
ব্যস্ত নগরজীবনে অনেকে বেডসাইড ল্যাম্প, টিউবলাইট কিংবা টেলিভিশনের আলো জ্বালিয়েই ঘুমিয়ে পড়েন। কারও আবার ফোনের স্ক্রিনও হয়ে ওঠে ঘুমের শেষ সঙ্গী। কিন্তু অতিরিক্ত আলো কি ঘুমের পাশাপাশি হরমোনের ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে?

রাতে শরীর বুঝতে চায় এখন বিশ্রামের সময়। এই স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি। অন্ধকার নেমে এলে শরীরে মেলাটোনিন নামের হরমোনের উৎপাদন বাড়ে, যা শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে।
কিন্তু ঘুমের সময় চোখে আলো পৌঁছালে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। বিশেষ করে উজ্জ্বল রুম লাইট কিংবা ফোন ও অন্যান্য গ্যাজেটের নীল আলো মেলাটোনিনের উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। ফলে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে বা ঘুমের স্বাভাবিক মান ব্যাহত হতে পারে।

ঘুমের মান খারাপ হলে তার প্রভাব শুধু পরদিনের ক্লান্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্যের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের ব্যাঘাত হলে শরীরে কর্টিসল, অর্থাৎ স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। কর্টিসল বাড়লে ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এর সঙ্গে শরীরে প্রদাহের মতো প্রক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে, যা হরমোনের ভারসাম্য ও প্রজননস্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই রাতে ঘরে আলো জ্বালিয়ে ঘুমানোর মতো ছোট একটি অভ্যাসকে একেবারে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়।

নারীদের শরীরে হরমোনের ওঠানামা মাসিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মাসিক, ফলিকুলার, ওভ্যুলেশন এবং লিউটিয়াল প্রতিটি পর্যায়েই শরীরের হরমোনের পরিবর্তন ঘটে।
ঘুমের ব্যাঘাত এবং সার্কাডিয়ান রিদমের অস্বাভাবিকতা এই স্বাভাবিক ছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাই নিয়মিত ভালো ঘুম নারীদের সামগ্রিক হরমোনাল স্বাস্থ্য ও প্রজননস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এর মানে এই নয় যে এক-দুদিন আলো জ্বালিয়ে ঘুমালেই হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। বরং নিয়মিত ও দীর্ঘদিনের ঘুমের ব্যাঘাতকে গুরুত্ব দেওয়া বেশি জরুরি।

বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ভালো ঘুমের জন্য শুধু আলো কমালেই হবে না। ঘরকে আরামদায়ক রাখাও জরুরি। রাতে ঘরের আলো যতটা সম্ভব নিভিয়ে বা খুব কমিয়ে রাখা ভালো। পুরো অন্ধকারে ঘুমাতে অসুবিধা হলে রুমের এক কোণে খুব হালকা আলো ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে তা যেন সরাসরি চোখে না পড়ে।
ঘর খুব গরম বা বদ্ধ থাকলেও ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে। তাই সম্ভব হলে ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা, আরামদায়ক তাপমাত্রা বজায় রাখা এবং অতিরিক্ত গরমে শরীরকে স্বস্তি দেয় এমন পোশাক পরা ভালো। ঘুমের পোশাকও হতে পারে ঢিলেঢালা ও বাতাস চলাচল করতে পারে এমন। এতে গরম ও অস্বস্তির কারণে রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা কমতে পারে।

শুধু ঘরের বাতিই নয়, ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় ফোন, ট্যাব কিংবা অন্য গ্যাজেটের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকাও ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বিশেষ করে স্ক্রিনের নীল আলো মেলাটোনিনের উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই ঘুমানোর আগে কিছুটা সময় স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা, ঘরের আলো কমিয়ে আনা এবং শরীরকে ধীরে ধীরে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করা ভালো অভ্যাস।

ভালো ঘুমের পরিবেশ তৈরি করতে খুব জটিল কোনো ব্যবস্থা দরকার নেই। ঘর যেন আরামদায়ক তাপমাত্রায় থাকে, বাতাস চলাচল করে, অপ্রয়োজনীয় শব্দ কম থাকে এবং আলো যতটা সম্ভব কম হয়। এই কয়েকটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে ঘুমের মাস্ক ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ঘুমানোর জন্য সবচেয়ে ভালো পরিবেশ তৈরি হয় যখন শরীর বুঝতে পারে, এখন সত্যিই বিশ্রামের সময়। দিন শেষে ভালো ঘুম মানে শুধু সাত-আট ঘণ্টা বিছানায় থাকা নয়। সেই সময়টুকু কতটা নিরবচ্ছিন্ন ও আরামদায়ক ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই আজ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে একবার নিজের ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখুন। বেডসাইড ল্যাম্পটি কি সত্যিই জ্বালিয়ে রাখা দরকার? টেলিভিশন কি চলছে? ফোনের আলো কি এখনও চোখে পড়ছে?
ছোট এই অভ্যাসগুলো বদলে ঘুমের পরিবেশকে একটু অন্ধকার, শান্ত ও আরামদায়ক করে তোলা যেতে পারে। আর সুস্থ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অনেক সময় এমন ছোট পরিবর্তনই বড় পার্থক্য তৈরি করে।
তথ্যসূত্র: হেলথলাইন
ছবি: এআই