
বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ মিলছে, নিটিং বা ক্রশেটিং শুধু স্কার্ফ বা সোয়েটার বানানোর জন্য নয়; এটি হতে পারে মনকে শান্ত রাখা, খারাপ অভ্যাস কমানো এবং নিজের সঙ্গে সংযোগ তৈরির এক কার্যকর উপায়।

অনেকেই অজান্তেই কিছু ক্ষতিকর অভ্যাসে জড়িয়ে পড়েন—নখ কামড়ানো, ত্বক খোঁচানো, বা অকারণে ফোন স্ক্রল করা। এসব অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। কিন্তু নিটিং এখানে এক ধরনের ‘হেলদি রিপ্লেসমেন্ট’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
হাতে সুতা আর সুচ নিয়ে কাজ করলে মনোযোগ অন্যদিকে সরে যায়। হাত ব্যস্ত থাকে, আর ধীরে ধীরে সেই ক্ষতিকর অভ্যাসের জায়গা নেয় একটি সৃজনশীল কাজ।
কানাডার বাসিন্দা আমান্ডা উইলসন-এর অভিজ্ঞতা এরই একটি উদাহরণ। দীর্ঘদিন ধরে অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD)-এর কারণে তিনি ত্বক খোঁচানো ও নখ কামড়ানোর মতো অভ্যাসে ভুগছিলেন। পরে নিটিং শুরু করার পর তিনি লক্ষ্য করেন, তার এই অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে কমে এসেছে—এমনকি তার নখ ও ত্বকও সুস্থ হয়ে উঠেছে।

নিটিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পুনরাবৃত্তিমূলক (রিপিটেটিভ) মুভমেন্ট। একইভাবে সুতা বোনা, একের পর এক স্টিচ করা—এই ছন্দময় কাজ মনকে ধীরে ধীরে শান্ত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের মুভমেন্ট শরীরের ‘প্যারাসিমপ্যাথিটিক নার্ভাস সিস্টেম’ সক্রিয় করে, যা আমাদের স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। ফলে উদ্বেগ কমে, মনোযোগ বাড়ে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।
এছাড়া, দুই হাত একসঙ্গে ব্যবহার করার কারণে মস্তিষ্কের দুই পাশই সক্রিয় থাকে, যা মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক।

মন খারাপ, উদ্বেগ বা অস্থিরতার মুহূর্তে অনেকেই কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। নিটিং সেখানে একটি ‘গ্রাউন্ডিং টুল’ হিসেবে কাজ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিটিং এমন একটি কাজ যা মানুষকে “মাথা থেকে হাতে’’ নিয়ে আসে—অর্থাৎ অতিরিক্ত চিন্তা থেকে বের করে এনে বাস্তব কাজের মধ্যে মনোযোগ স্থির করে।
ফলে, আবেগের চাপ কমে এবং ধীরে ধীরে একটি স্বস্তির অনুভূতি তৈরি হয়।

নিটিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি বিভিন্ন ধরনের আসক্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
নেদারল্যান্ডসের লোয়েস ভেনসট্রা নিজের ধূমপানের অভ্যাস কমানোর জন্য ৫৫০টিরও বেশি সোয়েটার বুনেছিলেন। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার এক নারীও দীর্ঘদিনের সিগারেট আসক্তি কাটাতে নিটিংকে ব্যবহার করেছেন।
নিটিং এখানে শুধু হাত ব্যস্ত রাখে না, বরং সেই ‘রিচুয়াল’ বা অভ্যাসের জায়গাটিও পূরণ করে—যা আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

যদিও নিটিংয়ের উপকারিতা নিয়ে এখনো বড় পরিসরে গবেষণা সীমিত, তবুও কিছু ছোট গবেষণা আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিটিং উদ্বেগ কমাতে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এমনকি কিছু চিকিৎসা কেন্দ্রে এটি থেরাপির অংশ হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে—বিশেষ করে ইটিং ডিসঅর্ডার বা আসক্তি নিরাময়ের ক্ষেত্রে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিষয়টি নিয়ে আরও বড় ও নির্ভরযোগ্য গবেষণা প্রয়োজন।

নিটিং শুরু করতে গেলে প্রথম দিকে ভুল হওয়া স্বাভাবিক—স্টিচ মিস হওয়া, সুতা জড়িয়ে যাওয়া, বা কাঙ্ক্ষিত আকার না পাওয়া। কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে এর সৌন্দর্য।
এটি নিখুঁত হওয়ার বিষয় নয়, বরং ধীরে ধীরে শেখার, নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর একটি প্রক্রিয়া।

নিটিং সবার জন্য সমানভাবে কাজ নাও করতে পারে। কারও কাছে এটি জটিল বা বিরক্তিকর মনে হতে পারে। তবে একই ধরনের উপকার পেতে চাইলে বিকল্প হিসেবে ‘ফিজেট টুল’ ব্যবহার করতে পারেন।
আজকের দ্রুতগতির জীবনে আমরা প্রায়ই নিজেদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। নিটিং সেই বিচ্ছিন্নতাকে কমিয়ে এনে আমাদের আবার নিজের কাছে ফিরিয়ে দেয়—একটি স্টিচ, একটি মুহূর্ত, একটুখানি মনোযোগের মাধ্যমে।
হয়তো এটি কোনো ম্যাজিক নয়, কিন্তু ছোট ছোট পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তো বড় রূপান্তর আসে। আর নিটিং সেই পরিবর্তনেরই একটি সহজ, সৃজনশীল ও শান্ত পথ।
সূত্র: বিবিসি লাইফস্টাইল
ছবি: পেকজেলসডটকম