
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্য ও ডিটক্স নিয়ে নানা ধরনের ট্রেন্ডের দেখা মেলে। এরই মধ্যে আলোচনায় এসেছে কফি এনিমা। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা, শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়া, লিভার পরিষ্কার রাখা কিংবা ওজন কমানোর মতো নানা দাবি করা হয় এই পদ্ধতি নিয়ে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কফি এনিমা মোটেও নিরীহ কোনো ঘরোয়া স্বাস্থ্যচর্চা নয়। বরং এর কথিত উপকারের পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, অথচ ভুলভাবে বা বারবার ব্যবহার করলে তৈরি হতে পারে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি।

কফি এনিমা কী?
এনিমা হলো এমন একটি পদ্ধতি, যাতে মলত্যাগে সহায়তা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত প্রয়োজনে মলদ্বার দিয়ে তরল প্রবেশ করানো হয়। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে এনিমা ব্যবহার করা হয়। তবে কফি এনিমায় ওই তরলের বদলে ব্যবহার করা হয় তৈরি করা কফি।
চিকিৎসাগত প্রয়োজনে ব্যবহৃত মানসম্মত এনিমা আর ঘরে বসে কফি দিয়ে ডিটক্স করার চেষ্টা এক বিষয় নয়। গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টদের মতে, কফি এনিমার মাধ্যমে শরীর পরিষ্কার করা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো কিংবা শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেওয়ার দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ডিটক্স শব্দটি এত আকর্ষণীয় কেন?
বাইরের খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার, দূষণ, কম ঘুম ও মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে অনেকেরই মনে হয়, শরীরকে মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। আর সেখানেই আকর্ষণ তৈরি করে ডিটক্স শব্দটি।
তবে সুস্থ শরীরে বর্জ্য ও বিপাকজাত পদার্থ প্রক্রিয়াজাত করে বের করে দেওয়ার নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে। এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে লিভার, কিডনি, ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্র। তাই শরীর থেকে বিষ বের করার জন্য কফি এনিমা করার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

শরীর সুস্থ রাখতে সব সময় কোনো নাটকীয় ক্লিনজ প্রয়োজন হয় না। পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম ও আঁশযুক্ত খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুমই বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্ত্রে হতে পারে প্রদাহ
কফি এনিমার সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে অন্যতম হলো অন্ত্রে প্রদাহ। ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি সিস্টেমেটিক রিভিউতে স্ব-প্রয়োগ করা কফি এনিমা–সম্পর্কিত প্রকাশিত কেস রিপোর্ট পর্যালোচনা করেন গবেষকেরা। এতে অন্ত্রের প্রদাহসহ একাধিক ক্ষতিকর ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। কফি এনিমার কার্যকারিতার পক্ষে কোনো গবেষণাও তারা পাননি। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় স্ব-প্রয়োগের সুপারিশও করা হয়নি। অন্য একটি কেস রিপোর্টে কফি এনিমার পর একজন সুস্থ ব্যক্তির প্রোক্টোকোলাইটিস অর্থাৎ মলদ্বার ও কোলনের প্রদাহ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ব্যক্তির তলপেটে ব্যথা, রক্তপাত ও বারবার মলত্যাগের তীব্র অনুভূতির মতো উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। অর্থাৎ পেট পরিষ্কার বা দ্রুত ওজন কমানোর আশায় নেওয়া একটি পদ্ধতি উল্টো অন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।

