
‘এরা এত ধীরে হাঁটে কেন?’
‘ওদের তো কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই।’
‘সারা দিন এরা কী করে?’
‘খায়, ঘুমায়, আবার খায়।’
‘ব্যস?’
‘ব্যস।’
পাশের দুই ইউরোপীয় দর্শনার্থীর কথোপকথন শুনে মনে মনে বললাম, ‘এমন জীবনই তো আমি চাই!’

চীনের সিচুয়ান প্রদেশের রাজধানী চেংদুতে এসে পান্ডার সামনে দাঁড়ালে এমন দার্শনিক হতে খুব বেশি সময় লাগে না। পৃথিবীর সবচেয়ে আদুরে এই প্রাণীর জীবন নিয়ে ঈর্ষা করার যথেষ্ট কারণ আছে। অন্য প্রাণীকে বাঁচতে হলে দৌড়াতে হয়, শিকার করতে হয়, লড়াই করতে হয়। আর পান্ডা? এর জীবনের বড় অংশজুড়ে বাঁশ, ঘুম আর অবসরের এক আশ্চর্য সমন্বয়। আমরা যেখানে ‘বাঁশ খাওয়া’ এড়াতে পালিয়ে বেড়াই, সেখানে এই প্রাণী দিবারাত্রি আয়েশ করে ‘বাঁশ খায়’।
চেংদুকে যেন প্রকৃতি নিজেই পান্ডাদের জন্য একটু বেশি সবুজ করে সাজিয়েছে। আর সেই সবুজের ভেতরেই রয়েছে ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘চেংদু রিসার্চ বেজ অব জায়ান্ট পান্ডা ব্রিডিং’ নামের অতিকায় পান্ডাদের নিবিড় সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রজননকেন্দ্র। পান্ডা দেখার আগ্রহে শিয়ান ছেড়ে আসা ট্রেন থেকে নেমেই সরাসরি সেখানে হাজির হয়েছি।

বিশাল এলাকাজুড়ে সবুজের সমারোহ। চারপাশে বাঁশঝাড়, গাছপালা আর ছায়াঘেরা পথ। ভিড় আছে, কিন্তু সেটা কোনো ব্যস্ত শহরের ভিড় নয়। এখানে সবার চোখে একই রকম প্রত্যাশা। হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, কোনো গবেষণাকেন্দ্রে নয়, পান্ডাদের নিজস্ব এক রাজ্যে ঢুকে পড়েছি।
আবহাওয়া বেশ তপ্ত। ফলে প্রত্যাশার বিপরীতে সাদা-কালো দৈত্যরা বেশির ভাগই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ইনডোর এনক্লোজারে। বাইরে এসে দর্শকদের সামনে বসে বাঁশ চিবোবে—এমন কোনো দায়বদ্ধতা ওদের নেই। কাচের ওপারে কিছু পান্ডা বাঁশ-ঘুম দিচ্ছে। আর কিছু নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে বাঁশ খাচ্ছে। চেহারায় এমন এক প্রশান্তি, যেন পৃথিবীর যাবতীয় ব্যস্ততা থেকে নিজেকে বহু আগেই অব্যাহতি দিয়েছে। এক হাতে বাঁশ, মুখে চিবানোর অবিরাম কর্মসূচি। মাঝেমধ্যে একটু নড়াচড়া, তারপর আবার সেই একই ভঙ্গি।

পান্ডাদের এই অলসতাকে অবশ্য নিছক আলস্য বললে অন্যায় হবে। বাঁশে পুষ্টি কম। তাই শরীরের শক্তি বাঁচিয়ে চলাই ওদের স্বাভাবিক জীবনযাপন। ফলে দিনের বড় একটা সময় ওদের কাটে খাওয়া আর বিশ্রামে। আমাদের কাছে যা অলসতা, পান্ডার কাছে সেটাই বেঁচে থাকার কৌশল।
পাশে দাঁড়ানো বিদেশিনীর দিকে চোখাচোখি হতেই মেয়েটা হেসে বলল, ‘ওর কোনো তাড়া নেই।’
প্রত্যুত্তরে বললাম, ‘ওরা ভাগ্যবান। কেউ ওদের বলে না, “জলদি করো!”’
ব্যস্ত জীবনে আমাদের যেখানে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটতে হয়, সেখানে পান্ডা যেন আমাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্বিকারভাবে বলছে, ধীরে চললেও পৃথিবী থেমে যায় না।
অন্য এনক্লোজারে কয়েকটা পিচ্চি পান্ডা বসে আছে। আমাদের দিকে একবারও তাকাল না।

‘এই যে! এত মানুষ তোমাকে দেখতে এসেছে!’
কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
‘একটু তাকাও!’
নেই।
‘শুধু একটা ছবি তুলব?’
তবু নেই।
বরং সে একটা বাঁশ হাতে নিল। তারপর খুব যত্ন করে একটা অংশ বেছে নিল। যেন কোনো অভিজ্ঞ রসনাবিদ খাবার পরীক্ষা করছে। এরপর এমনভাবে তা চিবোতে শুরু করল, যেন পৃথিবীতে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর কিছু নেই।
বাইরে হাঁটার সময় জায়ান্ট পান্ডাদের খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ এক গাছের দিকে চোখ আটকে গেল। পাতার আড়ালে কিছু একটা নড়ছে। একটু ভালো করে তাকাতেই দেখা গেল লাল পান্ডা। শুধু একটি নয়; কয়েকটি গাছের ডালে আলাদা আলাদা কয়েকটি। সাদা-কালো পান্ডার মতো বিখ্যাত না হলেও গাছের ওপর এদের চলাফেরা বেশ প্রাণবন্ত। কেউ ডাল বেয়ে ওপরে উঠছে, কেউ পাতার আড়ালে মুখ লুকিয়ে ফেলছে। একই পরিবারের দুই ভাই যেন দুই ভিন্ন স্বভাবের। একজন মাটিতে বসে সারা দিন খেতে আর ঘুমাতে ব্যস্ত, আর অন্যজন গাছে উঠে চারপাশটা দেখে বেড়াচ্ছে।

