তিন শ সিঁড়ি পেরিয়ে ইতিহাসের টিলায়
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সিলেট মানেই শুধু চা-বাগান, পাহাড় আর ঝরনা নয়। এই সবুজ ভূখণ্ডের আনাচে–কানাচে ছড়িয়ে আছে ইতিহাস, লোককথা আর আধ্যাত্মিকতার নানা গল্প। তেমনই এক রহস্যময় ও ঐতিহাসিক স্থান আবঙ্গী টিলা। প্রায় ২৫৩ ফুট উঁচু এই টিলায় উঠতে পাড়ি দিতে হয় ৩০০টিরও বেশি সিঁড়ি। আর সেই সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ যেন আপনাকে নিয়ে যায় সিলেটের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের আরও কাছে।

বিজ্ঞাপন

যাত্রা শুরু ৩০০ সিঁড়ির পথে

টিলার পাদদেশে দাঁড়ালে প্রথমেই চোখে পড়ে ওপরে উঠে যাওয়া দীর্ঘ সিঁড়ির সারি। শুরুতে পথটা সহজ মনে হলেও ধাপে ধাপে ওপরে উঠতে উঠতে শরীরে টের পাওয়া যায় চড়াইয়ের পরিশ্রম।

যে পথ গেছে...
যে পথ গেছে...

তবে এই পথের সৌন্দর্যই আলাদা। একটু পরপর থেমে পেছনে তাকালেই দেখা যায় চারপাশের সবুজ প্রকৃতি। দূরের চা-বাগান, টিলার ঢাল আর সিলেটের অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য মিলিয়ে তৈরি হয় এক শান্ত পরিবেশ।
আর যত ওপরে ওঠা যায়, ততই যেন শহুরে ব্যস্ততা পেছনে পড়ে থাকে।

বিজ্ঞাপন

শাহজালালের স্মৃতিবিজড়িত টিলা

স্থানীয় লোকশ্রুতি ও প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, আবঙ্গী টিলা হজরত শাহজালাল (র.) এবং তাঁর সফরসঙ্গী আউলিয়াদের স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থান। সিলেট বিজয়ের পর আধ্যাত্মিক সাধনা, চিল্লা ও ইবাদতের জন্য এই পাহাড়ি জঙ্গল ও টিলাকে বেছে নেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয়ভাবে বিশ্বাস করা হয়।

টিলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এসব গল্পই জায়গাটিকে সাধারণ কোনো দর্শনীয় স্থান থেকে আলাদা করে দিয়েছে। এখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে ইতিহাস ও বিশ্বাসের আবহ।

দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ, চা-বাগানের সারি আর পাহাড়ি প্রকৃতি
দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ, চা-বাগানের সারি আর পাহাড়ি প্রকৃতি

হজরত সৈয়দ সিফাত আলী শাহ (র.) মাজার

টিলার ওপর রয়েছে হজরত সৈয়দ সিফাত আলী শাহ (র.)-এর মাজার। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি হজরত শাহজালাল (র.)-এর অন্যতম সফরসঙ্গী বা খাদেম ছিলেন।
তাঁর স্মৃতিকে ঘিরেই টিলা ও মাজার প্রাঙ্গণ স্থানীয় মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
মাজারে পৌঁছানোর পর দীর্ঘ সিঁড়ি পেরিয়ে আসার ক্লান্তিও যেন কিছুটা মিলিয়ে যায়। চারপাশের নীরবতা, বাতাস আর পাহাড়ের ওপর থেকে দেখা প্রকৃতি তৈরি করে এক অন্য রকম অনুভূতি।

৩৬০ আউলিয়ার গল্প

আবঙ্গী টিলাকে ঘিরে রয়েছে আরও একটি প্রচলিত জনশ্রুতি। বলা হয়, সিলেটে আসা ৩৬০ আউলিয়ার দল একসময় এই টিলার ওপর একত্র হতেন। আধ্যাত্মিক প্রচারণা ও বিভিন্ন বিষয়ে তাঁরা এখানে আলোচনা করতেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে বিশ্বাস রয়েছে।
সাফল্যের জন্য এই টিলায় দাঁড়িয়ে তাঁরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা ও কান্নাকাটি করতেন বলেও জনশ্রুতি আছে।
ইতিহাস আর লোকবিশ্বাসের এই মেলবন্ধনই আবঙ্গী টিলার আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রাকৃতিক হ্রদ
প্রাকৃতিক হ্রদ

চিল্লাখানার নীরবতা

টিলার অন্যতম আকর্ষণ ঐতিহাসিক চিল্লাখানা। আধ্যাত্মিক সাধনা ও ইবাদতের সঙ্গে যুক্ত এই স্থানটি এখনো সংরক্ষিত রয়েছে।
এখানে এসে তাই শুধু ঘুরে বেড়ানো নয়, বরং জায়গাটির ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব অনুভব করার সুযোগও তৈরি হয়।

পাহাড়ের চূড়ায় সিলেট

আবঙ্গী টিলায় ওঠার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়তো টিলার চূড়ায় পৌঁছে চারপাশের দৃশ্য দেখা।
উঁচু থেকে তাকালে চারদিকে ছড়িয়ে থাকা দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ, চা-বাগানের সারি আর পাহাড়ি প্রকৃতি চোখে পড়ে। বিশেষ করে সকালের নরম আলো কিংবা শেষ বিকেলের রোদে এই দৃশ্য আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে।
যাঁরা প্রকৃতি দেখতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য জায়গাটি হতে পারে সিলেট ভ্রমণের একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা। আর যাঁরা ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক স্থানের প্রতি আগ্রহী, তাঁদের জন্য এখানে রয়েছে আরও একটি মাত্রা।

সবুজে মোড়া প্রকৃতি
সবুজে মোড়া প্রকৃতি

ভ্রমণভ্লগে কেন রাখবেন আবঙ্গী টিলা?

সিলেটের পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে একটু অন্য রকম অভিজ্ঞতা চাইলে আবঙ্গী টিলা হতে পারে চমৎকার একটি গন্তব্য। এখানে হাঁটার অভিজ্ঞতা, পাহাড়ের চড়াই, ইতিহাসের গল্প, আধ্যাত্মিক আবহ আর সবুজ প্রকৃতি—সব একসঙ্গেই মিলবে।
তবে মাজার এলাকায় ভ্রমণের সময় অবশ্যই স্থানটির ধর্মীয় পরিবেশ ও স্থানীয় রীতিনীতির প্রতি সম্মান দেখানো উচিত। আর এই ৩০০টির বেশি সিঁড়ি ডিঙানোর প্রস্তুতির জন্য আরামদায়ক পোশাক ও জুতা পরাই ভালো।

চলেছি একেলা
চলেছি একেলা

তাই সিলেটে গেলে শুধু চা-বাগানের সবুজে হারিয়ে যাবেন না। একটি দিন সময় বের করে পাড়ি দিন ৩০০ সিঁড়ির পথ।
হয়তো টিলার চূড়ায় দাঁড়িয়ে সিলেটকে দেখবেন একেবারে অন্য এক দৃষ্টিতে।
আবঙ্গী টিলা—যেখানে পাহাড়ের চড়াই পেরিয়ে মেলে ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতার গল্প আর সিলেটের সবুজ সৌন্দর্যের এক অনন্য মেলবন্ধন।
লেখক: সাইক্লিস্ট, সিলেট
ছবি: লেখক

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৭: ০০
বিজ্ঞাপন