স্প্রিন্ট নাকি দীর্ঘক্ষণ ব্যায়াম? হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য কোনটি বেশি কার্যকর
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এই প্রশ্নে নতুন কিছু তথ্য সামনে এনেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েক মিনিটের অত্যন্ত তীব্র ব্যায়াম শরীরে দ্রুত ও উল্লেখযোগ্য কিছু আণবিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। বিশেষ করে শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়া ও হৃদ্স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সংকেতে এর প্রভাব দেখা গেছে।

তবে এর অর্থ এমন নয় যে, কয়েক মিনিটের স্প্রিন্ট করলেই দীর্ঘদিনের ব্যায়ামের প্রয়োজন শেষ। গবেষণাটি মূলত ব্যায়ামের পর শরীরের ভেতরে কী ধরনের তাৎক্ষণিক পরিবর্তন ঘটে, সেটিই দেখেছে। দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস বা স্থূলতার ঝুঁকি কতটা কমে, তা জানতে আরও বড় ও দীর্ঘ সময়ের গবেষণা প্রয়োজন।

ব্যায়াম করলে শরীরের ভেতরে কী ঘটে?

আমরা সাধারণত ব্যায়ামের উপকার বলতে পেশি শক্ত হওয়া বা ক্যালরি খরচ হওয়াকে বুঝি। কিন্তু শরীরচর্চার প্রভাব এর চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। ব্যায়ামের সময় পেশি, যকৃত, রক্তনালি ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে দ্রুত সংকেত আদান-প্রদান শুরু হয়। পেশি সক্রিয় হলে বিভিন্ন প্রোটিন ও বিপাকীয় উপাদান রক্তে পরিবর্তিত হয়। এগুলো শরীরকে শক্তির প্রয়োজন, জ্বালানি ব্যবহারের ধরন এবং ব্যায়ামের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংকেত দেয়।

এই পুরো ব্যবস্থার সঙ্গে হৃদ্যন্ত্র ও বিপাকের স্বাস্থ্যও জড়িত। তাই এটিকে বলা হয় কার্ডিওমেটাবলিক স্বাস্থ্য। নতুন গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু ব্যায়াম করলেই হবে না ব্যায়ামের তীব্রতাও শরীরের এই ভেতরের যোগাযোগকে প্রভাবিত করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

স্প্রিন্টে কী দেখা গেল?

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে কল রিপোর্ট মেডিসিন সাময়িকীতে। গবেষকেরা তরুণ ও সুস্থ পুরুষদের নিয়ে স্প্রিন্ট ইন্টারভ্যাল ব্যায়াম এবং মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তুলনা করেছেন।

স্প্রিন্টের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীরা স্বল্প সময়ের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করেন। গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, তীব্র ব্যায়ামের পর রক্তে বিপুল সংখ্যক বিপাকীয় উপাদানের পরিবর্তন ঘটে। একই সঙ্গে পেশি, চর্বি ও অন্যান্য টিস্যুর মধ্যে যোগাযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু প্রোটিনের মাত্রাতেও পরিবর্তন দেখা যায়।

গবেষণায় ব্যায়ামের পর ২০৩টি বিপাকীয় উপাদানে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন দেখা যায়। মাঝারি তীব্রতার ব্যায়ামেও পরিবর্তন হয়েছে, তবে তার ধরন ও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনের মাত্রা ছিল ভিন্ন। গবেষকদের মতে, এসব ফলাফল দেখায় যে ব্যায়ামের তীব্রতা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে দীর্ঘ দূরত্বের যোগাযোগকে প্রভাবিত করতে পারে।

তাহলে কি দীর্ঘক্ষণ ব্যায়াম আর দরকার নেই?

একেবারেই নয়। এই গবেষণার ফলকে ‘কম সময় ব্যায়াম করলেই সব কাজ শেষ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষণাটি মূলত ব্যায়ামের পর শরীরের ভেতরের প্রোটিন ও বিপাকীয় পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেছে। এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে হৃদ্রোগ বা টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, সেটি বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।

অন্যদিকে নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তার উপকারিতা নিয়ে আগের গবেষণাগুলোতেও যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এমনকি অল্প সময়ের দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তাও নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনের তুলনায় উপকারী হতে পারে। তাই মূল বিষয় হলো, স্প্রিন্ট বা দ্রুতগতির ব্যায়ামকে নিয়মিত শরীরচর্চার একটি অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে, পুরো ব্যায়াম রুটিনের বিকল্প হিসেবে নয়।

বিজ্ঞাপন

সময় কম? ব্যায়ামকে একটু স্মার্ট করুন

MIGUEL GUERRA

ব্যস্ত দিনে দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করা সম্ভব না হলেও শরীরকে সক্রিয় রাখার সুযোগ আছে। নিয়মিত হাঁটার মধ্যেই গতি কিছুটা বাড়ানো যায়। সাইক্লিং করলে স্বাভাবিক গতির মাঝে অল্প সময় বেশি জোরে চালানো যেতে পারে। একইভাবে সিঁড়ি ওঠা কিংবা অন্য কোনো দৈনন্দিন শারীরিক কাজেও কিছুটা বেশি গতি যোগ করা যায়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তীব্রতা বাড়াতে হবে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও দ্রুতগতির ওয়ার্কআউট দেখে হঠাৎ একইভাবে শুরু করা ঠিক নয়। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ব্যায়াম করেননি বা কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য নিরাপদ পদ্ধতিতে ধীরে ধীরে শরীরকে প্রস্তুত করা গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যায়ামের সবচেয়ে বড় ফর্মুলা: ধারাবাহিকতা

FaustFoto

আমরা অনেক সময় ব্যায়ামকে এক ধরনের ‘শাস্তি’ বানিয়ে ফেলি। ওজন বেড়েছে, তাই আগামীকাল থেকে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা জিম, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ। কিন্তু কয়েক দিন পর অতিরিক্ত ক্লান্তি, সময়ের অভাব কিংবা একঘেয়েমির কারণে সেই রুটিন বন্ধ হয়ে যায়। বাস্তবে সবচেয়ে কার্যকর ব্যায়াম হতে পারে সেটিই, যা আপনি নিরাপদভাবে এবং দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যেতে পারবেন।

কোনো দিন দীর্ঘ হাঁটা, কোনো দিন দ্রুতগতির ছোট বিরতি, আবার কোনো দিন সাইক্লিং কিংবা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম, রুটিনে বৈচিত্র্য থাকলে শরীরচর্চাকে দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাওয়া সহজ হতে পারে।

হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য জাদুকরি শর্টকাট নেই

নতুন গবেষণাটি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়, ব্যায়ামের ক্ষেত্রে শুধু সময়ের পরিমাণ নয়, তীব্রতাও গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্প সময়ের বেশি তীব্রতার ব্যায়াম শরীরে দ্রুত কিছু পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যা ভবিষ্যৎ গবেষণায় আরও ভালোভাবে বোঝা দরকার।

তবে সুস্থ থাকার জন্য কোনো একটি ব্যায়ামই একমাত্র সমাধান নয়। নিয়মিত হাঁটা বা অন্য ধরনের শারীরিক সক্রিয়তা, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাবার সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। তাই সুস্থ থাকার দৌড়ে কে সবচেয়ে দ্রুত দৌড়ালেন, সেটিই আসল প্রশ্ন নয়। বরং কে নিজের শরীরের সক্ষমতা বুঝে, নিরাপদে এবং নিয়মিত নড়াচড়া করতে পারছেন, শেষ পর্যন্ত সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্য: মেডিকেল নিউজ টুডে

ছবি: পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন