বই পড়তে পড়তে ডিজে মিউজিক, জাপানে নতুন ট্রেন্ড ‘বুক রেভ’
শেয়ার করুন
ফলো করুন

বই পড়ার জন্য সাধারণত আমরা খুঁজি নিরিবিলি একটা কোণ। আর ক্লাবে যাওয়ার কথা ভাবলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে উচ্চ শব্দের সংগীত, আলো আর নাচের দৃশ্য। কিন্তু এই দুই অভিজ্ঞতাকে এক করে জাপানে গড়ে উঠেছে নতুন এক পপ কালচার, ‘বুক রেভ’। রেভ পার্টী বলতে সাধারণত উচ্চ স্বরের ইলেকট্রিক ডিস্ক মিউজিক আর পার্টি বোঝায়। কিন্তু সেখান থেকে একেবারেই আলাদা এক আয়োজন ‘জুসি বুক রেভ’।

এখানে নাচের ফ্লোরে মানুষ একত্রিত হন ঠিকই, তবে হাতে থাকে বই। ডিজে আর সরাসরি সংগীত পরিবেশনের আবহে সবাই নিজের মতো করে ডুবে যান পড়ার জগতে। উদ্দেশ্য শুধু বই পড়া নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে পড়া হয়ে উঠবে আনন্দের, স্বস্তির এবং মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আরেকটি উপায়।

বিজ্ঞাপন

নাচের ফ্লোরে বইয়ের আসর

২০২৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর টোকিওর শিমোকিতাজাওয়ার সংগীত ভেন্যু স্প্রেডে অনুষ্ঠিত হয় এই আয়োজন। প্রচলিত ক্লাব সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে এখানে সংগীতকে রাখা হয়েছে বই পড়ার সঙ্গী হিসেবে। সাকু ও ওশিবা কোমিয়াকুর পরিবেশিত অ্যাম্বিয়েন্ট ইলেকট্রনিক সংগীত তৈরি করে শান্ত, নিমগ্ন এক আবহ। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ছিলেন লেখক সুচায়াচান এবং ঔপন্যাসিক ওতা স্টেফানি কান্টো।

আয়োজকেরা পাঠের জন্য বেছে নিয়েছিলেন তোশিকি ওকাদার ছোটগল্প সংকলন ‘ব্রকলি রেভল্যুশন’। তবে অংশগ্রহণকারীদের জন্য নির্দিষ্ট বই পড়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। চাইলে যে কেউ নিজের পছন্দের বই সঙ্গে নিয়ে আসতে পেরেছেন ফলে একই জায়গায় বসেও প্রত্যেকে নিজের পছন্দ, আগ্রহ ও পড়ার গতিতে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

বই পড়াকে আমরা প্রায়ই ব্যক্তিগত অভ্যাস হিসেবে দেখি। নিজের ঘরে, লাইব্রেরিতে কিংবা ক্যাফের এক কোণে বসে বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা মানেই যেন চারপাশ থেকে সাময়িক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। কিন্তু বুক রেভের ধারণা একটু আলাদা। এখানে সবাই নিজের বই নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও তাঁরা সবাই একই অভিজ্ঞতার অংশ। কারও সঙ্গে কথা বলার বাধ্যবাধকতা নেই, আবার ইচ্ছা করলে বই নিয়ে আলোচনা কিংবা নতুন পাঠকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও রয়েছে।

আয়োজনের অংশ হিসেবে ছিল বই নিয়ে আলোচনা, বই বিনিময় এবং একটি যৌথ বুকশেলফ। সেখান থেকে অংশগ্রহণকারীরা বই ধার নিতে, নিজের বই দিয়ে যেতে কিংবা পড়া শেষে বই ফিরিয়ে দিতে পারেন। বই এখানে কেবল ব্যক্তিগত সংগ্রহের বিষয় নয়, বরং মানুষের মধ্যে ভাবনা, গল্প ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যম।

শুধু বই আর সংগীত দিয়ে নয়, পুরো পরিবেশ সাজিয়েও পাঠের অভিজ্ঞতাকে আরামদায়ক করার চেষ্টা করেছেন আয়োজকেরা। ছিল মৃদু আলো, মেঝেতে আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা এবং বেছে নেওয়া পছন্দের বই। সব মিলিয়ে এমন একটি আবহ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়, যেখানে বাইরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সরে এসে বইয়ের পাতায় মন দেওয়া যায়।