সংক্রমণের ঝুঁকিও রয়েছে
ঘরে বসে এনিমা তৈরি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বা তরল জীবাণুমুক্ত না হলে শরীরে জীবাণু প্রবেশের ঝুঁকি থাকে। এনিমা ব্যবহারের সাধারণ ঝুঁকির মধ্যেও সংক্রমণ রয়েছে। কফি এনিমা নিয়ে প্রকাশিত চিকিৎসাবিষয়ক প্রতিবেদনে গুরুতর সংক্রমণ এমনকি সেপসিসের ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে। সেপসিস হলো সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া, যা বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতাকে বিপন্ন করতে পারে। তাই কোনো কিছু প্রাকৃতিক বা ঘরোয়া হলেই সেটি নিরাপদ—এমন ধারণা ঠিক নয়।
নষ্ট হতে পারে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য
সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো ইলেকট্রোলাইট হৃদ্স্পন্দন, স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বারবার এনিমা ব্যবহার করলে শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, কফি এনিমার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনাও চিকিৎসাবিষয়ক সাহিত্যে প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ময়নাতদন্তে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ধরনের ঘটনা বিরল হলেও ঝুঁকিকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে হৃদ্রোগ, কিডনি বা লিভারের সমস্যা রয়েছে কিংবা শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন শারীরিক অবস্থায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
বারবার এনিমা করলে কোষ্ঠকাঠিন্যও বাড়তে পারে
কোষ্ঠকাঠিন্যের দ্রুত সমাধান হিসেবে কেউ কেউ এনিমার ওপর নির্ভর করতে পারেন। এতে সাময়িকভাবে মলত্যাগ হলেও বারবার এনিমা ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে ভালো সমাধান নয়। অতিরিক্ত এনিমা ব্যবহারে কোলনের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাও তৈরি হতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বারবার ঘরোয়া উপায়ে সমস্যা সামলাতে গিয়ে কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রকৃত কারণ অজানাই থেকে যেতে পারে। দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্যের পেছনে খাদ্যাভ্যাস, ওষুধ, হরমোনজনিত সমস্যা কিংবা অন্য কোনো শারীরিক কারণ থাকতে পারে। কফি এনিমা এসব কারণ খুঁজে বের করে না।

কফি এনিমার উপকারিতা নিয়ে গবেষণা কী বলে?
শরীর পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে শক্তি বাড়ানো, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা উন্নত করা, কফি এনিমা নিয়ে দাবির শেষ নেই। কোথাও কোথাও আবার গুরুতর রোগের বিকল্প চিকিৎসা হিসেবেও এটি প্রচার করা হয়েছে।

কিন্তু ২০২০ সালের ওই সিস্টেমেটিক রিভিউতে কফি এনিমার কার্যকারিতা প্রমাণ করে এমন কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি। বিপরীতে পর্যালোচনা করা কেস রিপোর্টগুলোতে বিভিন্ন ক্ষতিকর ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষকদের সিদ্ধান্ত ছিল, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় কফি এনিমাকে স্ব-যত্নের পদ্ধতি হিসেবে সুপারিশ করা যায় না। এখানেই স্বাস্থ্যবিষয়ক ভাইরাল ট্রেন্ডের বড় একটি শিক্ষা রয়েছে; কোনো কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হলেই সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ বা কার্যকর হয়ে যায় না।
কোষ্ঠকাঠিন্য হলে কী করবেন?
কোষ্ঠকাঠিন্য হলেই যে এনিমা করতে হবে, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা উপকারী হতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান, খাবারে আঁশের পরিমাণ বাড়ানো, নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং মলত্যাগের স্বাভাবিক তাগিদ দীর্ঘ সময় চেপে না রাখা সহায়ক হতে পারে।
তবে দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটে তীব্র ব্যথা, পায়খানার সঙ্গে রক্তপাত, অকারণে ওজন কমে যাওয়া কিংবা হঠাৎ মলত্যাগের অভ্যাসে বড় পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ সব সমস্যার সমাধান ডিটক্স নয়।

কফি কারও সকালের প্রিয় অভ্যাস হতে পারে। এক কাপ গরম কফির ঘ্রাণ মন ভালো করে দিতে পারে, ক্লান্ত বিকেলে এনে দিতে পারে সতেজতা। কিন্তু পরিচিত কোনো খাবার বা পানীয়কে শরীরের অন্য পথে ব্যবহার করলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না। কফি এনিমার ক্ষেত্রেও কথাটি মনে রাখা জরুরি।
সূত্র: হেলথলাইন, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ, গুড আর এক্স
ছবি: ইন্সটাগ্রাম