
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর উদ্ধারকর্মীদের এমন সব এলাকায় যেতে হচ্ছে, যেখানে সড়ক নিশ্চিহ্ন, সেতু ভেসে গেছে, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পুরো জনপদ। এই কঠিন সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের জীবন বাঁচানো অনেক নেপথ্য নায়কও কাজ করছেন। এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মাঝে ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযানে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ক্যাপ্টেন প্রিয়া অধিকারী আলাদা করে নজর কাড়ছেন অন্য কারণে। দুর্যোগের ভয়াবহতার মধ্যেও তিনি বারবার উড়ে যাচ্ছেন দুর্গম এলাকায়।

নেপালের প্রথম নারী হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন প্রিয়া অধিকারী মাত্র ছয় দিনে প্রায় ১০০টি উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে তাঁকে যেতে হয়েছে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের অত্যন্ত দুর্গম কিছু এলাকায়।
রাসুয়া জেলার তিমুরে বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর পুরো জনপদ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ের অস্থিতিশীল ঢাল, ভূমিধস, ধ্বংসস্তূপ ও অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে স্থলপথে সেখানে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তখন হেলিকপ্টারই হয়ে ওঠে মানুষের কাছে পৌঁছানোর প্রধান ভরসা।

প্রিয়ার কাছে এমন পরিস্থিতিতে উড়ে যাওয়া নতুন নয়। নেপালের বিমান চলাচলের সবচেয়ে কঠিন ক্ষেত্রগুলোর সঙ্গেই গড়ে উঠেছে তাঁর ক্যারিয়ার—উচ্চতাবিশিষ্ট এলাকায় উড্ডয়ন এবং হিমালয়ে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান।
ঘটনাচক্রেই বদলে গেল জীবনের পথ
ককপিটে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেকটা ঘটনাচক্রে। তখন পরিবেশবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করছিলেন অধিকারী। পাশাপাশি একটি অভ্যন্তরীণ বিমান সংস্থায় কেবিন ক্রু হিসেবে কাজ করতেন। একদিন বন্ধুরা তাঁকে নিয়মিত একটি ফ্লাইটে হেলিকপ্টার ক্রু হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা বলেন। দিনটি ছিল শীতের এক সকাল। জীবনের গতিপথ যে বদলে যেতে চলেছে, তা তখনো জানতেন না অধিকারী। তিনি উঠে বসলেন হেলিকপ্টারে।

হেলিকপ্টারটি মাটি ছেড়ে আকাশে উঠল। সঙ্গে যেন ডানা মেলল তাঁর স্বপ্নও। বাবা-মায়ের সমর্থন নিয়ে প্রায় ১১ বছর আগে উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ নিতে ফিলিপাইনে যান অধিকারী। প্রশিক্ষণ শেষে নেপালে ফিরে বিমান চলাচলকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। ২০১৭ সালে পূর্ণকালীন হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি।
সহজ ছিল না পথ
নেপালে হেলিকপ্টার চালানো এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। দেশটির দুর্গম ও বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতির কারণে সেই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। পাইলটদের সরু পাহাড়ি উপত্যকা, দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়া এবং সীমিত অবতরণস্থলের সঙ্গে প্রতিনিয়ত মানিয়ে নিতে হয়। অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে চাপ আরও বেশি। কারণ, সেখানে শুধু নিরাপদে উড়ে যাওয়াই লক্ষ্য নয়; এমন মানুষের কাছে পৌঁছাতে হয়, যাঁদের জীবন বাঁচানো নির্ভর করতে পারে প্রতিটি মিনিটের ওপর। এই ঝুঁকি খুব কাছ থেকে দেখেছেন প্রিয়া। বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর কয়েকজন সহকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। তারপরও থামেননি তিনি। বছরের পর বছর হিমালয়ে আহত পর্বতারোহীদের উদ্ধারে অংশ নিয়েছেন প্রিয়া। মাউন্ট এভারেস্টের আশপাশেও পরিচালনা করেছেন উদ্ধার অভিযান।

কিছু অভিযানে তাঁকে প্রায় ৬ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় উড়তে হয়েছে। এত উঁচুতে হেলিকপ্টার পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর উদ্ধার অভিযানেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তবে এবারের বন্যা ছিল ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ। সরু উপত্যকায় একসঙ্গে ২০ হেলিকপ্টার ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতার কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বিভিন্ন এলাকায় একই সময়ে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হচ্ছিল। একপর্যায়ে সরু পাহাড়ি উপত্যকাগুলোর মধ্যে একই সময়ে প্রায় ২০টি হেলিকপ্টার কাজ করছিল বলে জানা যায়। অধিকারীর অভিযান শুধু জীবিতদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এমন এলাকাতে যেতে হয়েছে তাঁকে, যেখানে মানুষ মারা গেছে এবং সড়কপথে আর পৌঁছানো সম্ভব নয়। সেখান থেকে মরদেহও উদ্ধার করতে হয়েছে।
ককপিটে নারী-পুরুষের পার্থক্য নেই
উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের নিয়ন্ত্রণে একজন নারীকে দেখে যাত্রীদের মধ্যে এখনো মুগ্ধতা, বিস্ময় কিংবা কিছুটা দ্বিধা দেখা যায়। কিন্তু ককপিটে পাহাড় নারী ও পুরুষ পাইলটের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। হেলিকপ্টার উড়াতে হয়। আবহাওয়া বুঝতে হয়। অবতরণের জায়গা ঠিক করতে হয়। আর নিতে হয় সঠিক সিদ্ধান্ত। এমন এক পেশায় প্রিয়া অধিকারীর ক্যারিয়ার গড়ে উঠেছে, যে পেশাকে এখনো মূলত পুরুষদের পেশা হিসেবেই দেখা হয়।

নেপালের প্রথম নারী হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন হওয়া তাই তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধেও এক নীরব চ্যালেঞ্জ। মহামারিতে থেমেছিল উড়ান কোভিড-১৯ মহামারির সময় সাময়িকভাবে থেমে গিয়েছিল তাঁর উড়োজাহাজ চালানোর ক্যারিয়ার। তবে সেই সময়টাকে অন্যভাবে মনে করেন প্রিয়া অধিকারী। মহামারির কারণে তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। ফ্লাইট আবার চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজে ফিরেছেন তিনিও। আজ নেপাল যখন আরেকটি ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি, অধিকারী আবারও আকাশে। ধ্বংসস্তূপ, ভূমিধস আর প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্য দিয়েই ছুটে চলেছে তাঁর হেলিকপ্টার—মানুষের কাছে পৌঁছানোর আশায়।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
ছবি: ইন্সটাগ্রাম