ইউরোপের স্মৃতিময় ভ্রমণগাথা ১
শেয়ার করুন
ফলো করুন

নেদারল্যান্ডস

নেদারল্যান্ডসে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক সেমিনারে অংশগ্রহণ করা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন ওয়ার্ল্ড লয়ারস ফোরাম (ডব্লিউএলএফ) গত বছরের ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বরে আয়োজন করে এ সেমিনার। সংগঠনটির আমন্ত্রণপত্র পেয়েছিলাম জুলাই মাসে। এর পর থেকে শুরু হয় স্বপ্নের ইউরোপ ভ্রমণের মূল প্রস্তুতি। আমন্ত্রণপত্র হাতে পাওয়ার পর ভিসার জন্য দৌড়ঝাঁপ করতে থাকি। বলতেই হয় এটা ছিল এক জটিল প্রক্রিয়া। অবশ্য এর মধ্য দিয়ে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত শেনজেন ভিসা মেলে। আমার সফরসঙ্গী হয়েছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আরও ছয়জন আইনজীবী—আবদুল আজিম, মোহাম্মদ মাসুদ মিয়া, মো. হুমায়ূন কবির এহসান, কামরুন নাহার সীমা, তামান্না আফরিন ও জসীম উদ্দিন।

সেমিনারে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দেশের আইনজীবীদের সঙ্গে
সেমিনারে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দেশের আইনজীবীদের সঙ্গে
সেমিনারে সম্মাননা গ্রহনের সময়
সেমিনারে সম্মাননা গ্রহনের সময়

শেনজেন ভিসা হাতে আসার পর আমরা ভ্রমণ পরিকল্পনা করে ফেলি। আমাদের সেমিনার পর্ব শেষ করে পুরো ভিসার মেয়াদটাই ইউরোপের ৯টি দেশে ঘোরার পরিকল্পনা করি। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ইউরোপে থাকা কয়েকজন বন্ধুর সহযোগিতা নিতে হয়েছে, করতে হয়েছে বেশ কয়েক দিনের বিশদ গবেষণাও। শুধু যে ভ্রমণ পরিকল্পনাই করেছিলাম, তা নয়। সঙ্গে সেই অনুযায়ী এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাতায়াত ও থাকার জন্য বিভিন্ন রুটের ট্রান্সপোর্টের টিকিটসহ হোটেল ও এয়ার বিএনবি আগাম বুকিং করে ফেলি পরিকল্পনামাফিক। এতে আমাদের ইউরোপ ভ্রমণ স্বস্তিদায়ক হয়েছে নিঃসন্দেহে। আমাদের সেমিনার ছিল নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামে। কাজেই আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল আমস্টারডাম। আজ শোনাব নেদারল্যান্ডসের গল্প।

বিজ্ঞাপন

২১ সেপ্টেম্বর ভোরে কাতার এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে আমাদের ইউরোপযাত্রা শুরু। দীর্ঘ ভ্রমণে সংক্ষিপ্ত ট্রানজিট ছিল কাতারের রাজধানী দোহায়। এয়ারপোর্টে নেমে যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সেরে কানেক্টিং ফ্লাইটে রওনা দিয়ে আমস্টারডামের শিফল এয়ারপোর্টে পৌঁছাই স্থানীয় সময় বেলা দুইটায়। আগে থেকে হোটেল বুক করা ছিল, তাই এয়ারপোর্ট থেকে আমরা একটি ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাই হোটেলে। তারপর লাঞ্চ করেই বেরিয়ে পড়ি নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরের উদ্দেশে। সেখানে যাওয়ার জন্য বড় ভ্যান বেছে নিয়েছিলাম। প্রায় ৫০ মিনিটের মধ্যে আমস্টারডাম থেকে হেগে পৌঁছে যাই। হেগে প্রথম দেখতে যাই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিসি)।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের সামনে
ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের সামনে
হেভে অবস্থিত পিস প্যালেস
হেভে অবস্থিত পিস প্যালেস

আইনজীবী হিসেবে আইসিসি ঘুরে দেখার স্বপ্ন ছিল বহুদিনের। অবশেষে সেই স্বপ্ন বাস্তবে ধরা দেয়। আইসিসিতে কিছু সময় কাটিয়ে আমরা চলে যাই বিখ্যাত শেভেনিঙ্গেন সৈকতে, যা নর্থ সির উপকূলে। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ, সৈকতের পাশে মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠা ক্যাফে এবং কাছেই বিখ্যাত ফেরিজ হুইল আমাদের মুগ্ধ করে। সমুদ্রের ঢেউ আর ঠান্ডা ঝোড়ো বাতাস আমাদের সব ক্লান্তি নিমেষেই দূর করে দেয়। পাশেই বিখ্যাত পাঁচ তারকা হোটেল কুরহাউস হোটেলের নান্দনিকতা দেখে বিস্মিত হওয়ার মতো।

