
শীতকালে গলাব্যথা খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। ছোট–বড় যে কারও হতে পারে, এটা এই মৌসুমে সাধারণ সমস্যা কিন্তু এটা বিরক্তিকর। বিশেষ করে গলা বসে যায়, কণ্ঠস্বর বদলে যায়, খাবার গিলতে কষ্ট হয়। সেই সঙ্গে অনেকের সংক্রামক হয়ে ওঠে, যার কারণে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়। এই গলাব্যথার প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ মূলত দুটি:
পরিবেশগত কারণ (যেমন শুষ্ক বাতাস)।
সংক্রমণ (ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন)।
শুষ্ক এবং ঠান্ডা বাতাসের কারণে গলার টিস্যু শুকিয়ে যাওয়া ঠান্ডা বাতাসে আর্দ্রতা খুব কম থাকে, কারণ ঠান্ডা বাতাস কম পরিমাণে জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে। শীতকালে বাইরের বাতাস শুষ্ক হয় এবং ঘরের ভেতরে হিটার বা গরম যন্ত্র ব্যবহার করলে আর্দ্রতা আরও কমে যায় (প্রায় ১০-২০% পর্যন্ত নেমে যায়)। এই শুষ্ক বাতাস শ্বাস নিলে গলা এবং নাকের মিউকাস মেমব্রেন (আর্দ্র টিস্যু) থেকে দ্রুত জলীয় বাষ্প বেরিয়ে যায়। ফলে গলার টিস্যু শুকিয়ে যায়, জ্বালা করে এবং প্রদাহ হয়। এটি গলাকে খসখসে, ব্যথাযুক্ত এবং সংবেদনশীল করে তোলে। মুখ দিয়ে শ্বাস নিলে এই সমস্যা আরও বাড়ে, কারণ নাক শ্বাসকে আর্দ্র ও উষ্ণ করে, কিন্তু মুখ দিয়ে সরাসরি শুষ্ক বাতাস গলায় প্রবেশ করে।
এ ছাড়া শুষ্কতার কারণে পোস্ট-নেজাল ড্রিপ (নাক থেকে শ্লেষ্মা গলায় ঝরা) বাড়তে পারে, যা গলাকে আরও জ্বালাতন করে। চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে যে শীতকালে কম আর্দ্রতা গলার মিউকাস লেয়ারকে পাতলা করে, যা প্রাকৃতিক সুরক্ষা কমিয়ে দেয়।
শীতকালে রেসপিরেটরি ভাইরাস বেশি সক্রিয় হয়। এর কয়েকটি কারণ: ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাসে ভাইরাস দীর্ঘক্ষণ জীবিত থাকে এবং সহজে ছড়ায় (উচ্চ আর্দ্রতায় ভাইরাস দ্রুত নিষ্ক্রিয় হয়)। মানুষ ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটায়, কাছাকাছি থাকায় ড্রপলেট (কাশি-হাঁচির ফোঁটা) দিয়ে সংক্রমণ বাড়ে। শীতে ভিটামিন ডি-এর অভাব (সূর্যের আলো কম) এবং ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। এই ভাইরাসগুলো গলার টিস্যুতে আক্রমণ করে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যার প্রথম লক্ষণ প্রায়ই গলাব্যথা। কম সাধারণভাবে ব্যাকটেরিয়া (যেমন স্ট্রেপ থ্রোট) সংক্রমণও শীতে বাড়ে।
বিখ্যাত কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে ইনফ্লুয়েঞ্জা আরভিএস ইত্যাদি ভাইরাস শীত-বসন্তে আক্রমণ করে এবং শুষ্কতা গলাকে সংক্রমণের জন্য আরও সংবেদনশীল করে। এ ছাড়া অ্যালার্জি: ঘরের ধুলা, পোষ্যের লোম ইত্যাদি শীতে বেশি প্রভাব ফেলে। শীতে পানির তৃষ্ণা কম লাগে, ফলে গলা শুকিয়ে যায়। শীতের গলাব্যথা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিজ থেকে সেরে যায়, কিন্তু যদি জ্বর, ফোলা গ্রন্থি বা দীর্ঘস্থায়ী হয়,
তাহলে চিকিৎ করানো উচিত।
গরম পানি গার্গল: প্রথম ২৪-৪৮ ঘণ্টায় যা করলে ৮০% গলাব্যথা সেরে যায়। গরম পানিতে লবণ দিয়ে গড়গড়া ১ গ্লাস গরম পানি ১/২ চা–চামচ লবণ, প্রতি ৩-৪ ঘণ্টায় ৩০ সেকেন্ড গড়গড়া করুন। গলাব্যথা ৪০% কমে, ব্যথা ১ দিনেই সেরে যায়। এটা খুব কর্যকর পদ্ধতি, এতে গলায় জমে থাকা কফ নরম হয়ে লালার সঙ্গে বেরিয়ে আসে।
মধু–হলুদ খাওয়া: রাতে ১-২ চা–চামচ খাঁটি মধু এক চিমটি ভালো মানের হলুদের গুঁড়া মিশিয়ে চেটে চেটে খাবেন। এতে গলাব্যথা কমবে ও ঘুম ভালো হবে। ছোট-বড় সবার গলাব্যথা ও রাতের কাশি মধু হলুদ সবচেয়ে বেশি কমায়। মধু ও হলুদে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি থাকায় এটা বেশ কার্যকর। এটা খারাপ সংক্রমণ বাড়তে দেয় না।
গরম তরল পান করা: (দিনে ৩-৪ লিটার) আদা-তুলসী-লেবু-মধু চা এবং চিকেন স্যুপ
মুরগির ঝোল খান—এগুলো প্রমাণিত অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি। এ ছাড়া গরম চিকেন
স্যুপ ও মুরগির ঝোল খেতে ভালো লাগে। গরম–গরমভাবে গলার ব্যথা উপশম হয়।
গোল্ডেন মিল্ক: এক গ্লাস দুধে একচিমটি হলুদগুঁড়া (১ গ্রাম পরিমাণ)
দু্ইটা গোলমরিচ, এক গ্রাম দারুচিনি দিয়ে ভালো করে দুধ জ্বাল দেবেন। দেখতে হলুদ
বর্ণ সোনালি হয়ে উঠবে। এই দুধ কুমুস গরম অবস্থায় রাতে শোবার আধঘণ্টা আগে পান করুন।
ঠান্ডা পানি/আইসক্রিম/ঠান্ডা পানীয় একদম খাবেন না
চিৎকার করে কথা বলবেন না
ধূমপান/ধোঁয়া এড়িয়ে চলুন
অ্যান্টিবায়োটিক নিজে নিজে খাবেন না; কারণ ৯০% গলাব্যথায় অ্যান্টিবায়োটিক লাগে না
লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: পেকজেলস ও এআই