
আমরা যে সময়টা পার করছি তা শীতের সময়ে স্বাভাবিক; কিন্তু আমাদের নানা কারণে এই শীত সহ্য হয় না, এই সময়ে তাই সাধারণ ঠান্ডা ও কাশি হওয়া খুব সাধারণ বিষয়। এর জন্য বিচলিত না হয়ে আপনি ঘরোয়া পদ্ধতিতে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন খুব সহজেই।

শীতে কোল্ড (কমন কোল্ড), ফ্লু (ইনফ্লুয়েঞ্জা) ও রেসপিরেটরি সিনসিটিয়াল ভাইরাসের (আরএসভি) মতো ভাইরাসগুলো বেশি সক্রিয় হয়। এগুলো শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ঘটায়, যা কাশির প্রধান কারণ। ঠান্ডা তাপমাত্রায় ভাইরাসের সারভাইভাল রেট বাড়ে, কারণ কম আর্দ্রতায় তারা বাতাসে বেশি সময় ভাসতে পারে। শীতে নাকের ইমিউন সিস্টেম (যেমন এক্সট্রাসেলুলার ভেসিকলস বা EVs) কম কার্যকর হয়, যা ভাইরাসের প্রবেশ সহজ করে এবং কাশিজনিত সংক্রমণ বাড়ায়। শীতে এই সংক্রমণগুলো ২-৩ গুণ বেশি হয়।
শীতকালে কাশি হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে, যা মূলত আবহাওয়া, ভাইরাসের আচরণ, মানুষের শারীরিক প্রতিক্রিয়া এবং জীবনধারার সঙ্গে যুক্ত। শীতে বাতাসের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা কমে, যা শ্বাসনালিকে অস্বস্তিতে ফেলে। ঠান্ডা বাতাস নাক এবং গলার মিউকাস মেমব্রেনকে শুষ্ক করে তোলে, যা সাধারণত ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করে। ফলে শ্বাসনালিতে জ্বালাপোড়া হয় এবং কাশি শুরু হয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে ঠান্ডা, শুষ্ক বাতাস শ্বাসনালির সংকোচন (ব্রঙ্কোকনস্ট্রিকশন) ঘটায়, যা কাশি এবং শ্বাসকষ্ট বাড়ায়, বিশেষ করে অ্যাজমা রোগীদের ক্ষেত্রে। এ ছাড়া শুষ্ক বাতাসে ভাইরাসের বাইরের স্তর (লিপিড এনভেলপ) আরও স্থিতিশীল হয়, যা তাদের ছড়ানো সহজ করে।
শীতে মানুষ বাড়িতে বা ঘরোয়া স্থানে বেশি সময় কাটায়, যা ভাইরাসের ছড়ানো সহজ করে। বন্ধ ঘরে বাতাসের সার্কুলেশন কম হয়, ধুলা, অ্যালার্জেন (যেমন ছত্রাক, পোষ্যের চুল) এবং দূষণকারী পদার্থ জমে, যা শ্বাসনালিকে জ্বালাতন করে কাশি ঘটায়। শীতের ছুটি এবং সমাবেশে (হলিডে গ্যাদারিং) ভাইরাসের ট্রান্সমিশন বাড়ে। এ ছাড়া হিটার বা ফায়ারপ্লেসের ব্যবহার বাতাসকে আরও শুষ্ক করে, যা কাশি বাড়ায়।
শীতে ভিটামিন ডি-এর অভাব হয় (সূর্যালোক কম), যা ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে। ফলে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা কমে, এবং কাশিজনিত রোগ বাড়ে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় নাকের ভেতরের তাপমাত্রা কমে, যা ইমিউন রেসপন্সকে হ্রাস করে।
যার কারণে কাশি একটি অস্বস্তিকর এবং দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হতে পারে, যা দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে। ফলে অনেকেই কার্যকর এবং প্রাকৃতিক সমাধানের সন্ধান করেন। ওভার দ্য কাউন্টার ওষুধগুলো সহজলভ্য হলেও, ঘরোয়া প্রতিকারগুলো কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং বেশি সহজলভ্যতার কারণে আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।

