পূর্ব ইউরোপের হৃদয়ের গভীরে, যেখানে দানিয়ুব ও মোরাভা নদীর মৃদু কলতান মিলে এক অপরূপ সুর রচনা করে, সেখানে জেগে উঠেছে ব্রাতিস্লাভা নামের এক মায়াময় শহর। স্লোভাকিয়ার রাজধানী হিসেবে এর খ্যাতি ছড়িয়েছে দূরদূরান্তে। আবার এর সীমান্তে গলাগলি করে আছে অন্য দুই স্বাধীন দেশ—অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরি।
সড়কপথে ব্রাতিস্লাভা থেকে চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগের দূরত্ব মাত্র ২১১ মাইল, হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট ১২৪ মাইল আর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা তো একেবারে হাতের নাগালে, মোটে ৫০ মাইল। পোল্যান্ডের সীমানাও এই শহর থেকে খুব দূরে নয়; বলাবাহুল্য ব্রাতিস্লাভা এক অপার উষ্ণতায় চারপাশের দেশগুলোকে কাছে টেনেছে। ভ্রমণপিপাসুরা ভিয়েনা, প্রাগ কিংবা বুদাপেস্টের মতো ঝলমলে রাজধানীগুলোর পথে পা বাড়ালে অনেকেই একটু সময় বাঁচিয়ে রাখেন ব্রাতিস্লাভার জন্য।
এ শহর যেন এক লুকোনো মণি, যার সৌন্দর্য আর স্নিগ্ধতা মুগ্ধ করে। এই শহরের গল্প বলতে গিয়ে মনটা হারিয়ে যায় পাথরে বাঁধা পথের গলিগুলোতে, প্রাচীন দুর্গের ছায়ায় আর নদীর কলতানে। ব্রাতিস্লাভা আমার কাছে শুধু একটি শহর নয়, একটি জীবন্ত ক্যানভাস, যেখানে প্রতিটি রঙের আঁচড়ে লুকিয়ে আছে অতীতের গল্প আর বর্তমানের হাসি।
আমার ব্রাতিস্লাভা ভ্রমণের গল্প শুরু হয়েছিল একটি প্রয়োজনে। স্লোভেনিয়ার রেসিডেন্ট পারমিট রিনিউ করতে উপরাভনা এনোতাতে গেলে বার্থ সার্টিফিকেট ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স জমা দিতে বলা হয়। মাকে বলে দেশ থেকে ডিএইচএলের মাধ্যমে সেগুলো আনাই; কিন্তু জমা দেওয়ার পর জানা গেল, ১৯৬১-এর হেগ অ্যাপোস্টাইল চুক্তিতে বাংলাদেশের নাম নেই। তাই ভিয়েনার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ডকুমেন্ট অ্যাটেস্টেড করাতে হবে, তারপর স্লোভেনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লিগালাইজ করলে রিনিউয়ের বিষয় বিবেচনা করা হবে। অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভিয়েনা যাওয়ার পরিকল্পনা করি। আগেও ভিয়েনায় গেছি, তাই ভাবলাম, এবার ব্রাতিস্লাভাও ঘুরে আসি। শনি-রবি দূতাবাস বন্ধ, সোম-মঙ্গলবার ক্লাস। এদিকে রেসিডেন্ট পারমিটের মেয়াদ শেষের দিকে; তাই ক্লাস বাদ দিয়ে যাত্রার প্রস্তুতি নিই।
