স্মৃতিময় দুর্গাপূজা ২: এই মন্দিরে পূজা দেখতে গিয়ে জানুন এর অনবদ্য অতীত কথাও
শেয়ার করুন
ফলো করুন

দুর্গাপূজার রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস। সর্বজনীন হওয়ার শতবর্ষ আগে এ পূজা কেবল জমিদার আর রাজরাজড়ারাই আয়োজন করতেন। কেমন করে রাজসিক থেকে সর্বজনীন হলো এই পূজা? তার নেপথ্যকাহিনি জানা গেল দ্বাদশ শতাব্দীতে সেন রাজা বল্লাল সেনের প্রতিষ্ঠিত ঢাকেশ্বরী মন্দিরে।

ঢাকার অন্যান্য মন্দিরের চেয়ে অন্যতম আমেজ মিশে আছে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে। ধারণা করা হয়, এটি ঢাকার আদি ও প্রথম মন্দির। মন্দিরের প্রধান ফটক, তোরণ আর বাইরের দেয়াললিখন মনস্তাত্ত্বিকভাবে একধরনের আগ্রহ তৈরি করে ভেতরের বিষয়বস্তু সম্পর্কে। ঢাকেশ্বরীর সঙ্গে ঢাকার রয়েছে নাড়ির সম্পর্ক।

অনেকেই বলেন, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের নাম থেকেই হয়েছে ঢাকার নামকরণ
অনেকেই বলেন, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের নাম থেকেই হয়েছে ঢাকার নামকরণ

ঢাকার নাম নিয়ে তিনটি উপকথা প্রচলিত আছে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের নাম থেকেই ঢাকার নামকরণ হয়েছে। আবার ব্রিটিশরা যখন উপমহাদেশে আসে, সে সময় এই অঞ্চলে প্রচুর ঢাকগাছ হতো, সেখান থেকেই এর নাম হয় ‘ঢাকা’। শায়েস্তা খাঁর আমলে তিনি যখন বুড়িগঙ্গার তীরে নামেন, তখন তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে ঢাক বাজানো হয়েছিল। তখন শায়েস্তা খাঁ বলেন, যত দূর পর্যন্ত ঢাকের শব্দ যাবে, তত দূর জায়গার নাম হবে ঢাকা। এ ইতিহাস থেকেই বলা চলে যে ঢাকেশ্বরী কেবল বাংলাদেশের জাতীয় মন্দিরই নয়, প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদও বটে।

বিজ্ঞাপন

মন্দির প্রাঙ্গণের ডানে পুরোদমে চলছে প্যান্ডেল তৈরির কাজ। ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে মূল মঠের ভেতর ৪০০ বছর আগে রাজা মান সিংহের সময়ে নির্মিত চারটি গম্বুজ। পাশেই আছে বড় পুকুর। মূল মন্দিরে আছে শ্বেতপাথরের দুর্গাপ্রতিমা; সারা বছর এই বিগ্রহের পূজা হয়।

পুরোদমে চলছে প্যান্ডেল তৈরির কাজ।
পুরোদমে চলছে প্যান্ডেল তৈরির কাজ।

মন্দিরের পূজারি অজয় দেবনাথ জানালেন, সর্বজনীন পূজার জন্য বাইরের মন্দিরে যে প্রতিমা আছে, তা গত বছরের। পাশেই একটি কক্ষে গড়া হচ্ছে এ বছরের প্রতিমা। অন্যান্য মন্দিরে প্রতিমা বিজয়া দশমীর দিন বিসর্জন দেওয়া হলেও ঢাকেশ্বরীতে সারা বছর ভক্তদের দর্শনের জন্য প্রতিমা বাইরের মন্দিরে রেখে দেওয়া হয় ও নিত্যপূজা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

মহালয়ার দিন এই প্রতিমাকে বিসর্জন দিয়ে নতুন প্রতিমার সামনে ঘট বসিয়ে চক্ষুদানের মাধ্যমে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হয়। আরও জানা যায়, বিসর্জনের দিন দেবীর সামনে রাখা হয় একটি ঘট ও দর্পণ বা আয়না। এর মাধ্যমে দর্পণ বিসর্জন হয়। এরপর জলে ফেলে একে নিরঞ্জন দেওয়া হয়। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে মহালয়ার দিন দেবীপক্ষের শুরুতে সকাল ছয়টায় মহালয়া পূজা শেষে দুপুরে আগের মূর্তিকে দর্পণ বিসর্জন দিয়ে নতুন প্রতিমা স্থাপন করা হয়।

গত বছরের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে এবাবের মহালয়ার দিন
গত বছরের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে এবাবের মহালয়ার দিন

মন্দিরে অনেকের সঙ্গেই কথা বলে জানা যায় দুর্গাপূজার ইতিহাস। পূজা-পার্বণ বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। দুর্গাপূজা একসময় কেবল জমিদার আর রাজারা করতেন। তখন সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারত না। রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হলে এই পূজা হয়ে যায় বারোয়ারি। সমাজের বিত্তবানেরা মিলে এই পূজার আয়োজন করতেন। পরবর্তী সময় রূপ নেয় সর্বজনীন দুর্গাপূজায়। এখন সব শ্রেণি ও গোত্রের মানুষ অংশগ্রহণ করে। আগে শুধু ব্রাহ্মণেরা ছাড়া কেউ পূজাকর্মে থাকতে পারত না। কিন্তু এখন এসব নিয়ম নেই। হিন্দুধর্মের শাস্ত্রমতে চারটি বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও  শূদ্র) যে কেউ এখন মন্দিরের পূজার কাজে থাকতে পারে, তবে এর আগে বিধিমোতাবেক শুদ্ধ হতে হয়।

বাংলাদেশের এখনকার মানচিত্রে প্রথম দুর্গাপূজা হয় মোগল আমলে রাজশাহীর তাহেরপুরে রাজা কংসনারায়ণের মন্দিরে। রাজা কংসনারায়ণ রায়বাহাদুর এর প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে, মন্দিরটি অসুরের অশুভ প্রভাব থেকে মুক্তির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে। রাজা কংসনারায়ণ সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রবর্তন করেন। ১৫৮২ সালে শরৎকালে প্রথম দুর্গাপূজা হয়। উৎসবটি হয়েছিল বারনই নদের পূর্ব তীরে রামরামা গ্রামের দুর্গামন্দিরে। আজও বাঙালির সর্বজনীন দুর্গোৎসবে সেই পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়।

ঢাকেশ্বরীর মূল মন্দির, এখানে অধিষ্ঠিত প্রতিমার পূজিত হন সারা বছর
ঢাকেশ্বরীর মূল মন্দির, এখানে অধিষ্ঠিত প্রতিমার পূজিত হন সারা বছর

বাংলা মোগলদের অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলে সম্রাট আকবর রাজা কংসনারায়ণকে সুবেবাংলার দেওয়ান নিযুক্ত করেন। কিন্তু যথেষ্ট বয়স হওয়ায় তিনি দেওয়ানের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে তাহেরপুরে ফিরে ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এর পেছনে রয়েছে আরেকটি গল্প। তিনি রায়বাহাদুর উপাধিকে উদ্‌যাপন করার জন্য অশ্বমেধ যজ্ঞ বা রাজসূয় যজ্ঞ করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু শাস্ত্রে এমন নিয়ম ছিল না। পণ্ডিতেরা বলেন, ‘কলিযুগে অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্ভব নয়। মার্কণ্ডেয় পুরাণে যে দুর্গার কথা আছে, তার পূজা করুন।’ এভাবেই তিনি প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করেন।

পূজায় প্রতিমার কাঠামো প্রসঙ্গে কথা হয় ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রতিমাশিল্পী দুলাল পালের সঙ্গে। ১০ বছর ধরে এই মন্দিরের প্রতিমা গড়ার কাজ করে আসা দুলাল পাল বলেন, কংসনারায়ণের বহুকাল আগে থেকেই বঙ্গদেশে দুর্গাপূজার প্রচলন থাকলেও কংসনারায়ণ বিপুল অর্থ ব্যয়ে বঙ্গদেশে যে দুর্গোৎসবের সূচনা করেন, তা বাঙালি সমাজে কিংবদন্তি তৈরি করেছিল।

