‘আই’ম ফাইন সিনড্রোম’: হাসিমুখের আড়ালে লুকানো মানসিক ক্লান্তি
শেয়ার করুন
ফলো করুন

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই প্রবণতাকে বলা হচ্ছে ‘আই’ম ফাইন সিনড্রোম’। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে মানুষ নিজের কষ্ট বা সমস্যাকে অস্বীকার করে বারবার নিজেকে এবং অন্যদের বোঝাতে চেষ্টা করেন যে সবকিছু ঠিক আছে।

কী এই ‘আই’ম ফাইন সিনড্রোম’?

এটি কোনো আনুষ্ঠানিক মানসিক রোগের নাম নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এক ধরনের মানসিক অস্বীকার বা ইমোশনাল সাপ্রেশন, যেখানে মানুষ নিজের চাপ, ক্লান্তি বা মানসিক সংকটকে গুরুত্ব না দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন।

আজকের কর্মক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিশ্চয়তা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ অনেককে নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকে পিছনে ফেলে রাখতে বাধ্য করছে। তারা ভাবেন, ‘এখন কাজটা শেষ করি, পরে নিজের দিকে নজর দেব।’ কিন্তু সেই ‘পরে’ আর আসে না।

কেন আমরা সমস্যাকে লুকিয়ে রাখি?

শৈশব থেকেই অনেককে শেখানো হয়, শক্ত থাকতে হবে, নিজের সমস্যা নিজেকেই সামলাতে হবে এবং অন্যের জন্য বোঝা হওয়া যাবে না। ফলে বড় হওয়ার পরও অনেকের কাছে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করা অস্বস্তিকর মনে হয়।

কেউ কেউ আবার মনে করেন, নিজের মানসিক সমস্যার কথা বললে অন্যরা তাকে দুর্বল ভাববে। ধীরে ধীরে এই মানসিকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তারা নিজেদের ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা বা মানসিক অবসাদকেও স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে শুরু করেন।

বিজ্ঞাপন

যেসব লক্ষণকে অবহেলা করা ঠিক নয়

‘আই’ম ফাইন সিনড্রোম’-এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এর লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ ক্লান্তি বা ব্যস্ততার অংশ বলে মনে হয়। অথচ এগুলো দীর্ঘমেয়াদে বড় সংকটের ইঙ্গিত দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব লক্ষণ খেয়াল রাখা জরুরি—

* নিয়মিত ঘুমের সমস্যা

* মনোযোগ কমে যাওয়া

* ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি

* অকারণে ওজন কমে বা বেড়ে যাওয়া

* কাজের উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া

* পরিবার ও বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া

* পছন্দের কাজেও আগ্রহ হারানো

* খিটখিটে মেজাজ

* অস্থির বা আবেগপ্রবণ আচরণ

* বারবার মাথাব্যথা, হজমের সমস্যা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি

এই লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা শুধু মানসিক নয়, শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতিও কি দায়ী?

অনেক প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত কাজ করাকে নিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ছুটি না নেওয়া, সব সময় অনলাইনে থাকা কিংবা ব্যক্তিগত সময়েও কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা যেন এক ধরনের ‘সাফল্যের মানদণ্ড’ হয়ে উঠেছে।

ফলে অনেক কর্মী নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে চান না। তারা ক্লান্ত শরীর ও অবসন্ন মন নিয়েও কাজ চালিয়ে যান। একসময় বার্নআউট, উদ্বেগ বা বিষণ্নতার মতো সমস্যা তৈরি হলেও তা ধরা পড়ে অনেক দেরিতে।

বিজ্ঞাপন

কখন সাহায্য নেওয়া জরুরি?

মানসিক চাপ জীবনের অংশ হতে পারে, কিন্তু তা যদি প্রতিদিনের জীবনযাপন, কাজ বা সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিজের আবেগ সম্পর্কে সচেতন থাকা, কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সীমারেখা তৈরি করা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ সব সময় হাসিমুখে থাকা মানুষটিও হয়তো ভেতরে ভেতরে কঠিন এক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাই ‘আমি ভালো আছি’ বলার আগে নিজের মনকেও একবার জিজ্ঞেস করা দরকার সত্যিই কি ভালো আছি?

আজকের ব্যস্ত জীবনে নিজের মানসিক সুস্থতাকে বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন হিসেবেই দেখা উচিত। কারণ সুস্থ মন ছাড়া কোনো সাফল্যই দীর্ঘস্থায়ী নয়।

ছবি: এআই

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ১৪: ০০
বিজ্ঞাপন