রোববার দুপুরে লুবলিয়ানার সেন্ট্রাল কোচ স্টেশন থেকে ফ্লিক্স বাসে ভিয়েনার উদ্দেশে রওনা হই। প্রায় ছয় ঘণ্টার যাত্রা শেষে বাস এডবার্গে পৌঁছা। রাতটা এক বাংলাদেশি মসজিদে কাটিয়ে পরদিন সকালে ব্রাতিস্লাভার পথ ধরি। হপটবানহফ থেকে পাঁচ ইউরোর টিকিটে ব্রাতিস্লাভার বাসে উঠি। সোয়া এক ঘণ্টা পর পৌঁছাই ব্রাতিস্লাভার সেন্ট্রাল বাসস্টেশনে।
ব্রাতিস্লাভার প্রথম ছাপটাই ছিল অদ্ভুত সুন্দর। কোচ স্টেশনটি ছোট হলেও ছিমছাম, ছোট আয়তনের কোনো বিমানবন্দরের সঙ্গে তুলনা করলেও অতিরঞ্জিত হবে না। ভেতরে কফি শপ, ফাস্ট ফুড জয়েন্ট, পত্রিকার স্টল—সবকিছুই গোছানো। এক কাপ ধোঁয়া ওঠা লাতে আর পেস্ট্রি দিয়ে সকালের নাশতা সেরে নিই। স্টুডেন্ট আইডি কার্ডের সুবাদে সাড়ে তিন ইউরোতে একটি এক দিনের ট্রাভেল পাস কিনে ফেলি, যা শহরের সব পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করা যায়। ইউরোপের অন্য শহরের তুলনায় ব্রাতিস্লাভায় যাতায়াতের খরচ সত্যিই কম।
আমার প্রথম গন্তব্য ছিল ডেভিন ক্যাসেল। অনেকেই বলেছিলেন, ব্রাতিস্লাভায় এসে এই ক্যাসেল না দেখলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বোল্টের ট্যাক্সিতে চড়ে সেন্ট্রাল বাসস্টেশন থেকে রওনা দিই। মাত্র ১১ ইউরোতে ১১ মাইল পথ পেরিয়ে পৌঁছে যাই ক্যাসেলে। ট্যাক্সিতে করে ক্যাসেলের দিকে যাওয়ার সময় শহরের শান্ত রাস্তাগুলো আমাকে অবাক করে। ঢাকার কোলাহল বা লন্ডনের ব্যস্ততার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। রাস্তায় লাল ট্রলি বাসগুলো যেন শহরের প্রাণ, নিঃশব্দে ছুটে চলে। ড্রাইভার বলেছিলেন, ‘এই বাসগুলো ছাড়া ব্রাতিস্লাভা অচল।’
ডেভিন ক্যাসেল দানিয়ুব ও মোরাভা নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত। পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন দুর্গ যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। স্টুডেন্ট ছাড়ে আড়াই ইউরোর টিকিট কিনে ভেতরে প্রবেশ করি।
ক্যাসেলের ভেতরে পা রাখতেই সময় পিছিয়ে নিয়ে যায়। পাথরের দেয়াল, ধ্বংসাবশেষ আর প্রাচীন কুয়া—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, আমি হয়তো কয়েক শতাব্দী আগের কোনো যুগে দাঁড়িয়ে আছি। ট্রাভেল ব্রোসিয়ারে পড়েছিলাম, ৮৬৪ সালে ফ্রান্সে রাজা প্রথম লুইয়ের সময়ে এই ক্যাসেলের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। দানিয়ুবের বাণিজ্যপথে নজরদারি আর শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য এটি নির্মিত হয়েছিল। ক্যাসেল থেকে দূরের গ্রামগুলো দেখে মনে পড়ল বাংলা কবিতার সেই পঙ্ক্তি, ‘আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর, থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেউ পর’। পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে থাকা গ্রামগুলো সত্যিকার অর্থে ছবির মতোই সুন্দর।