এধরনের পরিবেশ অনেকের কাছে দৈনন্দিন মানসিক চাপ থেকে বিরতি নেওয়ার একটি উপায় হয়ে উঠতে পারে। পছন্দের বই পড়া মনোযোগকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ধরে রাখতে সাহায্য করে। আরামদায়ক পরিবেশ ও মৃদু সংগীতও কারও কারও কাছে স্বস্তিদায়ক হতে পারে। তবে সংগীতের উপস্থিতি সবার পড়ার মনোযোগ বাড়াবে, এমন নয়। কেউ নীরবতায় ভালো পড়তে পারেন, আবার কেউ পছন্দ করেন পেছনে হালকা সংগীতের আবহ। বুক রেভের মতো আয়োজনের বিশেষত্ব হলো, এখানে মানুষ নিজের জন্য উপযোগী পড়ার অভিজ্ঞতা খুঁজে নিতে পারেন।

দৈনন্দিন জীবনে কাজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নানা দায়িত্ব আর স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘ সময় কাটানোর ফলে নিজের পছন্দের বই নিয়ে বসার অবকাশ অনেকেরই কমে গেছে। কিন্তু বই পড়া কেবল তথ্য বা গল্প জানার মাধ্যম নয় এটি নিজের চিন্তার সঙ্গে সময় কাটানোরও একটি সুযোগ। পছন্দের বইয়ে মন দেওয়া সাময়িকভাবে দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে মন সরিয়ে রাখতে পারে, নতুন ভাবনার সঙ্গে পরিচয় করাতে পারে এবং অবসরের সময়কে অর্থবহ করে তুলতে পারে।

তবে পড়ার জন্য সব সময় বিশেষ আয়োজনের প্রয়োজন নেই। দিনের ব্যস্ততার মধ্যে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় বের করে বই পড়া, ঘুমানোর আগে ফোনের বদলে বই হাতে নেওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ছোট্ট পাঠচক্র গড়ে তোলাও হতে পারে শুরু। আর যারা একা পড়তে বসে নিয়মিত মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না, তাঁদের জন্য বই নিয়ে সামাজিক আয়োজন নতুন অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে।

বই পড়া মানেই নিঃসঙ্গতার মধ্যে ডুবে থাকা নয়। বরং নিজের পছন্দের বই হাতে, চারপাশে সমমনা মানুষের উপস্থিতি আর মৃদু সংগীতের আবহে তৈরি হতে পারে এক অন্যরকম সামাজিক অভিজ্ঞতা। এখানে কারও সঙ্গে কথা বলতেই হবে এমন নয়, আবার নির্দিষ্ট বই পড়ারও প্রয়োজন নেই। প্রত্যেকে নিজের মতো করে সময় কাটিয়েও অনুভব করতে পারেন একসঙ্গে থাকার আনন্দ। ব্যক্তিগত পরিসর আর সামাজিক সংযোগের এই মেলবন্ধনই বই পড়াকে নিয়ে যায় নতুন এক অভিজ্ঞতার দিকে।

বাংলাদেশেও একদিন এমন পাঠসংস্কৃতি গড়ে উঠুক, যেখানে লাইব্রেরির নীরব পরিবেশের পাশাপাশি ক্যাফে কিংবা সংগীতের ছন্দময় আবহেও বই পড়ার চর্চা ছড়িয়ে পড়বে। স্থান বা পরিবেশ যা-ই হোক, বইয়ের প্রতি ভালোবাসা, জ্ঞানচর্চা এবং মেধা ও মননের বিকাশ যেন থাকে সবার আগ্রহের কেন্দ্রে। কারণ, বই পড়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো পরিবেশের চেয়ে বেশি জরুরি পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা। আর সেই আগ্রহকে ঘিরে মানুষ যখন একত্রিত হন, তখন বই হয়ে উঠতে পারে নতুন সংযোগ, ভাবনার আদান-প্রদান এবং একটি প্রাণবন্ত সংস্কৃতি গড়ে ওঠার মাধ্যম।


তথ্য: ইন্ডিয়া টুডে

ছবি: এআই ও পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৪: ০৫
বিজ্ঞাপন