ডুমস্ক্রলিং কী? রাতে বেশি ফোন ব্যবহার করলে ঘুম ও মস্তিষ্কে কী প্রভাব পড়ে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

দিনভর অসংখ্য তথ্য গ্রহণ করার পর মস্তিষ্কেরও দরকার কিছুটা বিরতি। কিন্তু ঘুমের আগমুহূর্ত পর্যন্ত ফোনের পর্দায় চোখ আটকে থাকলে সেই বিশ্রামের সুযোগটুকুও কমে যায়। ফল হিসেবে পরদিন দেখা দিতে পারে ক্লান্তি, বিরক্তি, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা স্মৃতি নিয়ে ছোটখাটো সমস্যা। আর বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিতভাবে রাতে এমন স্ক্রল করতে থাকলে ঘুমের পাশাপাশি মস্তিষ্কের বিশ্রামও ব্যাহত হতে পারে।

ডুমস্ক্রলিং কী?

মোবাইল হাতে নিলেই মনে হয়, ‘একটু স্ক্রল করি’।  তারপর মিনিটের পর মিনিট পার হয়ে যায়। স্ক্রল করতে করতে খারাপ খবর, দুঃসংবাদ বা নেতিবাচক পোস্ট দেখেছেন তো দেখছেন। ভালো লাগছে না, তবু থামতে পারছেন না। এটাই ডুমস্ক্রলিং। সহজ কথায়, ডুমস্ক্রলিং মানে হলো সোশ্যাল মিডিয়া বা নিউজ ফিডে অনবরত স্ক্রল করে যাওয়া। বেশিরভাগ সময়ই এই স্ক্রলিংয়ের বিষয়বস্তু হয় নেতিবাচক। মন খারাপ হয়। উদ্বেগ বাড়ে। তবু মোবাইল হাত থেকে নামানো যায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের মস্তিষ্ক বিপদের খবরে বেশি সাড়া দেয়। এটা এক ধরনের সহজাত প্রবৃত্তি। খারাপ কিছু ঘটলে জানতে ইচ্ছা করে, "আর কী হলো?" এই কৌতূহল থেকেই শুরু হয় স্ক্রলিং। আর অ্যালগরিদমও এমনভাবে তৈরি, যাতে আপনি ফিডে থেকে যান আরও বেশি সময়। ফলে শরীর-মনে গভীর প্রভাব। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, মনোযোগ কমে যায়, উদ্বেগ ও অস্থিরতা বাড়ে, সারাদিনের মেজাজ প্রভাবিত হয়।

বিজ্ঞাপন

কেন রাতে ডুমস্ক্রলিং করলে ‘ব্রেন ফগ’ হতে পারে?

ডুমস্ক্রলিং শুধু মানসিকভাবে ক্লান্ত করে না, এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিশ্রামের প্রক্রিয়াতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ডুমস্ক্রলিং মস্তিষ্কের নিজেকে ‘রিচার্জ’ করার ক্ষমতায় বাধা দিতে পারে। সারাক্ষণ নতুন নতুন তথ্য গ্রহণ করতে থাকলে মস্তিষ্ককে সেই তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার কাজ চালিয়ে যেতে হয়।
তার ওপর রাতে ফোনের পর্দা থেকে আসা নীল আলো শরীরে মেলাটোনিন নামের ঘুম-সহায়ক হরমোনের উৎপাদন কমাতে পারে। এতে ঘুমতে দেরি হতে পারে এবং ঘুমের মানও খারাপ হতে পারে। আর ঠিকমতো ঘুম না হলে তার প্রভাব শুধু পরদিনের অলসতায় আটকে থাকে না। স্মৃতি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, মেজাজ এবং সামগ্রিক চিন্তাশক্তিও প্রভাবিত হতে পারে।

তৈরি হতে পারে এক দুষ্টচক্র

রাতে ডুমস্ক্রলিংয়ের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এটি সহজেই একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে। উদ্বেগ তৈরি করে এমন খবর বা নেতিবাচক কনটেন্ট মস্তিষ্ককে আরও সতর্ক ও সক্রিয় রাখে। এর সঙ্গে যোগ হয় নীল আলো। ফলে ঘুমতে আরও দেরি হয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে পরদিন আপনি ক্লান্ত, খিটখিটে বা ভুলোমনা হয়ে যেতে পারেন। আবার সেই মানসিক ক্লান্তির মধ্যেও অনেক সময় ফোনে ডুবে থাকাই সহজ মনে হয়। এভাবেই তৈরি হতে পারে প্রতিদিনের একটি অভ্যাস। বিশেষজ্ঞের মতে, অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রলিং করার পরে লক্ষ্য করেন আগের তুলনায় মনোযোগ কমেছে, ছোটখাটো বিষয় ভুলে যাচ্ছেন কিংবা অকারণে বিরক্ত লাগছে।

বিজ্ঞাপন

মাঝে মাঝে স্ক্রলিং কি ক্ষতিকর?

প্রতিবার ফোনে ঢোকা বা রাতে কিছুক্ষণ স্ক্রল করাই যে ক্ষতিকর, এমন নয়। মূল সমস্যা হলো ‘অভ্যাসগত ডুমস্ক্রলিং’। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ হলো, প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সীমারেখা তৈরি করা। অর্থাৎ খবর জানতে পারেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও থাকতে পারেন, কিন্তু কখন থামতে হবে সেটা জানাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।

ডুমস্ক্রলিং কমাবেন কীভাবে?

খবর দেখার জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন

সারাদিন অন্তহীনভাবে খবর বা আপডেট অনুসরণ না করে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে তা দেখুন। এতে বারবার ফোন হাতে নেওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।

ঘুমের অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন সরিয়ে রাখুন

বিছানায় যাওয়ার ঠিক আগে ফোন ব্যবহার না করে মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে দিন। ঘুমের অন্তত এক ঘণ্টা আগে ডিজিটাল ডিভাইস সরিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারেন।

অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন

ফোনে টুংটাং করে আসা প্রতিটি নোটিফিকেশনই নতুন করে আপনাকে স্ক্রলিংয়ের দিকে টেনে নিতে পারে। তাই যেসব সতর্কবার্তা জরুরি নয়, সেগুলো বন্ধ করে রাখুন।

কখন সাহায্য নেওয়া দরকার, সেটাও বুঝুন

ডুমস্ক্রলিংয়ের পাশাপাশি যদি নিয়মিত উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, মাথাব্যথা কিংবা স্মৃতি ও মনোযোগের সমস্যা দেখা দেয় এবং তা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ফোন নামিয়ে রাখাও এক ধরনের বিশ্রাম

দিনভর কাজ, খবর, বার্তা, ভিডিও আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সব মিলিয়ে মস্তিষ্ক যেন কখনোই পুরোপুরি অফলাইনে যায় না। অথচ সুস্থ থাকার জন্য মস্তিষ্কেরও প্রয়োজন নীরবতা, বিশ্রাম এবং নিরবচ্ছিন্ন ঘুম।

তাই রাতে বিছানায় গিয়ে শেষবারের মতো ফোন স্ক্রল করার বদলে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকা, বই পড়া কিংবা শুধু আলো নিভিয়ে বিশ্রাম নেওয়াই হতে পারে দিনের সবচেয়ে ভালো সমাপ্তি। কারণ, ঘুমের আগে মস্তিষ্ককে আরও তথ্য নয়, একটু বিরতিই হয়তো বেশি প্রয়োজন।

সূত্র: হেলথলাইনডটকম

ছবি: পেক্সজেলসডটকম

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ২৭
বিজ্ঞাপন