দানিয়ুব নদীর কলতান আর পাশের ছোট ছোট বনের হলুদ-লাল পাতার সমারোহ মনকে মুগ্ধ করে। এই নদী শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এর বুকে লুকিয়ে আছে বহু মানুষের জীবনের গল্প। কমিউনিস্ট শাসনের সময় অনেকে এই নদী পাড়ি দিয়ে অস্ট্রিয়ায় পালানোর সময় সলিল সমাধিও ঘটেছে। ক্যাসেলের মিউজিয়ামে প্রাচীন নিদর্শন আর নিওলিথিক যুগের স্মৃতি দেখে মনে হলো, এই পাথরের দেয়ালগুলো অতীতের গল্প ফিসফিস করে বলছে।
ডেভিন ক্যাসেল থেকে বেরিয়ে আশপাশের গ্রামগুলো ঘুরে দেখি। কাঠের তৈরি ঘরবাড়ি, কালো-বাদামি রঙে মোড়া দেয়ালে সাদা নকশার খেলা—স্লোভাকিয়ানদের লোকশিল্পের প্রতি ভালোবাসা এখানে স্পষ্ট। গ্রামের এক অধিবাসী আমার হাতে কিছু ঘাস দিয়ে ভেড়ার পালের দিকে ইশারা করলেন। একটি ভেড়া ছুটে এসে ঘাসগুলো খেয়ে নিল আর গ্রামবাসীরা হেসে উঠলেন। এই সরলতা, এই আন্তরিকতা ব্রাতিস্লাভার প্রকৃত সম্পদ।
দুপুরে পিটার নামের এক স্লোভাকিয়ান তরুণের সঙ্গে দেখা হলো। কাউচসার্ফিংয়ের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে আগেই পরিচয় হয়েছিল। পিটার আমাকে মোস্ট এসএনপি ব্রিজে অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। ব্রিজটি ব্রাতিস্লাভার একটি ল্যান্ডমার্ক। দানিয়ুব নদীর ওপর নির্মিত এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম একক পাইলনের ব্রিজগুলোর একটি। ব্রিজের মাঝখানে একটি ফ্লাইং সসারের মতো টাওয়ার দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম, এ কি সত্যিই কোনো এলিয়েনের আগমন! পরে জানলাম, এটি একটি রেস্টুরেন্ট, যেখানে ইউএফও গবেষণার জন্যও কিছু কার্যক্রম হয়।
পিটার আমাকে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যান। কমেনিয়াস ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসটি ছিল অত্যন্ত সুসজ্জিত। তাঁর ডরমিটরি দেখে আমি অবাক—মাত্র ৮৭ ইউরোতে এমন সুবিধা! পিটার জানালেন, এমনকি আরও কম খরচে ডরমিটরি পাওয়া যায়।
দুপুরে ক্যানটিনে খাওয়ার সময় মনে হলো, আমি যেন ফাইভ স্টার হোটেলে বসে আছি। বিফ গুলাশ আর আনলিমিটেড ড্রিংকস—মাত্র তিন ইউরোতে! পিটার বললেন, শিক্ষার্থীদের জন্য সাবসিডাইজড মিলের সুবিধা রয়েছে, যার মাধ্যমে এক ইউরোতেও ভরপেট খাওয়া যায়। স্লোভাকিয়ার শিক্ষা ও গণপরিবহনব্যবস্থায় সরকারি ভর্তুকির কথা শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম। দেশটিতে ২৬ বছর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য রেল পরিষেবা ফ্রি!
বিকেলে আমরা স্লাভিন সমাধিসৌধ দেখতে যাই। এই সমাধিসৌধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সোভিয়েত সৈন্যদের স্মরণে নির্মিত। স্মারকস্তম্ভের মাঝখানে একটি ভাস্কর্য, যেখানে এক সৈনিকের পায়ের নিচে নাৎসি স্বস্তিকা। পিটারের মুখে শুনলাম, এটি কেবল ইতিহাসের সাক্ষী নয়, কমিউনিস্ট শাসনেরও একটি প্রতীক। তরুণ প্রজন্মের কাছে এই স্মৃতি একটি দূরের গল্প, যা তারা ভুলে যেতে চায়।
সেখান থেকে আমরা ব্রাতিস্লাভা ক্যাসেলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি শহরের আরেক রূপ। মালে কার্পেটি পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই সাদা প্রাসাদ যেন এক রূপকথার দুর্গ। এখান থেকে দানিয়ুবের বিস্তৃত দৃশ্য, ওল্ড টাউনের মধ্যযুগীয় ছায়া, শহরের স্কাইলাইন আর দূরের পাহাড় দেখে মন ভরে যায়।
ক্যাসেলের মিউজিয়ামে হাঙ্গেরির রাজমুকুট থেকে শুরু করে প্রাচীন নিদর্শন—সবই ইতিহাসের সাক্ষী। পিটার জানালেন, স্লোভাকিয়ার ইতিহাসে হাঙ্গেরির প্রভাব গভীর। একসময় এই ক্যাসেলে হাঙ্গেরিয়ান রাজাদের রাজ্যাভিষেক হতো। পিটার আরও বললেন, এই ক্যাসেল একসময় নেপোলিয়ানের কামানের আঘাতে ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। কিন্তু স্লোভাকিয়ার মানুষ তাঁদের ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনেছেন। ক্যাসেলের মিউজিয়ামে ভেনাস অব মরভানির মতো প্রাচীন নিদর্শন দেখে ইতিহাসের গভীরতা অনুভব করলাম।
ওল্ড টাউনের সরু গলিতে হাঁটতে হাঁটতে শহরের আসল রূপ চোখে পড়ল। মিশেল’স গেট পেরিয়ে ঢুকলাম এই ঐতিহাসিক জগতে। ইটের রাস্তা, রঙিন ঘরবাড়ি আর ছোট ছোট দোকান—সব মিলিয়ে যেন একটি জীবন্ত পোস্টকার্ড। হঠাৎ চোখ পড়ল চুমিলের ওপর। ম্যানহোল থেকে উঁকি দেওয়া এই ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য দর্শনার্থীদের কাছে একটি আকর্ষণ। পিটার বললেন, চুমিলের মাথায় হাত রেখে মনের ইচ্ছা বললে তা পূরণ হয়।
আমিও হেসে তাঁর পাশে ছবি তুলি, মনে মনে আমিও কিছু চাই।
ওল্ড টাউন থেকে কিছুটা দূরে ব্লু চার্চ, যার আকাশি নীল রং চোখে লাগে। এটি আর্ট নুয়েভা স্থাপত্যের একটি নিদর্শন। হাঙ্গেরির রাজা দ্বিতীয় অ্যান্ড্রু তাঁর মেয়ে এলিজাবেথের স্মরণে এটি নির্মাণ করেছিলেন। চার্চের ভেতরে বেঞ্চগুলোও নীল। বাইরে শিশুদের ছবি তোলার উচ্ছ্বাস দেখে মনে হলো, এটি শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, একটি আনন্দের জায়গাও।
ব্রাতিস্লাভার প্রতিটি পাথর, প্রতিটি নদীর তীর, প্রতিটি হাসি যেন একটি গল্প বলে। আয়তনে শহরটি খুব একটা বড় নয়। বার্লিন, ভিয়েনা, বুদাপেস্ট, প্রাগ কিংবা ওয়ারশোর চাকচিক্য নেই এ শহরে। তবু এর সরলতা মন জয় করে। ইউরোপের অন্য শহরের তুলনায় এখানে জীবনযাত্রা সাশ্রয়ী, মানুষের হাসি অকৃত্রিম। পিটারের সঙ্গে কাটানো দিনটি আমার মনে গেঁথে আছে। ব্রাতিস্লাভা আমাকে শিখিয়েছে, সৌন্দর্য বড় বড় অট্টালিকায় নয়, ছোট ছোট মুহূর্তে, মানুষের হৃদয়ে।
এই শহরে ফিরে আসার ইচ্ছা রয়ে গেছে। হয়তো আরেক দিন দানিয়ুবের তীরে দাঁড়িয়ে আবার নতুন কোনো গল্পের খোঁজ পাব। আমার কাছে ব্রাতিস্লাভা কেবল একটি গন্তব্য নয়, আমার কাছে ব্রাতিস্লাভা একটি অনুভূতি, যা বয়ে নিয়ে চলেছে আমার হৃদয়।
লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।
ছবি: লেখক