ডায়াবেটিসে আক্রান্ত? তাহলে খাদ্যতালিকায় রাখুন নানা ধরনের বীজ
শেয়ার করুন
ফলো করুন

একটা সময়ে নিয়মিত আহারে বীজের ব্যবহার খুব বেশি ছিল না। মাঝে মাঝে একটু বীজের ভর্তা খাওয়া কিংবা নাড়ু বানিয়ে রাখার প্রচলন ছিল। এখন অবশ্য খাবারের প্যাটার্ন বদলেছে। মানুষের রোগের ধরন পাল্টেছে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগ নিয়ে মানুষের শঙ্কিত হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। তবে জেনে রাখবেন যে ডায়াবেটিস (বিশেষ করে টাইপ-২) রোগীদের জন্য বীজ অত্যন্ত উপকারী। বীজে কার্বোহাইড্রেট খুব কম থাকে, প্রচুর ফাইবার, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট (ওমেগা-৩), ম্যাগনেসিয়াম, অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট ও অন্যান্য খনিজ থাকে। এগুলো রক্তে শর্করার বৃদ্ধি কমায়, ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি বাড়ায়, প্রদাহ হ্রাস করে এবং হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। মেটা-অ্যানালাইসিস ও RCT–তে দেখা গেছে, নিয়মিত বীজ খেলে ফাস্টিং ব্লাড গ্লুকোজ, HbA1c, ইনসুলিন লেভেল এবং HOMA–IR (ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স) উল্লেখযোগ্য হারে কমে।

বিজ্ঞাপন

বীজ কেন খাবেন

• ফাইবারের ভূমিকা: দ্রবণীয় ফাইবার অন্ত্রে জেল তৈরি করে কার্বোহাইড্রেটের হজম ও শোষণ ধীর করে পোস্টপ্রান্ডিয়াল গ্লুকোজ স্পাইক কমে।
• ম্যাগনেসিয়াম: ইনসুলিনের কাজ সহজ করে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমায়। ম্যাগনেসিয়ামের অভাব ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
• ওমেগা থ্রি ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট: প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমিয়ে লিপিড প্রোফাইল (কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড) উন্নত করে।
• প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট: তৃপ্তি বাড়ায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং গ্লুকোজ মেটাবলিজম উন্নত করে।

বিজ্ঞাপন

ডায়াবেটিসের জন্য কোন বীজ খাবেন

চিয়া সিড
চিয়া সিড

চিয়া সিড: প্রচুর ফাইবার (প্রায় ৩৪ গ্রাম/১০০ গ্রাম), ওমেগা থ্রি, প্রোটিন ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট। পোস্টপ্রান্ডিয়াল গ্লুকোজ কমায়, ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি বাড়ায়, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, চিয়া সাপ্লিমেন্ট খেলে সিস্টোলিক ব্লাড প্রেশার কমে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হ্রাস পায়।  
কীভাবে খাবেন: পানি বা দুধে ভিজিয়ে, পুডিং বানিয়ে, স্মুদি, দই বা সালাদে। ভেজানো অবস্থায় খেলে ভালো হজম হয়।
পরিমাণ: প্রতিদিন ১-২ টেবিল চামচ (ভিজিয়ে খান)।

তিসি
তিসি

তিসি বা ফ্ল্যাক্স সিড: দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয় ফাইবার, ALA (ওমেগা থ্রি), লিগনান। ফাস্টিং গ্লুকোজ, HbA1c ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমায়। একটি RCT–তে ১৫ গ্রাম গ্রাউন্ড ফ্ল্যাক্সসিড খেলে দুই ঘণ্টার পোস্টপ্রান্ডিয়াল গ্লুকোজ ২৪% কমে। মেটা-অ্যানালাইসিসে ফ্ল্যাক্সসিড সাপ্লিমেন্ট HbA1c ও HOMA–IR উল্লেখযোগ্য কমায়।
কীভাবে খাবেন: অবশ্যই গুঁড়া করে খাবেন (পুরো বীজ হজম হয় না)। স্মুদি, রুটি, দই বা সালাদে মিশিয়েও খাওয়া যায়।
পরিমাণ: ১-২ টেবিল চামচ গুঁড়া করে (কাঁচা বা সোনালি)।

কুমড়া বীজ: উচ্চ ম্যাগনেসিয়াম, ফাইবার, জিঙ্ক ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট। পোস্ট-মিল ব্লাড সুগার স্পাইক কমায়, ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি বাড়ায়। ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ১৫% পর্যন্ত কমাতে পারে।  
কীভাবে খাবেন: লবণ ছাড়া হালকা ভাজা, স্ন্যাক্স হিসেবে বা সালাদে ছড়িয়ে।
পরিমাণ: ১-২ টেবিল চামচ (কাঁচা বা রোস্টেড, লবণ ছাড়া)।

কুমড়া বীজ:
কুমড়া বীজ:
সূর্যমুখী বীজ
সূর্যমুখী বীজ

সূর্যমুখী বীজ: ভিটামিন ই, ম্যাগনেসিয়াম, সেলেনিয়াম ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট। রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায়। গবেষণায় সূর্যমুখী ও ফ্ল্যাক্সসিডের সমন্বয়ে গ্লুকোজ লেভেল কমেছে।  
কীভাবে খাবেন: হালকা ভাজা, সালাদ বা যেকোনো ডেজার্টে মিশিয়ে খাবেন।
পরিমাণ: ১ টেবিল চামচ।

তিলবীজ (সাদা): সেসামিন, ফাইবার, প্রোটিন ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট। ফাস্টিং গ্লুকোজ, HbA1c, LDL কোলেস্টেরল কমায় এবং অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট এনজাইম (CAT, SOD) বাড়ায়। মেটা-অ্যানালাইসিসে সেসামি গ্লাইসেমিক কন্ট্রোল উন্নত করেছে।
কীভাবে খাবেন: তিলের তেল বা বীজ সালাদ/রান্নায়।  
পরিমাণ: ১-২ টেবিল চামচ (গুঁড়া বা তেল হিসেবে)।

পরামর্শ

• ওপরের পরিমাণ সাধারণ গাইডলাইন। শুরুতে অল্প করে (এক চামচ) খেতে থাকুন এবং শরীরের প্রতিক্রিয়া দেখুন।
• ফ্ল্যাক্স সিড অবশ্যই গুঁড়া করে খাবেন, না হলে উপকার পাবেন না।
• চিয়া ও ফ্ল্যাক্স ভিজিয়ে খেলে পেটের গ্যাস-ব্যথা কম হয়।

সতর্কতা

• অতিরিক্ত খেলে পেটফাঁপা, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।
• রক্ত পাতলা করার ওষুধ খেলে ফ্ল্যাক্স সিড বেশি খাবেন না (ওমেগা থ্রির কারণে)।
• ক্যালরি বেশি, তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
• অ্যালার্জি থাকলে এড়িয়ে চলুন।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বীজ খাওয়া সহায়ক, কিন্তু ওষুধের বিকল্প নয়। রক্তের শর্করা নিয়মিত পরীক্ষা করুন। যদি ভালো বোধ করেন তাহলে পরিমাণ ধীরে বাড়াবেন। বিশেষ করে স্ন্যাক্স হিসেবে ভাজাপোড়া না খেয়ে এই বীজের সঙ্গে বাদাম মিশিয়ে খেতে পারেন।

লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন