মৎস্যকন্যার খোঁজে ৩
শেয়ার করুন
ফলো করুন

আমরা ফ্রান্সের দক্ষিণের শহর তুলুজ থেকে ইতালির দক্ষিণের নগরী নেপলসে এসেছিলাম হাতে মাত্র চার দিন নিয়ে। ইতিহাস আর বর্তমানের সন্ধিক্ষণে এসে বুঝতে পারলাম যে এই বহু শতাব্দীপ্রাচীন সভ্যতা অনুধাবন করা একজীবনে সম্ভব নয়। আর চার দিনে এর নগরীর একটি ক্ষুদ্র অংশই শুধু দেখাই হয়—কিছু জানা হয় না, কিছু বোঝা হয় না। তারপরও আমাদের মুগ্ধতার শেষ নেই।

বিজ্ঞাপন

সাধারণ পরিবহনব্যবস্থা ও ফানিকুলার

ফানিকুলার ডি চিয়াইয়া, নেপলস, ইতালি
ফানিকুলার ডি চিয়াইয়া, নেপলস, ইতালি

নেপলসে সাধারণ পরিবহনব্যবস্থা পর্যটকবান্ধব। বাস, পাতালরেল, রেল, ট্রাম ও ফেরি এমনকি খাড়া পাহাড় বা ঢালু পথে যাতায়াতের জন্য রয়েছে ফানিকুলার। আমি এই ফানিকুলারে উঠে অনেক নিচে নেমে গেলাম। অনেক নিচ থেকে অনেক ওপরের শহরকে মনে হয় আকাশের কোলে অন্য জগৎ। নিচের শহরে ঘুরেফিরে একটি কফিশপে এক কাপ ইতালিয়ান এসপ্রেসোতে গলা ভিজিয়ে আবারও ফানিকুলারের আসনে বসে আকাশ ছোঁয়ার এক অন্য রকম আনন্দ অনুভব করলাম।

বিজ্ঞাপন

পিয়াজ্জা দেল প্লেবিসি

নেপলস নগরীতে নেপচুনের ঝরনা (ফন্তানা দেল নেত্তুনো), ১৬০০-১৬০১ সালে নির্মিত একটি স্মারক মার্বেল স্থাপত্যকর্ম
নেপলস নগরীতে নেপচুনের ঝরনা (ফন্তানা দেল নেত্তুনো), ১৬০০-১৬০১ সালে নির্মিত একটি স্মারক মার্বেল স্থাপত্যকর্ম

আপনি না চাইলেও নেপলসের প্রাণকেন্দ্রে বিশাল এক চত্বর আপনার দৃষ্টি কাড়বে। ২৫ হাজার বর্গমিটার বা ২ লাখ ৭০ হাজার বর্গফুটের এই চত্বরের নাম ‘পিয়াজ্জা দেল প্লেবিসি’। নেপলসের সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত জনচত্বর। মিছিল, জনসভা, আনন্দ, উৎসবে প্রাণবন্ত হয় সাগর তীরের এই চত্বর। এখানে দাঁড়িয়ে এই প্রাচীন নগরীর হৃদয়ের ধুকপুকানি শুনতে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, একটি বেশ জমকালো রাজপ্রাসাদ ‘পালাজ্জো রিয়ালে দি নাপোলি’ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে চার শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এখানে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এক কালে এই প্রাসাদ ছিল নেপলসের স্প্যানিশ ভাইসরয় এবং পরবর্তী সময়ে বুরবন রাজাদের প্রধান বাসস্থান ও ক্ষমতার কেন্দ্র।

পিয়াজ্জা দেল প্লেবিসি—২৫ হাজার বর্গমিটারের নেপলসের সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত জনচত্বর
পিয়াজ্জা দেল প্লেবিসি—২৫ হাজার বর্গমিটারের নেপলসের সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত জনচত্বর

