ণ রেখে সংস্কার কার্যক্রম চার্চের অভ্যন্তরেই বেশি হয়েছিল। বাহ্যিক একমাত্র পরিবর্তনটি হয়েছিল ১৯১১ সালে। চার্চ–সংলগ্ন সিটি হল এবং ক্লক টাওয়ারকে তখন লাল রঙে রাঙানো হয়। চার্চটিও বাদ যায়নি। দেড় শ বছরের সাদা রং পাল্টে হয়ে যায় লাল। ১৬৫০ সালে নির্মিত সিটি হলটিতে ডাচ গভর্নর জেনারেল অফিস করতেন।
ইংরেজরাও এই ভবন থেকেই প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাত। এমনকি মালয়েশিয়া স্বাধীন হওয়ার পরও এটি অনেক দিন পর্যন্ত অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বর্তমানে এটি জাদুঘর হিসেবে মালাক্কার ইতিহাস তুলে ধরছে পর্যটকদের সামনে।

রেড স্কয়ারে পঞ্চাশ ফুট উঁচু ত্রিতল ক্লক টাওয়ারটি কোনো সরকারি স্থাপনা ছিল না। তান জিয়াক কিম নামের একজন ব্যবসায়ী তাঁর মৃত বাবার স্মরণে ১৮৮৬ সালে টাওয়ারটি স্থাপন করেন। কালের আবর্তে টাওয়ারটি এক দর্শনীয় স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। সিটি হল কিংবা চার্চে প্রবেশ করার উপায় থাকলেও ক্লক টাওয়ারটির দরজা বন্ধ থাকায় কেবল বাইরে থেকেই চক্কর দেওয়া যায়। রেড স্কয়ারে চমৎকার একটা প্রস্রবণও আছে। ১৯০১ সালে সিংহাসনে আরোহণের ৬০ বছর পূর্তিতে রানি ভিক্টোরিয়ার নামে এই প্রস্রবণটি তৈরি করা হয়েছিল। পুরো মালয়েশিয়াতে ব্রিটিশ আমলের এই একটি প্রস্রবণই এখনো টিকে আছে এবং প্রচণ্ড গরমে পর্যটকদের শান্তির পরশ বিলিয়ে চলছে।
রেড স্কয়ারে কিন্তু অনেক রিকশাও চলে। আকর্ষণীয় ডিজাইনের রিকশাগুলোর সঙ্গে ঢাকা শহরে চলমান ইঞ্জিন রিকশার মিল পাওয়া যায়। যদিও এখানকার রিকশাগুলো কেবল পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্যই নিবেদিত। একসঙ্গে সব কটি রিকশা যখন চলতে শুরু করে, তখন দেখতে দারুণ লাগে। রিকশায় চড়তে টাকা লাগলেও ছবি তুলতে পারা যায় মুফতে। এই সুযোগে সফরসঙ্গীরা প্রচুর ছবি তুললেন। আদতে রেড স্কয়ার ছবি তোলারই জায়গা। বেশ কিছু পর্যটককে টিকটক করতেও দেখলাম। এই ভাইরাস তাহলে এখানেও পৌঁছে গেছে?

রেড স্কয়ারের যে পাশে চার্চ, তার ঠিক অপর পাশেই আছে এক দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। ডাচ দুর্গের নিঃশব্দ ধ্বংসাবশেষে দাঁড়িয়ে মনে হলো, ইতিহাস কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না, শুধু রূপ বদলায়। এটিই মালাক্কায় টিকে থাকা একমাত্র ডাচ দুর্গ। একটা পর্তুগিজ দুর্গও আছে, যেটি পরিচিত ফ্যামোসা বা মালাক্কা দুর্গ নামে। যদিও আদি এবং আসল কোনো পর্তুগিজ কিংবা ডাচ দুর্গ এখন আর মালাক্কাতে নেই।
ব্যাপারটা একটু খোলাসা করা যাক। ১৬৪১ সালে ডাচরা যখন পর্তুগিজদের মালাক্কা থেকে বিতাড়ন করে, তখন তারা পর্তুগিজ দুর্গগুলো ধ্বংস করে দেয়। তবে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই শহর রক্ষার দেয়ালগুলোকে কেবল অক্ষতই রাখেনি, বরং আরও মজবুত করে। ১৮১১ সালে ডাচরা যখন ইংরেজদের হাতে মালাক্কার শাসনভার অর্পণ করে, তখন ইংরেজরা শহরটাকে নিজেদের মতো করে গড়ার জন্য সব পর্তুগিজ এবং ডাচ নিরাপত্তা স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেয়। কেবল ফ্যামোসার দুটি প্রবেশদ্বার রেখে দেওয়া হয়। সেটিই এই মুহূর্তে মালাক্কার সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপনা হিসেবে টিকে আছে সেই ১৫১২ সাল থেকে।
১৬৬০ সালে ডাচরা নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে একটা ছোটখাটো দুর্গ স্থাপন করে। যদিও দুর্গ না বলে এটিকে আউটপোস্ট বলাই ভালো। মিডলবার্গ ব্যাস্টিয়ন নামের এই দুর্গের অবস্থান মালাক্কা নদীমুখে। কালের আবর্তে এটি মাটিচাপা পড়েছিল। ২০০৬ সালে কোনো এক নির্মাণকাজের সময় এর ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া যায়। সেটিকেই সংস্কার করে দর্শনীয় বস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। পর্তুগিজ আমলের কয়েকটি কামান ধ্বংসপ্রাপ্ত দুর্গের জৌলুশ বাড়াতে সাহায্য করেছে। দুর্গের ভেতরে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকালে এর অবস্থানগত তাৎপর্য বোঝা যায়। সমুদ্র থেকে জলপথে শহরে প্রবেশ করতে চাইলে মালাক্কা নদী ধরেই আসতে হবে। দুর্গের ছাদে কয়েকটা কামান আর অল্প কিছু সৈন্য দাঁড় করিয়ে দিলে তারা যেকোনো সৈন্য দলকেই লম্বা সময় ঠেকিয়ে রাখতে পারবে। (চলবে)
ছবি: লেখক