মন্দিরের বাইরের অংশে চলছে এ বছরের প্রতিমা গড়ার কাজ
মন্দিরের বাইরের অংশে চলছে এ বছরের প্রতিমা গড়ার কাজ

ফলে কংসনারায়ণের রীতি সারা বঙ্গদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই রীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো একচালার দুর্গাপ্রতিমার চালি, ওপরের দিকে লক্ষ্মী ও সরস্বতী এবং নিচে গণেশ ও কার্তিকের অবস্থান। প্রতিমার পেছনে অর্ধচন্দ্রাকার চালি, তথা চালচিত্রের ব্যবহার। যে চালিতে মূলত দশ মহাবিদ্যা ও মহাদেবের অবস্থান। এ ধরনের চালিকে ‘বাংলা চালি’ বলা হয়। প্রতিমার মুখের আদলে থাকে অভিনবত্ব। দেবীপ্রতিমায় থাকত টানা টানা চোখ ও টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকানো নাক। দেবীর দুই গাল সামান্য চাপা। এ ধরনের মুখের আদলকে বলা হয় ‘বাংলা মুখ’। দেবীপ্রতিমার বর্ণ গাঢ় হলুদ।

বসন্তকালে অনুষ্ঠিত পূজাকে বলা হয় ‘বাসন্তী পূজা’। দুর্গাপূজায় দৃশ্যমান থাকে অসুর। দেবী দুর্গা শুভ শক্তির প্রতীক। অসুর (অশুভ শক্তি) নিধনের জন্য শরৎকালে তাঁর পূজা হয় বলে একে ‘অকালবোধন’ বলা হয়।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মূল ফটক
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মূল ফটক

আরও জানা যায়, ১৯৭৫–পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিজেদের মধ্যে সংঘবদ্ধ হতে ১৯৭৮ সালে মহানগর পূজা কমিটি গঠন করেন। দেবী রায়চৌধুরী, দেবস্ব ভট্টাচার্য, কাজল দেবনাথসহ সে সময়ের তরুণ অনেকেই ছিলেন সেই কমিটিতে। তখন থেকে বহিরাঙ্গনে দুর্গাপূজা শুরু হয়। বাংলাদেশে ৩২ হাজার পূজামণ্ডপ আছে, ঢাকায় প্রায় ২৫০টি। আগে মাসব্যাপী পূজা হতো, দশ গ্রামের লোক আসত। আর এখন ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে সবাই আসে পূজা দেখতে। প্রসাদ থাকে সবার জন্য। একসময় কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই পূজায় চাঁদা দিত। এখন সব ধর্মের মানুষ চাঁদা দেয়, সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়নে এগিয়ে আসে।

এবারের পূজার আয়োজনও প্রতিবারের মতো বিশুদ্ধ শাস্ত্রমতে পাঁচ দিন হবে। দুর্গাপূজার অংশ হিসেবে এবারও শাস্ত্রমতে চণ্ডীপাঠ হবে। এ নিয়ে প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়, এতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দল অংশগ্রহণ করে। থাকে আরতি, যার একটি অংশ হচ্ছে ধুনচি নৃত্য, ধুপ নৃত্য ও ঢাকবাদ্যের আয়োজন। অঞ্জলি দেওয়া, প্রণাম, সন্ধিপূজা, মহাপ্রসাদ বিতরণ, বস্ত্র বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছায় রক্তদানসহ নানা আয়োজন।

পুরো প্রস্তুতি সম্পন্ন। প্রতিবারের মতো এবারও সাড়ম্বরে ও আনন্দের সঙ্গে উদ্‌যাপিত হবে শারদীয় দুর্গাপূজা। এ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ঢাকেশ্বরী মিডিয়া সেন্টারের কর্মী অভিজিৎ।

ছবি: শিশির চৌধুরী

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৪, ১২: ২৩
বিজ্ঞাপন