প্রতিমাশিল্পী হরিপদ পালের আজীবন সম্মাননা: এক আবেগঘন অপরাহ্ন
শেয়ার করুন
ফলো করুন

নান্দনিকতার আহ্বানে ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে সংগ্রাম আর স্বীকৃতির এক আবেগঘন আয়োজন। বেঙ্গল শিল্পালয় মিলনায়তনে শনিবার দুপুরে শুধু কোন সম্মাননা অনুষ্ঠান হচ্ছিল না; সেখানে যেন একসঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছিল বাংলাদেশের হাজার বছরের কারুশিল্প ঐতিহ্যের ইতিহাস, সংগ্রাম এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের আয়োজনে এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হলো ‘ক্রাফটস ভিলেজেস আজীবন সম্মাননা ২০২৬’। এবারের সম্মাননার শিল্পমাধ্যম ছিল প্রতিমাশিল্প। আর এই সম্মাননায় ভূষিত হলেন বাংলাদেশের কিংবদন্তিতুল্য প্রতিমাশিল্পী হরিপদ পাল। তাঁকে সম্মননাস্মারক, ফুলের তোড়া ও এক লাখ টাকা প্রদান করা হয়।

প্রতিমাশিল্প হরিপদ পালের (মাঝে) হাতে সম্মননা স্মারক তুলে দিচ্ছেন অতিথিরা
প্রতিমাশিল্প হরিপদ পালের (মাঝে) হাতে সম্মননা স্মারক তুলে দিচ্ছেন অতিথিরা

অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নীরবতার মধ্যে হারিয়ে যেতে বসা কারুশিল্পীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রয়াস।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ফারহানা শারমিন সূচি তাঁর স্বাগত বক্তব্যে বলেন, নানা আর্থিক, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতার কারণে পরিষদের কার্যক্রম দীর্ঘদিন কিছুটা থমকে ছিল। তবে নতুন উদ্যমে আবারও শুরু হয়েছে পথচলা। এই আজীবন সম্মাননা সেই পুনর্জাগরণেরই প্রতীক।

কারুশিল্প পরিষদের সহ-সভাপতি শাহীন হোসেন শামীম ফিরে যান ইতিহাসে
কারুশিল্প পরিষদের সহ-সভাপতি শাহীন হোসেন শামীম ফিরে যান ইতিহাসে

কারুশিল্প পরিষদের সহ-সভাপতি শাহীন হোসেন শামীম ফিরে যান ইতিহাসে। ১৯৮৫ সালে পরিষদের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কর্মরত কারুশিল্পীদের স্বীকৃতি দিতে পুরস্কার প্রবর্তনের কথা স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, একসময় নিয়মিতভাবে শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী পুরস্কার দেওয়া হলেও নানা কারণে সেই ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। তবু কারুশিল্পীদের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়াস কখনও পুরোপুরি থেমে যায়নি।

বিজ্ঞাপন

এই আয়োজনের পৃষ্ঠপোষক ক্রাফটস ভিলেজেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরুণ কুমার পাল বলেন, বাংলাদেশের কারুশিল্প কেবল একটি পেশা নয়, এটি জাতির পরিচয়ের অংশ। মাটি, বাঁশ, বেত, কাঠ, তাঁত, নকশিকাঁথা—প্রতিটি মাধ্যমে লুকিয়ে আছে মানুষের জীবন, ইতিহাস ও গল্প। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত তাঁদের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কারুশিল্পী, নারী উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক সৃজনশীল মানুষদের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছে।

বক্তব্য রাখছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসউদ ইমরান মান্নু
বক্তব্য রাখছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসউদ ইমরান মান্নু

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনাগুলোর একটি ছিল কারুশিল্পের অধিকার সুরক্ষা নিয়ে। ঐতিহ্য কূটনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসউদ ইমরান মান্নু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন— শুধু ঐতিহ্য ঘোষণা করলেই কি কারুশিল্প রক্ষা পায়?

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অসংখ্য কারুশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনাময় হলেও যথাযথ ভৌগোলিক নির্দেশক সনদ, নকশা সুরক্ষা এবং মেধাস্বত্ব অধিকার না থাকায় শিল্পীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা নকশা, গঠন ও শৈলী সহজেই অন্যের নামে চলে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করেন, এখনই সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কারুশিল্প বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
এই বক্তব্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার মনে নতুন করে প্রশ্ন জাগায়—আমরা কি সত্যিই আমাদের শিল্পীদের প্রাপ্য সম্মান ও সুরক্ষা দিতে পেরেছি?

প্রতিমাশিল্পীদের জীবনসংগ্রামের কথা শুনিয়েছেন সাংবাদিক সুশান্ত ঘোষ
প্রতিমাশিল্পীদের জীবনসংগ্রামের কথা শুনিয়েছেন সাংবাদিক সুশান্ত ঘোষ

এই প্রশ্নের বাস্তব উত্তর পাওয়া যায় প্রতিমাশিল্পীদের জীবনসংগ্রামের বর্ণনায়। সাংবাদিক সুশান্ত ঘোষ, যিনি দক্ষিণবঙ্গের মৃৎশিল্পীদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন এবং গত এক দশকে দুই শতাধিক শিল্পীকে সম্মানিত করেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয় মৃতশিল্পীদের দৈন্য। তাদের শিল্পচর্চার এবং ক্ষুন্নিবৃত্তির মূল উপকরণ মাটি। অথচ সেটা পাওয়াই দুষ্কর হয়ে ওঠে এই মাটির দেশে। এই মাটি আনতে দিতে হয় চাঁদা। পড়তে হয় সরকারের বিভিন্ন সংস্থার রোষানলে। অথচ সেটা তোন হওয়ার কথা ছিল না। তাঁর তো এই মাটি দিয়ে ইটভাটায় ইট তৈরি করে না। অথচ যারা সেটা করে তারা থেকে যায় আইনের উর্ধে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিমাশিল্প ও শিল্পী সমাজ শীর্ষক বক্তব্য উপস্থাপন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক উদয় শংকর বিশ্বাস। তিনি বলেন, প্রতিমাশিল্পীরা ব শিল্পীসমাজের সবচেয়ে নীর একটি অংশ। পূজার বিশাল আয়োজন তাদের শ্রম ছাড়া অসম্ভব, অথচ উৎসবের আনন্দে তাদের অংশগ্রহণ প্রায় থাকে না। প্রতিমা তৈরির জন্য মাটি, বাঁশ, রং, কাঠামো— সবকিছুর খরচ আগে বহন করতে হয় শিল্পীকেই। অধিকাংশ কমিটি অগ্রিম অর্থ দেয় না। ফলে শিল্পীরা ঋণ করে কাজ শুরু করেন, আর কাজ শেষ হতে হতে ঋণের বোঝা আরও বাড়ে। শুধু তাই নয়, মাটি সংগ্রহের সময়ও নানা বাধা পেরোতে হয় তাঁদের। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা প্রতিমাশিল্পকে আজও অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছে। তবু সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে শিল্পীরা সৃষ্টি করে যান।

বাংলাদেশের প্রতিমাশিল্প ও শিল্পীসমাজ– এ বিষয়ে কথা বলছেন উদয় শংকর বিশ্বাস
বাংলাদেশের প্রতিমাশিল্প ও শিল্পীসমাজ– এ বিষয়ে কথা বলছেন উদয় শংকর বিশ্বাস

সেই শিল্পীদেরই একজন হরিপদ পাল।

ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার কুড়লিয়া গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী শিল্পী পরিবারে জন্ম তাঁর। দাদু ও বাবার হাত ধরে শৈশবে শুরু শিল্পচর্চা। পরে শিল্পের গভীরতা অন্বেষণে যান কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কুমারটুলিতে। সেখানে প্রতিমা নির্মাণের সূক্ষ্মতা রপ্ত করে স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশে ফিরে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে গড়ে তোলেন নিজের কর্মশালা। দীর্ঘ ছয় দশকে তাঁর হাতে নির্মিত অসংখ্য প্রতিমা, ভাস্কর্য ও শিল্পকর্ম দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে।