পান্ডাদের এই অলস অথচ সুখী জীবন দেখে বেরিয়ে হোস্টেলে দ্রুত চেক-ইন সেরে নিলাম। কারণ, শহরের বাকি অংশের সঙ্গে পরিচয় তখনো বাকি। শহরের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে দৃশ্যপট একেবারেই বদলে গেল। পান্ডাদের সবুজ, শান্ত জগৎ পেরিয়ে এবার দাঁড়ালাম তিয়েনফু স্কয়ার নামের বিশাল এক নগরচত্বরে। চারপাশে প্রশস্ত রাস্তা, উঁচু ভবন, মানুষের ব্যস্ত চলাচল। আর সেই বিস্তৃত চত্বরের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দাঁড়িয়ে মাও সে–তুংয়ের বিশাল মূর্তি।
বৈপরীত্যটা বেশ তীব্র। সকালে পান্ডার নরম, নির্বিকার মুখের বিপরীতে এখন সামনে দাঁড়িয়েছে ইতিহাসের এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীক। একজন পৃথিবীকে দেখেছে ধীরগতিতে, অন্যজন বদলে দিতে চেয়েছে নিজের দেশের গতিপথ। মাও সে–তুং আধুনিক চীনের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর নেতৃত্বে চীনা বিপ্লবের সাফল্য, গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাই এই ভাস্কর্য চীনের রাজনৈতিক ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় স্মৃতিরও একটি দৃশ্যমান প্রতীক।

দিনের শেষ অধ্যায়টির নাম কোয়ানঝাই অ্যালি। নামের অর্থই ‘প্রশস্ত ও সরু গলি’। এটি পুরোনো তিনটি সমান্তরাল গলির সমষ্টি। কিন্তু এই গলির আসল আকর্ষণ এর দৈর্ঘ্য-প্রস্থে নয়, এর ইতিহাসে। কিং রাজবংশের সময় এখানে মানচু সৈন্যদের বসতি ছিল। ওই সময়ের পুরোনো উঠোনবাড়ি, ইটের দেয়াল, কাঠের দরজা আর অলিগলির কাঠামো আজও অনেকটা টিকে আছে। কিন্তু সেগুলোতে আজ বসেছে আধুনিক ক্যাফে, চায়ের দোকান, রেস্তোরাঁ আর নানা ধরনের দোকানপাট।
রাত যত বাড়ছে, আলো-আঁধারিতে কোয়ানঝাই এলির শতবর্ষী গলি তত জীবন্ত হয়ে উঠছে। পুরোনো বাড়ির কারুকাজে আলো পড়ছে। গলির ভেতর মানুষের ভিড় বাড়ছে। কোথাও খাবারের গন্ধ। কোথাও চায়ের কাপের ধোঁয়া। কোথাও তরুণদের আড্ডা।


এখানে পুরোনোকে সরিয়ে নতুনকে বসানো হয়নি; বরং দুজনকে একই উঠোনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। গলির মধ্যে এমাথা-ওমাথা হেঁটে হেঁটে দেখছি। এক দোকানে ভেড়ার মাংসের কাবাব গলাধঃকরণ করে এক কাপ চা নিয়ে বসলাম। আদতে চা এখানে শুধু পানীয় নয়; বসে থেকে নানা রঙের মানুষ দেখার এক অজুহাত। সব জায়গা ছুটে ছুটে দেখার নয়। কিছু জায়গায় থামতে হয়, তাকাতে হয়, শুনতে হয়।
পান্ডা আমাকে হাসিয়েছে, মাও সে–তুং আমাকে ভাবিয়েছে, আর কোয়ানঝাই অ্যালি আমাকে মুগ্ধ করেছে। সব মিলিয়ে পান্ডার সাদা-কালো শরীর, পুরোনো গলির ইটের দেয়াল, বিশাল প্রতিকৃতি দিয়ে চেংদু এই দিনকে বেশ রাঙিয়েছে। সকালে পান্ডা আমাকে শিখিয়েছে, সব সময় ছুটতে নেই। কখনো একটু বসতে হয়। কখনো ধীরে হাঁটতে হয়। আর মাঝেমধ্যে বাঁশ খেয়েও পৃথিবীর সব চিন্তা ভুলে থাকতে হয়, খেতেও হয়। কদিনের ছোটাছুটিতে আমি কিছুটা ক্লান্ত। তাই ঠিক করলাম, পান্ডার উপদেশ শুনব। পরদিন লেশানের অতিকায় বুদ্ধমূর্তি দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও তা বাতিল করে দিলাম। হোক না একটা দিন একটু ধীর!


তবে একটা সমস্যা আছে। দেশে অফিসে ফিরে যদি বলি, পান্ডাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এখন থেকে একটু ধীরে কাজ করব; তাহলে পান্ডাদের মতো বাঁশ খাওয়া নিশ্চিত হলেও ওদের মতো মনে হয় আমার ভাগ্য অতটা ভালো হবে না!
ছবি: লেখক