
সম্প্রতি দা ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ (The Lancet Planetary Health) জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভাতে আর্সেনিকের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই কারণে ক্যানসার ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির হার বেড়ে যেতে পারে কয়েক গুণ।

যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা জানাচ্ছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যায় এবং বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাড়তে থাকে, তাহলে মাটির রাসায়নিক গঠনে পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে ধান গাছ সহজে আর্সেনিক শোষণ করে নেয়। পাশাপাশি দূষিত সেচের পানির ব্যবহারও এই সমস্যা আরও বাড়িয়ে তোলে।
আর্সেনিক দীর্ঘ মেয়াদে শরীরে জমতে থাকলে শরীরে যে রোগগুলো হতে পারে:
• ফুসফুস, মূত্রথলি ও চর্ম ক্যানসার
• হৃদ্রোগ ও ডায়াবেটিস
• গর্ভাবস্থায় জটিলতা
• স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি ও শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে সমস্যা
• রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা
গবেষণা বলছে, শুধু ভাত রান্নার সময় ব্যবহৃত পানির মাধ্যমেও অতিরিক্ত আর্সেনিক শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

১০ বছর ধরে চালানো মাঠপর্যায়ের গবেষণায় ২৮ প্রজাতির ধানের ওপর তাপমাত্রা ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO₂) বৃদ্ধির প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। এরপর ৭টি দেশের জন্য ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। দেশ গুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে:
• চীন: একমাত্র দেশ যেখানে ২০৫০ সালে আর্সেনিকজনিত ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ১.৩৪ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
• বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনাম: ঝুঁকির মাত্রা আশঙ্কাজনক, কারণ এই অঞ্চলে ভাতই প্রধান খাদ্য।
সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা ব্লাডার (মূত্রথলি) ও ফুসফুস ক্যানসারের ক্ষেত্রে। যা তাপমাত্রা ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO₂) বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত।

গবেষক লুইস জিসকা বলেন, “এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ক্যানসার ছাড়াও হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি আরও বাড়বে।” তিনি এবং তার গবেষক দল কয়েকটি প্রতিকারমূলক পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন:
১. কম আর্সেনিক শোষণ করে এমন ধানের জাত উদ্ভাবন
২. ধানখেতে মাটির উন্নত ব্যবস্থাপনা
৩. সেচের পানিতে আর্সেনিক পরীক্ষা ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার
৪. জনসচেতনতা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উদ্যোগ বৃদ্ধি
৫. ভাত রান্নার আগে ভিজিয়ে রাখা ও পানি পরিবর্তন করার অভ্যাস

আমাদের মতো দেশে, যেখানে ভাত শুধু খাদ্য নয়, সংস্কৃতির অংশ—সেখানে এই গবেষণা নিঃসন্দেহে চোখে আঙুল দিয়ে ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্য সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে। এখনই আমাদের যা করতে হবে।
১.সচেতন বৃদ্ধি
২. সঠিক উপায়ে ভাত ধোয়া ও রান্নার অভ্যাস গড়ে তোলা
৩. সরকারি ও কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা
৪. বিকল্প খাদ্য উৎস বা খাদ্যাভ্যাস নিয়ে ভাবা
ভাত আমাদের সংস্কৃতি ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা এর নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে হলে এখনই প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক গবেষণার আলোকে সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ। কারণ প্রতিদিনের খাবার যেন কাল হয়ে না দাঁড়ায়।
ছবি: পেকজেলসডটকম