হরিপদ পালের সৃজনকর্ম
হরিপদ পালের সৃজনকর্ম

কিন্তু একজন শিল্পীর জীবন কেবল সৃষ্টির নয়, সহ্যেরও।
হরিপদ পালের ব্যক্তিজীবন বেদনাময়। নিউমোনিয়ায় হারিয়েছেন বড় মেয়েকে। করোনাকালে হারিয়েছেন একমাত্র পুত্রকে। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ স্ত্রীকে নিজ হাতে সেবা করছেন। এত শোকও তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে থামাতে পারেনি।

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে যখন সম্মাননা গ্রহণের পর তিনি কথা বলতে দাঁড়ান। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি শুধু চাই, যতদিন হাত চলে, ততদিন যেন মাটির মাধ্যমে ঈশ্বরের অনুভূতি মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে পারি। যতক্ষণ বানাতে পারি ততক্ষণ আমাকে রাখো, আর বানাতে না পারলে নিয়ে যেয়ো।”

হরিপদ পালের আবেগ ছুঁয়ে যায় সবাইকে
হরিপদ পালের আবেগ ছুঁয়ে যায় সবাইকে

হলঘরে নেমে আসে এক নিস্তব্ধতা। তাঁর কথার গভীর আবেগ ছুঁয়ে যায় উপস্থিত সবাইকে। অনেকের চোখেই জমে ওঠে জল। সেই মুহূর্তে হরিপদ পাল আর শুধু একজন প্রতিমাশিল্পী নন—তিনি হয়ে ওঠেন শিল্পসাধনার প্রতীক। এমন এক মানুষ, যিনি শিল্পকে জীবিকা নয়, প্রার্থনা হিসেবে দেখেন।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, “কোনো পুরস্কার দিয়ে আসলে কাউকে সম্মানিত করা যায় না। আমরা এই সম্মাননার মাধ্যমে নিজেদেরই সম্মানিত করি।”

কথা বলছেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী
কথা বলছেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী

এই কথাতেই যেন পুরো আয়োজনের সারমর্ম লুকিয়ে আছে। শিল্পীকে সম্মান মানে শুধু একজন মানুষকে সম্মান জানানো নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস, সংস্কৃতি, সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎকে সম্মান জানানো।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ডিন অধ্যাপক বজরুল রশিদ খান ও ২০১৬ সালে আজীবন সম্মননাপ্রাপ্ত মৃৎশিল্পী বিশ্বেশ্বর পাল ।

সমাপনী বক্তব্য দিচ্ছেন বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি চন্দ্রশেখর সাহা
সমাপনী বক্তব্য দিচ্ছেন বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি চন্দ্রশেখর সাহা

সমাপনী বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি চন্দ্রশেখর সাহা আমন্ত্রিত অতিথি, কারুশিল্পী এবং সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কারুশিল্প অধিকারকর্মী ও হাল ফ্যাশনের কনসারট্যান্ট শেখ সাইফুর রহমান।

আজ যখন দ্রুত পরিবর্তিত পৃথিবীতে যন্ত্র ও বাজারের চাপে লোকঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে, তখন এমন আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— কারুশিল্প কেবল স্মৃতিচারণ নয়; এটি জীবন্ত ঐতিহ্য। মাটি, কাঠ, সুতা, রং— এসবের শরীরে আমাদের ইতিহাস লেখা আছে। হরিপদ পালের মতো শিল্পীরা সেই ইতিহাসের নীরব রক্ষক।

মৃৎশিল্পীদের তাঁদের হাতের স্পর্শে মাটি প্রাণ পায়
মৃৎশিল্পীদের তাঁদের হাতের স্পর্শে মাটি প্রাণ পায়

তাঁদের হাতের স্পর্শে মাটি প্রাণ পায়। তাঁদের সৃষ্টিতে মানুষ নিজের শেকড় খুঁজে পায়। আর তাঁদের জীবন আমাদের শেখায়— শিল্প শেষ পর্যন্ত মানুষের আত্মারই ভাষা। এই সম্মাননা তাই কেবল একটি পুরস্কার নয়। এটি এক প্রতিশ্রুতি— বাংলাদেশের কারুশিল্প, কারুশিল্পী এবং ঐতিহ্যকে আমরা ভুলব না।

ছবি: কামরুল মিথুন ও নাদিয়া ইসলাম

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ১৬: ৩৩
বিজ্ঞাপন