নান্দনিক স্থাপত্যকলার এই চমৎকার স্থাপনার সামনের প্রাচীরজুড়ে পাশাপাশি আটটি কুলুঙ্গিতে নেপলস শাসনকারী আটটি রাজবংশের (নরমান, সোয়াবিয়ান, আনগেভিন, আরাগোনীয়, হাবসবার্গ, বুরবন, বোনাপার্টিস্ট ও সাভয়) বিখ্যাত রাজাদের ভাস্কর্য রয়েছে। শিল্পীর হাতের জাদুকরি ছোঁয়াতে আটজন রাজপুরুষকে ভীষণ রকমের জীবন্ত মনে হবে। মনে হবে সুদূর অতীত যেন মূর্ত হয়েছে বর্তমানে। বর্তমানে এখানে একটি জাতীয় জাদুঘর এবং একটি অংশে বিখ্যাত জাতীয় লাইব্রেরি অবস্থিত।

দিনের শেষে এই চত্বরে এসে জড়ো হন ব্যস্ত নগরীর ক্লান্ত নাগরিকেরা। কেউ আসেন একা, কেউ–বা আসেন দলবেঁধে বা পরিবারের সবাইকে নিয়ে। একটু যেন ব্যস্ত জীবন থেকে বিদায় নেওয়া। একটু উদ্দেশ্যবিহীন ঘুরে বেড়ানোর জন্য। পর্যটকেরা এই জনচত্বরে সবার সঙ্গে মিশে যান। প্রতিদিন এখানে জমে ওঠে আনন্দ মেলা। ভাগ্যের সন্ধানে নিজ দেশ ছেড়ে আসা মানুষদের কেউ কেউ স্যুভেনির বিক্রি করেন।

পিয়াজ্জা দেল প্লেবিসি জনচত্বরের একপাশে রাজপ্রাসাদ—চার শতাব্দ পূর্বে নির্মিত ‘পালাজ্জো রিয়ালে দি নাপোলি’
পিয়াজ্জা দেল প্লেবিসি জনচত্বরের একপাশে রাজপ্রাসাদ—চার শতাব্দ পূর্বে নির্মিত ‘পালাজ্জো রিয়ালে দি নাপোলি’

ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলে দেখা যাবে সুঠাম দেহের আফ্রিকান তরুণেরা শারীরিক কসরত দেখিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করছেন। কেউ–বা সংগীতের মূর্ছনায় মাতিয়ে তুলছেন পথচারীদের মন। এক ফাঁকে দেখা হয়ে যাবে বাংলাদেশের কোনো যুবকের সঙ্গে, মাত্র পাঁচ ইউরোর বিনিময়ে একটি লাল গোলাপ আপনার হাতে পৌঁছে দেবে আপনার প্রিয় মানুষের জন্য। অথবা একজোড়া রোদচশমা বাড়িয়ে দিলে—মাত্র দশ ইউরোতেই পাওয়া যাবে সে চশমা। সঙ্গে খুব সুন্দর হাসি।

উপসাগরের ধারে সন্ধ্যা

পিয়াজ্জা দেল প্লেবিসি থেকে খানিকটা এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে তরঙ্গবিহীন তিররেনীয় উপসাগরের ফিরোজা রঙের জলরাশি। দূরে তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে জীবন্ত ভিসুভিয়াস। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৯ সালে ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে ছাই আর লাভায় পুরো শহরটা চাপা পড়ে গিয়েছিল, আর সেই ছাইয়ের নিচেই প্রায় দুই হাজার বছর ধরে সংরক্ষিত ছিল রোমান যুগের একটা গোটা জনপদ। পাথরে বাঁধানো রাস্তা, মন্দির, বাজার, এমনকি বাড়ির দেয়ালে আঁকা রঙিন ছবি, সবকিছু যেন সময়ের একটা মুহূর্তেই থমকে গেছে। সেই বিষাদময় স্মৃতি নিয়ে আজও আছে সেই দানব আগ্নেয়গিরি।

তিররেনীয় উপসাগরের তীরে বিকালে হালকা ঠান্ডা বাতাসে চারিদিকে উৎসবের আমেজ
তিররেনীয় উপসাগরের তীরে বিকালে হালকা ঠান্ডা বাতাসে চারিদিকে উৎসবের আমেজ