বিজ্ঞাপন

সেখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে আমরা মাইক্রোতে করে বেরিয়ে পড়ি নেদারল্যান্ডসের সংসদ ভবন বিনেনহফ দেখার জন্য। সেখান থেকে আমরা যাই পিস প্যালেস দেখতে। পিস প্যালেসে দুটি আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রতিষ্ঠান অবস্থিত; একটি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং অন্যটি স্থায়ী সালিসি আদালত (আইপিএ)।

বিখ্যাত শেভেনিঙ্গেন সৈকতে লেখক
বিখ্যাত শেভেনিঙ্গেন সৈকতে লেখক

এরপর গেলাম নুরডাইন্ডে প্যালেসে, যা ডাচ রাজপরিবারের কর্মস্থল। এসব দেখে আমার চলে আসি হেগ শহরের মাঝখানে অবস্থিত একটি মনোরম জাপানিজ পার্কে। পাশেই একটি রেস্তোরাঁয় বসে স্বাদ নিই স্থানীয় কিছু খাবারের। হেগ সিটি যেহেতু নেদারল্যান্ডসের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর, তাই চেষ্টা করেছি যতটা সম্ভব বিখ্যাত স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখতে। আমরা প্রায় রাত অবধি হেগ শহর ঘুরে ফিরে আসি আমস্টারডামে।

পরদিন সকাল থেকেই হোটেল পার্ক প্লাজায় ছিল আমাদের নির্ধারিত সেমিনার। আমাদের হোটেল থেকে পায়ে হাঁটার দূরত্ব। ১৫ মিনিটেই পৌঁছে যাই। সেমিনারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দুই শতাধিক আইনজীবী, জুরিস্ট, বিচারক অংশ নেন। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চলে সেমিনার। এরপর আমরা হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে যাই আমস্টারডামের বিখ্যাত ক্যানেল ক্রুজে। বলে রাখা ভালো, আমস্টারডাম শহরে শতাধিক ক্যানেল রয়েছে এবং একে ক্যানেলের শহর বলা হয়। আমরা সন্ধ্যার আগে আগেই গিয়েছিলাম। কারণ, উদ্দেশ্য ছিল দিনের আলোটা পাওয়া। যদিও যে হাউসবোটের আমরা টিকিট কাটি সেটা চালু করতে করতে সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়; তবে ক্যানেলে ঘুরে বেড়ানোটা ছিল অসাধারণ।

নেদারল্যান্ডসের রাতের  ও সন্ধ্যার ক্যানেলের দৃশ্য
নেদারল্যান্ডসের রাতের ও সন্ধ্যার ক্যানেলের দৃশ্য
সন্ধ্যার আলো–আঁধারিতে বোট করে নগর দেখা
সন্ধ্যার আলো–আঁধারিতে বোট করে নগর দেখা

প্রতিটি বোটে টেবিল ও বসার আসন পাতা থাকে এবং হালকা নাশতার ব্যবস্থাও। আমরা দেড় ঘণ্টার ক্রুজ করেছিলাম। সন্ধ্যার আলো–আঁধারিতে বোট ছাড়লে এক অসাধারণ দৃশ্যের অবতারণা হয়, যা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। ক্যানেলের দুই পাশে শহরের মূল ভবনগুলো যেন ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি। এসব ভবন অনেক পুরোনো হলেও এ শহর যেন ঐতিহ্যকেই বাঁচিয়ে রাখতে চায় আপন মহিমায়। শহরের লাইটগুলো অতটা চাকচিক্যময় নয়; তবে মৃদু আলোগুলো রাতের আমস্টারডামকে দিয়েছে অন্য মাত্রা।

বোটে বসে আমার সরাসরি ক্যাপ্টেনের বর্ণনা পাচ্ছিলাম; তিনি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন ভবন ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর। শহরের মৃদু আলোগুলো ক্যানেলের পানিতে পড়ে আশ্চর্য রূপ ধারণ করেছিল। ক্যানেলে ভাসতে ভাসতে মনে হতে থাকল, শহরের ভেতর ক্যানেলগুলোকে কী অসাধারণভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। এসব ক্যানেলের অনেকগুলোই স্বীকৃতি পায় ইউনেসকো ঘোষিত হেরিটেজ হিসেবে।

ক্যানেলে সারি সারি বোট
ক্যানেলে সারি সারি বোট

আমরা বোটে করে সিটি সেন্টারের পাশ দিয়ে বাঁক নেওয়ার সময় দেখলাম অন্য এক শহর এবং তার চাকচিক্যময় জগৎ। এই ঐতিহাসিক ক্যানেল ক্রুজ আজীবন স্মৃতিপটে থেকে যাবে। ক্যানেলের দুই পাশে আমরা দেখেছি আনা ফ্রাংকের বাড়ি; এটা এখন জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া দেখেছি বিখ্যাত স্কিনি ব্রিজসহ কিছু ব্রিজ, পুরোনো ডাচ বাড়িঘর এবং বিখ্যাত কিছু গির্জা।

আমরা পরের দিন আবারও সেমিনার শেষ করে হোটেলে ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে রাতের শহর দেখতে বের হয়ে যাই। প্রথমেই যাই সিটি সেন্টার এলাকায়। রাতের জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ এবং ক্যাফে ও রেস্তোরাঁর আবহে অদ্ভুত এক শহর যেন। কফিশপগুলো প্রাণবন্ত। নানা স্বাদের কফির গন্ধে মাতোয়ারা চারপাশ। পাশেই শপিং এরিয়ায় শত শত পর্যটকের ভিড়। শহরের ভেতর দিয়ে গেছে ট্রামলাইন। আমরা উঠে পড়ি একটিতে; ট্রামে করে শহর দেখব বলে। এক নারী ট্রামচালকের সঙ্গে কথা হয়।

বোটে ওঠার আগে
বোটে ওঠার আগে

তিনি আমাদের দিলেন বিনা টিকিটে ট্রামে চড়ার অনুমতি এবং নামার সময় কৌতুক করে বললেন, ‘এবারই শেষ, পরের বার কিন্তু আর দেব না।’ বুঝলাম ডাচরা বেশ ভালোই রসিকতা জানে। শহরের দুই ধারে নানা ধরনের দোকান, বাহারি ডিজাইনের রেস্তোরাঁ। চলতে চলতে দেখা মেলে কয়েকজন বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীর। তাঁরা পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম চাকরি করছে। সেখানে বেশির ভাগ বাঙালি চাকরি করে বিভিন্ন রেস্তোরাঁয়; কেউ কেউ আবার অ্যাপভিত্তিক খাবারের ডেলিভারির কাজেও নিয়োজিত। সিটি সেন্টারে মোটামুটি রাত ৯টার মধ্যেই বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য কিছু কফিশপ সারা রাত খোলা থাকে।

রাতে আমাদের টিমের কয়েকজন মিলে বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে দেখলাম। এ এক অনিন্দ্যসুন্দর দেশ। ইউরোপে এসে প্রথম ভ্রমণ করা দেশ হিসেবে নেদারল্যান্ডসে যেতে পেরে বেশ স্বস্তি অনুভব করছিলাম। নেদারল্যান্ডসের মানুষ তাদের দেশের ইতিহাস–ঐতিহ্যকে ধারণ করে, যত্ন করে। এটা শুধু নেদারল্যান্ডস নয়, গোটা ইউরোপেরই এ যেন এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

ওলন্দাজদের সাইলকেলপ্রিয়তা দারুণ
ওলন্দাজদের সাইলকেলপ্রিয়তা দারুণ

আমস্টারডামের যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা না বললেই নয়, সেটা হলো সেখানকার অধিকাংশ মানুষ সাইকেলে চড়ে। প্রতিটি বড় রাস্তার সঙ্গে রয়েছে সাইকেলের জন্য আলাদা লেন এবং সাইকেল রাখার জন্য নির্ধারিত স্থান। এ চিত্র যদিও ইউরোপজুড়েই দেখা যায়। তবে আমস্টারডামের মানুষ একটু বেশিই যেন সাইকেলপ্রিয়। আমস্টারডামের প্রতিটি রাস্তাই ইতিহাস আর ঐতিহ্য দিয়ে তৈরি। এখানে আধুনিকতার ছোঁয়া রয়েছে বটে, তার চেয়েও বেশি পুরোনা সব দালানকোটা এবং বেশির ভাগই একই দৃশ্যে বোনা এক দারুণ সুন্দর শহর এটি।

আমরা যখন যাই তখন সেখানে শরৎ। শীত আসি আসি করছে। অসাধারণ আবহাওয়া। দিনের বেলায় হালকা গরম লাগলেও সন্ধ্যা গড়াতে শীতে কাবু হয়ে যেতে হয়। এর মধ্যেই আমরা ডিনার সেরে নিই ডাচ খাবার দিয়ে। আমাদের সে রাতেই শেষ হয় নেদারল্যান্ডস ভ্রমণ। পরদিন সকালে আমাদের যাত্রা বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের উদ্দেশে। আগামী পর্বে শোনাব সেই গল্প।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
ছবি: লেখক

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন