ওটস বনাম যবের ছাতু: কোনটি বেশি পুষ্টিকর
শেয়ার করুন
ফলো করুন

আজকাল আমাদের খাওয়ার ধরন অনেক বদলে গেছে। নানা বিদেশি খাবার এখন সহজলভ্য এবং আমরা প্রায়ই প্রয়োজন না থাকলেও এগুলো খাই-এটা যেন একপ্রকার বিলাসী যাপনের ট্রেন্ড। অনেকেই দামি খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলেন, ‘আমি কিন্তু দামি জিনিস খাই!’

তেমনি একটি বিদেশি খাবার হলো ওটস, যা বহুজাতিক কোম্পানির কারখানায় তৈরি হয়ে ঝলমলে মোড়কে বাজারে আসে। ওটস খাওয়া খারাপ কিছু নয়, কিন্তু এটা আসলে একটা প্রসেসড ফুড, অর্থাৎ কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা খাবার। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব শরীরে কেমন হয়, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে আমাদের দেশীয় ও প্রাকৃতিক খাবার যবের ছাতু অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর বিকল্প। যদিও ওটসের পুষ্টিগুণের তথ্য আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়, তবুও দেশজ ছাতুর গুণ কিছু কম নয়। বরং যদি আমরা আমাদের দেশীয় খাদ্যচক্রের ভেতর থাকতে পারি, তাহলে শরীর, মন ও মেজাজ-সবকিছুই সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে।

ওটস আর ছাতুর তুলনামূলক পৃষ্টি
ওটস আর ছাতুর তুলনামূলক পৃষ্টি

আমি প্রথমে একটা টেবিলে মূল পুষ্টিগুণ তুলনা করেছি (প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনো অবস্থায়)।

বিজ্ঞাপন

ওটসের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা

উচ্চ প্রোটিন ও মিনারেল: প্রোটিন (১৬.৯ গ্রাম): উচ্চ প্রোটিন ভেগান বা ওয়ার্কআউট ডায়েটে আদর্শ। এটি পেশি মেরামত ও বৃদ্ধিতে সহায়ক। উদাহরণ: একজন গড় প্রাপ্তবয়স্কের জন্য ১০০ গ্রাম ওটস প্রায় ৩৫ শতাংশ দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করে।

ওটস এলডিএল কোলেস্টেরল কমায়
ওটস এলডিএল কোলেস্টেরল কমায়

মিনারেলস (আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, জিঙ্ক, ম্যাঙ্গানিজ): আয়রন রক্তাল্পতা প্রতিরোধ করে; ম্যাগনেসিয়াম নার্ভের কার্যকারিতা ও হাড়ের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে সহায়ক; ফসফরাস হাড় ও দাঁত শক্ত করে। ম্যাঙ্গানিজ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।
 ভিটামিন বি কমপ্লেক্স: ফলেট (৫৬µg) গর্ভাবস্থায় নিউরাল টিউব ডিফেক্ট প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। বিওয়ান (থায়ামিন) এনার্জি মেটাবলিজম বাড়ায়।
 স্বাস্থ্যকর ফ্যাট: ওটসে অসম্পৃক্ত ফ্যাট (মোনোস্যাচুরেটেড ও পলিস্যাচুরেটেড) থাকে, যা এলডিএল কোলেস্টেরল কমায় এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।
  বিটাগ্লুকান: ওটসে থাকা বিটাগ্লুকান দ্রবণীয় ফাইবার কোলেস্টেরল শোষণ কমায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এটি হৃদ্‌রোগ ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সহায়ক।
 অপকারিতা:
 উচ্চ ক্যালরি: ৩৮৯ কিলোক্যালরি/১০০ গ্রাম ওজন বাড়াতে পারে যদি অতিরিক্ত খাওয়া হয়।
 গ্লুটেন সংবেদনশীলতা: যদিও ওটস গ্লুটেন মুক্ত, কিন্তু প্রক্রিয়াজত করার সময় গ্লুটেন মিশে যেতে পারে। সিলিয়াক রোগীদের জন্য সার্টিফায়েড গ্লুটেন ফ্রি ওটস বেছে নিতে হবে।
 ফাইবার কম: যবের ছাতুর তুলনায় ফাইবার কম, তাই হজমে কম কার্যকর।
 অতিরিক্ত খেলে ফোলাভাব: ফাইবার ও ফ্যাট বেশি হওয়ায় অতিরিক্ত খেলে পেট ফাঁপতে পারে।