হঠাৎ করেই খিলখিল উচ্ছল হাসিতে আমার ভাবনায় ছেদ পড়ে। একদল উচ্ছল তরুণ-তরুণী দলবেঁধে হেটে গেল। সমুদ্রতীরে বহু মানুষের সমাগম। অনেকেই বসে আছেন সাগরের তীরে। দূরে অনেক পালতোলা নৌকা। বিলাসী মানুষদের বিলাসী নৌ ভ্রমণের দৃশ্য। কেউ কেউ সাগর জলে বড়শি ফেলে মাছ ধরার ধ্যানে অলস সময় কাটাচ্ছেন।
এমন বিকালে হালকা ঠান্ডা বাতাসে চারিদিকে উৎসবের আমেজ। এখানে সারা বছরই নাকি এমনই থাকে। বহু দেশের মানুষের দেখা পাওয়া যাবে। কান পাতলেই নানা বিচিত্র ভাষার মধ্যেও বাংলা ভাষাও শুনতে পাওয়া যাবে। নেপলসে বেড়াতে এলে সাগরের পাড় ধরে হেঁটে গেলে মোটেই ক্লান্তি বোধ হবে না। নিজেকে মনে হবে সদা চলমান আনন্দমিছিলের একজন।

ভিসুভিয়াসের কোলে পম্পেই

নেপলসে এলে, পম্পেই নগরী না দেখে ফিরে গেলে তা হবে খুব অনুশোচনার। পম্পেই নেপলস থেকে ২২ কিলোমিটার বা ১৪ মাইল যেতে ট্রেনে আমাদের সময় লেগেছে ৩০ মিনিট। আর মাথাপিছু একদিকের ভাড়া ৩,৩০ ইউরো।

 নেপলস থেকে ২২ কিলোমিটার বা ১৪ মাইল দূরে পম্পেইতে ’৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে নিহত এক ব্যক্তির প্লাস্টার কাস্ট—পম্পেইতে দেখা মিলবে
নেপলস থেকে ২২ কিলোমিটার বা ১৪ মাইল দূরে পম্পেইতে ’৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে নিহত এক ব্যক্তির প্লাস্টার কাস্ট—পম্পেইতে দেখা মিলবে

মৃত নগরী পম্পেইতে প্রবেশমূল্য ২০, ২৫ এবং ৩০ ইউরো। নির্ভর করে কতটুকু পথে ঘুরে দেখা যাবে, তার ওপর। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট নেওয়ার অপেক্ষা করছিলাম, সে সময়েই আমি আমার স্মৃতির পাল তুলে অতীতে ফিরে গেলাম। আশির দশকে পড়েছিলাম ‘দ্য লাস্ট ডেজ অব পম্পেই’। সেই থেকে মনের কোন ইচ্ছাটি পুষে রেখেছিলাম যে একদিন এই নগরী নিজের চোখে দেখব, এই নগরীর পথে পথে হাঁটব। টিকিট হাতে পাওয়ার পরই আমি প্রবেশ করব সেই নগরীতে, যে নগরীতে হঠাৎ করেই একদিন জীবন থেমে গিয়েছিল। আজ থেকে প্রায় ২ হাজার বছর আগে, সেদিনটি ছিল ’৭৯ সালের ২৪ অক্টোবর।

আমরা পুরো একটি দিন পম্পেইতে কাটিয়ে আবার ফিরে এলাম নেপলসে। রাতের নেপলসের আরেক রূপ। পরের দিন দুপুরে আবারও গারিবাল্ডি স্টেশন থেকে বাস নিয়ে বিমানবন্দর—অবশেষে নিজেদের ঘরে ফেরা। আবারও একদিন—ঘর ছাড়ার জন্য ঘরে ফেরা।
 
মইনুল হাসান: ফ্রান্স প্রবাসী লেখক।
ছবি: লেখক

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন