
গাজার দুই কিশোরী বোন ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনঃব্যবহারযোগ্য ইট তৈরি করে পরিবেশবিষয়ক পুরস্কার জিতেছে। তাদের বয়ানে, তারা ধ্বংসকে মানুষের কাজে লাগে এমন কিছুতে বদলে দিতে চেয়েছিল। তাদের এমন সরল আইডিয়া আর অদম্য জীবনীশক্তির গল্প এখন আপ্লুত করছে সবাইকে।
ফারাহ ও তালা মুসা নামের এই দুই বোনের বাড়ি বোমায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। পরিবারসহ বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে তারা। বর্তমানে একটি তাঁবুতে বসবাস করছে এই ফুলের মতো দুই কিশোরী। আর এর মাঝেই যুদ্ধ-বর্জ্য দিয়ে পরিবাশবান্ধব ইট বানিয়ে তারা তরুণদের জন্য আয়োজিত আর্থ প্রাইজ-এর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের বিজয়ী হয়েছে।
১৭ বছর বয়সী তালা বিবিসিকে বলে,“আমাদের পুরো শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার পর, চারপাশের সবকিছু দিয়েই আমরা কোনো না কোনো সমাধানের কথা ভাবতে বাধ্য হয়েছি।”
ছোটবোন, ১৫ বছর বয়সী ফারাহ বলেন, তারা পুরস্কারের ১২,৫০০ ডলার দিয়ে অন্যদেরকেও এই ইট বানানো শেখাতে চায়, যাতে মানুষ শুধু বাইরের সাহায্যের অপেক্ষা না করে নিজেরাই পুনর্গঠনের কাজে অংশ নিতে পারে।
জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার প্রায় ১৯ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ, বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে।
২০২৫ সালের শুরুতে গাজায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হয়। রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে লাখ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ।

ফারাহ ও তালা তাদের বাড়ি ধ্বংস হওয়ার পর তাঁবুর কাছে থেকে ধ্বংসস্তুপের বর্জ্য সংগ্রহ করে এই ইট তৈরির কাজ শুরু করে।
ধ্বংসস্তূপ গুঁড়ো করে, ছেঁকে এবং মাটি, ছাই ও কাঁচের গুঁড়ার মতো উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে তারা ব্লক তৈরি করে। খারাপ আবহাওয়ায় প্রতিবেশীর তাঁবু আটকে রাখতে সাহায্য করে তারা ইটগুলোর পরীক্ষা চালায়।
কম খরচে তৈরি ও হালকা ওজনের এই ইট মূলত ফুটপাত, পার্টিশন দেয়াল ও বাগানের কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
দুই বোন জানায়, চারপাশের ধ্বংসযজ্ঞই তাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে।
তালা বলেন, “আমাদের তাঁবুর জানালার বাইরের দৃশ্যই ছিল সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। আমরা ধ্বংসস্তূপকে শুধু ক্ষতি আর ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে না দেখে, নেতিবাচক কিছু থেকে ইতিবাচক কিছু তৈরি করার চেষ্টা করেছি।”

তার ভাষায়, “এটাকে শেষ হিসেবে না দেখে আমরা নতুন কিছুর শুরু হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছি।”
তারা পুরস্কারের অর্থ দিয়ে প্রায় ১০০ তরুণকে প্রশিক্ষণ দিতে চায়।
‘আর্থ প্রাইজ’ পরিবেশগত সমস্যার সমাধানের জন্য দেওয়া হয়। এর আগে ইউরোপ ও আফ্রিকা অঞ্চলের বিজয়ীদেরও ঘোষণা করা হয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের এক ১৮ বছর বয়সী তরুণ নিরাপদে নষ্ট হয়ে যায় এমন জৈব-বিয়োজ্য প্লাস্টিক তৈরি করে পুরস্কার পেয়েছে। আর কেনিয়ার দুই ১৭ বছর বয়সী কিশোর কম খরচের এমন একটি যানবাহনের এক্সহস্ট সিস্টেম তৈরি করেছে, যা প্রাকৃতিক উপাদানের ফিল্টার ব্যবহার করে দূষণ কমায়।
এখনও চারটি অঞ্চলের বিজয়ী ঘোষণা বাকি রয়েছে। পরে জনভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয়ী নির্ধারণ করা হবে।
২০২৩ সালের অক্টোবরের হামাসের হামলায় প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।

এরপর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ৭২ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও ৮৫৬ জন নিহত হয়েছে। এর মাঝে সে দেশের এই দুই কিশোরীর এমন অনুপ্রেরণামূলক কার্যক্রম ফিলিস্তিনের মানুষের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছে। আর তার সঙ্গে বাড়তি পাওনা হিসেবে যোগ হয়েছে এই আর্থ প্রাইজ।
সূত্র: বিবিসি
ছবি: ইন্সটাগ্রাম