আজ আপনাদের এমন একটি রেসিপির কথা বলা হচ্ছে, যা আপনি ঘরে বসেই তৈরি করে খেতে পারবেন। শিশু ও বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষের জন্যই এটা কার্যকর। এই প্রাকৃতিক প্রতিকারগুলোর সরলতা, সাশ্রয়ী মূল্য এবং কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় সাধারণ ঘরোয়া উপাদানগুলোর নিরাময় ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত, বিশেষ করে শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে।
কাশি একটি জটিল শ্বাসযন্ত্রের প্রতিক্রিয়া, যা সাধারণত ভাইরাল সংক্রমণ, অ্যালার্জি বা পরিবেশগত জ্বালাপোড়ার কারণে হয়। এটি মূলত দুই ধরনের হয়:
শুকনা কাশি: মিউকাস বা কফ উৎপাদন ছাড়া কাশি
কফযুক্ত কাশি: কফ বা শ্লেষ্মা বের হয়ে আসে

নিচে দেওয়া রেসিপি বানাবেন।
যেভাবে বানাবেন
উপকরণ
আদার রস ১ টেবিল চামচ,
পেঁয়াজের রস ১ টেবিল চামচ,
লেবুর রস ১ টেবিল চামচ,
হলুদের গুঁড়া ১ টেবিল চামচ,
মধু ২ টেবিল চামচ ও
সামান্য গোলমরিচের গুঁড়া
সবগুলো একসঙ্গে মিশিয়ে নিলে একটা সিরাপ তৈরি হবে।
সেবনের নিয়ম
এই সিরাপ এক টেবিল চামচ পরিমাণ এক কাপ গরম পানিতে নিয়ে হালকা গরম গরম অবস্থায় তিন বেলা খাবেন। এতে কফ বের হবে। এটা এক দিনেই উপকার পাওয়া যায়, কিন্তু ৬ দিন খেতে হবে।

একটি অত্যন্ত কার্যকর ঘরোয়া প্রতিকারে দুটি শক্তিশালী উপাদান মিশ্রিত করা হয়:
হলুদ, আদা, পেঁয়াজ, মধু এবং লেবু। এই মিশ্রণটির একাধিক চিকিৎসামূলক উপকার আছে।
মধু: প্রাকৃতিক অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিভাইরাল এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণসম্পন্ন। এটি গলার জ্বালাপোড়া শান্ত করে, কাশি দমন করে এবং শ্বাসনালিতে একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে মধু কাশির তীব্রতা এবং ফ্রিকোয়েন্সি কমাতে ওষুধের মতোই কার্যকর।
লেবু: ভিটামিন সি-তে সমৃদ্ধ, যা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এবং ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। এর অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট গুণ প্রদাহ কমায় এবং কফ পাতলা করে বের করে সাহায্য করে। লেবুর অ্যাসিডিক প্রকৃতি গলার জমাট শ্লেষ্মা দ্রবীভূত করে।
আদা: অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি, অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টিভাইরাল গুণসম্পন্ন (জিঞ্জেরল যৌগের কারণে)। এটি গলার প্রদাহ কমায়, কফ পাতলা করে বের করে, শ্বাসনালি পরিষ্কার করে এবং ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে আদা সর্দি-কাশির লক্ষণ কমাতে এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে।
পেঁয়াজ: কোয়ার্সেটিন সমৃদ্ধ অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট যা প্রদাহ কমায়, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিভাইরাল গুণসম্পন্ন। এটি কফ পাতলা করে বের করে, শ্বাসনালি পরিষ্কার করে এবং ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় এটি সর্দি-কাশির জন্য ব্যবহৃত হয়।

গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে মধুসহ এই মিশ্রণ কাশির লক্ষণ দমনে অত্যন্ত কার্যকর। জার্নাল অব অলটারনেটিভ অ্যান্ড কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিন–এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ কাশি দমনকারী ওষুধের মতোই কার্যকর, বিশেষ করে রাতের কাশি উপশমে।
অধিকাংশ কাশি সাময়িক এবং নিজে থেকেই সেরে যায়, শীতে কাশি হওয়া শুধু ঠান্ডার কারণে নয়, বরং আবহাওয়া-সম্পর্কিত পরিবর্তন, ভাইরাসের সক্রিয়তা এবং মানুষের আচরণের সমন্বয়ে ঘটে। যদি কাশি দীর্ঘস্থায়ী হয় বা অন্য লক্ষণ (জ্বর, শ্বাসকষ্ট) থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
যাঁদের ডায়াবেটিস আছে তাঁদের ক্ষেত্রে মধু সকর্কতার সঙ্গে খেতে হয়। তাই যদি সুগার বাড়ে সেটা খেয়াল রাখতে হবে। এটা প্রতিদিনেরটা প্রতিদিন বানাতে হবে। ফ্রিজে রাখা যাবে না।
লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: এআই