
গবেষণা বলছে, প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো শুধু মন ভালো করার অভ্যাস নয়, এটি শরীরের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আর এ জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহাড়ে হাঁটা বা জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোরও প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন মাত্র ২০ মিনিট সবুজের কাছাকাছি থাকাও হতে পারে উপকারী।
অফিসের ব্যস্ত দিনের মাঝে কাছের কোনো পার্কে একটু হাঁটা, গাছের ছায়ায় বসে দুপুরের খাবার খাওয়া কিংবা বিকেলে বারান্দায় কিছুক্ষণ সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকাও সেই সময়ের অংশ হতে পারে।

সবুজ গাছ, পাতার মৃদু শব্দ, পাখির ডাক কিংবা মাটির গন্ধ। এসব আমাদের অজান্তেই শরীরকে কিছুটা শান্ত করতে পারে। প্রকৃতির দৃশ্য ও শব্দের সংস্পর্শে স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটে, যা শরীরকে আরামদায়ক অবস্থায় নিয়ে যেতে সাহায্য করে।
এ সময় রক্তচাপ কিছুটা কমতে পারে, হৃদ্স্পন্দনের গতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃতির কাছে যাওয়া শুধু মানসিক প্রশান্তি নয়, শরীরের স্বাভাবিক চাপও কমাতে সাহায্য করতে পারে।
যুক্তরাজ্যে প্রায় ২০ হাজার মানুষের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে মোট অন্তত ১২০ মিনিট সবুজ পরিবেশে কাটিয়েছেন, তারা নিজেদের স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতা তুলনামূলক ভালো বলে জানিয়েছেন।

চাপ বা উদ্বেগের সময় শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো এই স্ট্রেস-সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়া কমাতে সাহায্য করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, গাছপালা থেকে আসা কিছু প্রাকৃতিক গন্ধও শরীর ও মনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ শুধু প্রকৃতিকে দেখা নয়, তার গন্ধ অনুভব করাও গুরুত্বপূর্ণ।

পাইন বা অন্য গাছের গন্ধ অনেকের কাছে স্বাভাবিকভাবেই আরামদায়ক মনে হতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, পাইন গাছের মতো প্রকৃতির গন্ধ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শরীরকে শান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।
গাছ ও মাটি থেকে আসা বিভিন্ন প্রাকৃতিক যৌগ বাতাসের সঙ্গে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। এগুলোর কিছু উপাদান শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পার্কে হাঁটার সময় শুধু চোখ মেলে চারপাশ দেখা নয়, প্রকৃতির গন্ধটাও উপভোগ করুন।

প্রকৃতির উপকার শুধু গাছ দেখা বা বাতাসে শ্বাস নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাটি ও গাছপালার সংস্পর্শে থাকা কিছু উপকারী জীবাণু শরীরের মাইক্রোবায়োমের বৈচিত্র্যেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষণায় আলোচনা হয়েছে।
মাটি ও উদ্ভিদে থাকা বিভিন্ন অণুজীবের সঙ্গে মানুষের নিয়মিত সংস্পর্শ আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু প্রক্রিয়াকে উদ্দীপিত করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাওয়া এবং নিরাপদভাবে মাটি নিয়ে খেলতে দেওয়ার বিষয়টিও এ কারণে আলোচিত।
শারীরিক ব্যায়াম যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মানসিক বিশ্রামও প্রয়োজন। প্রকৃতির মাঝে কিছু সময় কাটানো স্ট্রেস, উদ্বেগ ও মন খারাপের অনুভূতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। সপ্তাহে কয়েক দিন দুপুরের বিরতিতে পার্কে ২০ মিনিট হাঁটা, ছুটির দিনে গাছপালায় ঘেরা জায়গায় বসে থাকা কিংবা সন্ধ্যায় ছাদে কিছুক্ষণ সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকাও হতে পারে ছোট কিন্তু অর্থবহ ওয়েলনেস রুটিন।

প্রতিদিন বাইরে যাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সেক্ষেত্রেও কিছু সহজ উপায় রয়েছে। ঘরে ফুল বা ছোট গাছ রাখা, জানালার পাশে সবুজ রাখা কিংবা প্রকৃতির দৃশ্যের ছবি দেখা মনকে কিছুটা শান্ত করতে পারে।
এমনকি কম্পিউটার বা ল্যাপটপে প্রকৃতির ছবি ব্যবহার করাও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। ঘরের পরিবেশে প্রকৃতির উপস্থিতি যত বেশি, ততই যেন মন একটু স্বস্তির জায়গা খুঁজে পায়।
নিজের যত্ন মানেই সবসময় জটিল ডায়েট, দীর্ঘ ব্যায়াম বা ব্যস্ত রুটিনের মধ্যে আরও একটি কাজ যোগ করা নয়। কখনও কখনও নিজের জন্য কেবল ২০ মিনিট সময় বের করে সবুজের কাছে যাওয়াই যথেষ্ট হতে পারে।
এক কাপ চা হাতে গাছের নিচে বসা, পার্কে ধীরে হাঁটা কিংবা ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ ও গাছের দিকে তাকিয়ে থাকা। ছোট এই বিরতিগুলোই হয়তো ব্যস্ত জীবনে শরীর ও মনকে একটু থামার সুযোগ দেবে।
প্রকৃতির কাছে থাকার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এর জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন মাত্র ২০ মিনিট, হয়তো আপনার ওয়েলনেস রুটিনে এই ছোট অভ্যাসটিই এনে দিতে পারে বড় পরিবর্তন।
সূত্র: বিবিসি
ছবি: পেকজেলসডটকম