
সকালের বেইজিং তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। শহরের রাস্তায় ব্যস্ততার মৃদু গুঞ্জন, আকাশে নরম আলো। বিমানবন্দর থেকে এক্সপ্রেসওয়ে রেলে চেপে দ্রুত চলে গেলাম শহরের ভেতরে। খরচ আর সময় দুটোই বাঁচাতে আগে থেকেই বুক করে রাখা বাস ধরতে হবে। ভ্রমণে সময়ের হিসাবটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষ করে যখন সামনে থাকে এমন এক জায়গা, যেখানে আছে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস পায়ের নিচে নিয়ে হাঁটার সুযোগ।

বাস ছাড়তেই বেইজিং ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগল। সকালের নরম আলো আর শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে বাস ছুটছে পাহাড়ের দিকে। জানালার বাইরে দৃশ্যপটও বদলে যাচ্ছে ক্রমশ। কংক্রিটের অরণ্যের জায়গা নিচ্ছে সবুজ পাহাড়। উঁচু দালানের সারি মিলিয়ে গিয়ে দিগন্তে ভেসে উঠছে পাহাড়ের ঢেউ। চীনের প্রথম সম্রাট কিন সি হুয়াংয়ের হাতে গোড়াপত্তন হওয়া ১৩ হাজার মাইল বিস্তৃত এই মহাপ্রাচীরের অনেক অংশেই যাওয়া যায়। আমার গন্তব্য চীনের মহাপ্রাচীরের মুতিয়ানিউ অংশ।
মুতিয়ানিউতে পৌঁছেই প্রথম কাজ শাটল বাসে চড়ে মূল প্রাচীরের কাছে যাওয়া। এখানকার মহাপ্রাচীর পূর্ব ও পশ্চিম দুই দিকে বিস্তৃত। পূর্ব দিক ইতিহাসের দিক থেকে বেশ আকর্ষণীয়; কিন্তু তুলনামূলক নিচু। পশ্চিম দিকে প্রাচীর উঠেছে আরও উঁচু পাহাড়ের কাঁধ বেয়ে। দুই দিকের টিকিটও আলাদা। অনেকেই দুই দিকের টিকিট নিয়ে পুরোটা ঘুরে দেখে। আমার অবশ্য এত বড় মহাপরিকল্পনা নেই। গন্তব্য হিসেবে বেছে নিলাম পশ্চিম দিককেই। তবে পরে বুঝলাম, সিদ্ধান্তটা যতটা সরল মনে হয়েছিল, হাঁটাটা ততটা সরল নয়!

কেবল কার ধীরে ধীরে পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। নিচে সবুজ বন, সামনে পাহাড়ের ঢাল; আর দূরে কোথাও কোথাও মহাপ্রাচীরের পাথুরে রেখা। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ১৪ নম্বর ওয়াচ-টাওয়ারে। এখান থেকেই শুরু হলো আমার মহাপ্রাচীরের যাত্রা।
প্রথম কয়েক পা বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই এগোলাম। একটার পর একটা সিঁড়ি। যত এগোচ্ছি, পথ ততই চড়াই। কোথাও কোথাও সিঁড়ি এত খাড়া যে পরের ধাপে পা রাখার আগে নিজের সাথে হালকা বোঝাপড়া করতে হচ্ছে। দুই-তিন ধাপ উঠেই থামছি। হাঁপাচ্ছি। আবার হাঁটছি। আবার থামছি। এদিকে সুর্যি মামা যেন আজ আমাকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করে ফেলেছেন। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো রোদটা এমনভাবে পড়ছে, যেন আজই আমাকে বার-বি-কিউ করার শপথ নিয়ে তিনি আকাশে উঠেছেন!

লোকসমাগমও বেশ। কেউ ছবি তুলছে, কেউ হাঁপাচ্ছে, কেউ আবার হাঁপাতে হাঁপাতে হাসিমুখে সেলফি তুলছে। কেউ হয়তো আমার মতোই ভাবছে, ‘কী দরকার ছিল বাপু এত সিঁড়ি বানানোর?’
তবে এই কষ্টের মাঝে এক অদ্ভুত আনন্দ আছে। কারণ, প্রতিটি ধাপের শেষে অপেক্ষা করছে নতুন কোনো দৃশ্য। প্রাচীরের পাথরগুলো পায়ের নিচে শক্ত, কোথাও মসৃণ, কোথাও আবার অসমান। কয়েক শতাব্দীর বাতাস, বৃষ্টি আর মানুষের পদচিহ্ন যেন পাথরের গায়ে জমা। কোথাও দেয়াল উঁচু হয়ে পাহাড়ের ঢালকে আঁকড়ে ধরেছে, কোথাও আবার দুই পাশে খোলা আকাশ; নিচে গভীর সবুজ উপত্যকা।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হলো—এই যে পাথরের ওপর দিয়ে এগিয়ে চলেছি, এর পেছনে তো কেবল স্থাপত্যের গল্প নেই; আছে ভয়, যুদ্ধ, সাম্রাজ্য আর মানুষের অদম্য শ্রমের দীর্ঘ ইতিহাস। মহাপ্রাচীর আসলে এক দিনে, এক শাসকের হাতে তৈরি কোনো একক স্থাপনা নয়। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে চীনের বিভিন্ন রাজ্য নিজেদের সীমানা ও জনপদ রক্ষায় দেয়াল নির্মাণ শুরু করেছিল। পরে বিভিন্ন রাজবংশ সেই দেয়ালগুলোকে জুড়েছে, মেরামত করেছে, বাড়িয়েছে। আজ যে মহাপ্রাচীরকে আমরা চিনি, তার সবচেয়ে সুসংরক্ষিত ও দৃশ্যমান অংশগুলোর বড় অংশই মিং রাজবংশের সময় নির্মিত। যে প্রাচীরে একসময় সৈন্যরা পাহারা দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকত, আজ সেখানে আমরা দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি। সময়ের কী অদ্ভুত রসিকতা!

রোদের তাপে শরীর গরম হয়ে আসছে। কপাল বেয়ে ঘাম নামছে। বুক ধড়ফড় করছে। মনে হচ্ছে, একটু বসি; কিন্তু ঠিক আগমন ঘটে আরেকটি ওয়াচ-টাওয়ারের। শরীরের সঙ্গে মনের আপস হয়ে যায়। ভাবি, ‘আর একটু যাই!’
এই ‘আর একটু’ কথাটাই শেষ পর্যন্ত মানুষকে কত দূর নিয়ে যায়!
২০ নম্বর ওয়াচ টাওয়ার পেরোতেই সিঁড়িগুলো যেন হঠাৎ শত্রুপক্ষের চরিত্র ধারণ করল। এর পরের অংশটা বেশ খাড়া। হাঁটার গতি আরও কমে গেল। সামনে সিঁড়ি, পেছনে সিঁড়ি, মাঝখানে আমি। ধীরে ধীরে এগোচ্ছি ২৩ নম্বরের দিকে।
২৩ নম্বর ওয়াচ-টাওয়ারের কাছে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। চারপাশে শুধু পাহাড়, আকাশ আর প্রাচীর। দূরের পাহাড় কুয়াশার হালকা পর্দায় আবছা। বাতাসে পাহাড়ের নিজস্ব গন্ধ। নিচের পৃথিবীটা তখন অনেক ছোট।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শরীরকে বিশ্রাম দিলাম, চোখকে দিলাম প্রাপ্য আনন্দ। তারপর ধীরে ধীরে ফিরে চললাম ১৪ নম্বর ওয়াচ-টাওয়ারের দিকেই। এই প্রাচীরের ওপর দিয়ে কত মানুষ হেঁটেছে! কত সৈনিক এখানে দাঁড়িয়ে দূরের দিগন্ত দেখেছে। কত ঋতু এসেছে, চলে গেছে। কত রাজবংশের উত্থান-পতন হয়েছে। অথচ পাহাড়গুলো রয়ে গেছে, প্রাচীরের পাথরগুলো রয়ে গেছে; আর আজ সেখানে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সেই দীর্ঘ পথের ওপর আমিও কয়েক পা রেখে গেলাম।
ফেরার সময় অবশ্য আর ইতিহাস নিয়ে ভাবার মতো অবস্থা ছিল না। তবু কৌতূহল তখনো মরেনি। একবার যেহেতু এসেছি, পূর্বদিকটা একেবারে না দেখে ফিরে যাওয়া যায় কি? তাই পশ্চিমের পথ শেষ করে পূর্ব দিকে ঘুরে আরও দুই-তিনটি ওয়াচ-টাওয়ার দেখে নিলাম। পথ খুব বেশি নয়; কিন্তু প্রতিটি বাঁকেই অপেক্ষমাণ কোনো নতুন দৃশ্য। কোথাও পাহাড়ের বিস্তার, কোথাও প্রাচীরের নিঃসঙ্গতা, কোথাও পর্যটকের কোলাহল। সব মিলিয়ে একেকটি বাঁকের একেকটি আলাদা রূপ।

শেষ পর্যন্ত আবার নিচে নামার পালা। শরীর তখন ক্লান্ত, পা ভারী। কেব্ল কারে নেমে শাটল বাসে ফিরলাম। পাহাড় পেছনে রেখে আবার বাসে উঠলাম। শহরে ফিরছি, অথচ মনে হচ্ছে পাহাড়ের একটা অংশ যেন আমার ভেতরেই রয়ে গেছে। এক বেলা হেঁটে এসেছি কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসের ওপর দিয়ে। প্রতিটি ধাপ আমাকে একটু একটু করে বুঝিয়েছে—কিছু স্থান চোখ দিয়ে নয়, অনুভূতি দিয়ে দেখতে হয়।
প্রতিটি সিঁড়ি, প্রতিটি হাঁপ ধরা মুহূর্ত, প্রতিটি থেমে দেখা দৃশ্য মিলেই আমার কাছে এই মহাপ্রাচীর; আর এর সবচেয়ে সুন্দর অংশটি হয়তো কোনো পাথর, কোনো ওয়াচ-টাওয়ার কিংবা কোনো স্থাপত্য নয়। বরং পাহাড়, আকাশ আর প্রাচীরের নিঃশব্দ সহাবস্থান; আর দূর থেকে ভেসে আসা মৃদুস্বরে বাজতে থাকা সুরের কলতান।
লেখক: পর্যটক
ছবি: লেখক