 যবের ছাতুর পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা

ফাইবার বেশি, কিন্তু ক্যালরি কম
ফাইবার বেশি, কিন্তু ক্যালরি কম

 উচ্চ ফাইবার ও কম ক্যালরি: ফাইবার (১৭.৩ গ্রাম): উচ্চ ফাইবার (বিশেষত অদ্রবণীয়) হজমশক্তি বাড়ায়, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা করে। এটা ওজন কমানোর জন্য আদর্শ কারণ এটা খেলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে। কম ক্যালরি (৩৫৪ কিলোক্যালরি): ওটসের তুলনায় কম ক্যালরি, তাই লো-ক্যালরি ডায়েটে উপযোগী।
 কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই ২৮-৩৫): জবের ছাতু রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায়, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আদর্শ। এটি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায়। যার কারণে যবের ছাতুকে স্লো ফুড বলা হয়।
 মিনারেলস: পটাশিয়াম (৪৫২ মিগ্রা): রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। সেলেনিয়াম (৩৭.৭ µg) অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে ক্যানসার ও বার্ধক্য প্রতিরোধে কার্যকর।  ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়াম হাড় ও হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য উপকারী।
কুলিং এফেক্ট: যবের ছাতু গ্রীষ্মে শরীর ঠান্ডা রাখে, তাই ভারতীয় উপমহাদেশে জনপ্রিয় (যেমন ছাতু শরবত)।
 ব্যবহারিক সুবিধা: জবের ছাতু সাশ্রয়ী, সহজে পাওয়া যায় এবং বহুমুখী ব্যবহার উপযোগী। এটি শরবত, রুটি, পোরিজ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। রোস্টিংয়ের কারণে স্বাদ ভালো এবং হজম সহজ।
 
অপকারিতা
 কম প্রোটিন (১২.৫ গ্রাম): ভেগান বা উচ্চ প্রোটিন ডায়েটে অতিরিক্ত প্রোটিন সোর্স (যেমন ডাল) লাগবে।
মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের অভাব: ফলেট, ভিটামিন বিওয়ান, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম কম, তাই দীর্ঘমেয়াদে শুধু ছাতুতে নির্ভর করলে পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে।
 হজম সমস্যা: অতিরিক্ত খেলে বা সঠিকভাবে রান্না না করলে গ্যাস বা ফোলাভাব হতে পারে।
 অ্যালার্জি: কিছু মানুষের জবের প্রোটিনে অ্যালার্জি থাকতে পারে।

সামগ্রিক বিশ্লেষণ

কোনটা ভালো, তা নির্ভর করে কিসের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর। ওজন কমানো বা হজমের জন্য যবের ছাতু ভালো (উচ্চ ফাইবার, কম ক্যালরি)।  প্রোটিনরিচ ব্রেকফাস্ট বা ওয়ার্কআউটের জন্য ওটস (উচ্চ প্রোটিন, মিনারেল) ভালো। দুটিই হার্টের স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। এ ছাড়া কোলেস্টেরল কমায় এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে।
দৈনিক খাবারে যবের ছাতুকে প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে। তবে মাঝেমধ্যে ওটস খেতে পারেন। পুষ্টির কথা চিন্তা করে যব হতে পারে আমাদের জন্য একটি আদর্শ ও নিরাপদ খাবার। দেশজ খাবার সব সময় আপনার জন্য ভালো।
লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ, প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র

ছবি: পেকজেলসডটকম ও সামাজিক মাধ্যম

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন