
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, নিয়মিত অন্যদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খাওয়ার অভ্যাস বিষণ্নতার ঝুঁকি কমাতে, সামাজিক সংযোগ বাড়াতে এবং দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
অন্যদের সঙ্গে বসে খাওয়ার এই অভ্যাসের একটি বিশেষ নামও আছে ‘কমেনসালিটি’। সহজ করে বললে, একসঙ্গে খাবার খাওয়া ও ভাগ করে নেওয়া।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জান-এমানুয়েল দে নেভে মনে করেন, এক টেবিলে বসে খাবার ভাগ করে নেওয়া মানুষের মধ্যে বন্ধন, বিশ্বাস ও সংযোগ তৈরির একটি প্রাচীন উপায়। অর্থাৎ, আমরা যখন একসঙ্গে খাই, তখন শুধু খাবারই ভাগ করি না; গল্প, অনুভূতি, হাসি এবং সময়ও ভাগ করে নিই।
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় এই অভ্যাস অবশ্য অনেকটাই কমে এসেছে। একই বাড়িতে থেকেও অনেকে আলাদা সময়ে খাচ্ছেন, কেউ ফোন হাতে একা ডিনার করছেন, আবার কারও দুপুরের খাবারটাও হয়ে যাচ্ছে ডেস্কের সামনে বসেই।

একসঙ্গে খাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি হতে পারে মানসিক স্বাস্থ্যে। চীনের ঝেজিয়াং প্রভিন্সিয়াল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের একটি গবেষণায় ৬০ বছরের বেশি বয়সী ৯ হাজারেরও বেশি নারীকে নিয়ে দেখা হয়, খাবারের টেবিলে কতজন মানুষ একসঙ্গে বসেন এবং তাদের বিষণ্নতার ঝুঁকির মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না। সেখানে দেখা যায়, টেবিলে একসঙ্গে খাওয়ার মানুষের সংখ্যা মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সম্পর্কিত।
আরেকটি জাপানি গবেষণায় ৬৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সী এমন মানুষদের দেখা হয়, যারা পরিবারের সঙ্গে থাকেন কিন্তু প্রায়ই একা খাবার খান। দেখা যায়, নিয়মিত অন্যদের সঙ্গে খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় একা খাওয়া ব্যক্তিদের বিষণ্নতার উপসর্গ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে একা খেলেই বিষণ্নতা হবে। বরং নিয়মিত একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস সম্ভবত মানুষের সামাজিক যোগাযোগ ও মানসিক সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একসঙ্গে খাওয়ার আরেকটি মজার দিক হলো, সঙ্গী থাকলে খাবার আরও উপভোগ্য লাগতে পারে।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এরিকা বুথবির নেতৃত্বে কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, অন্য কারও সঙ্গে বসে চকোলেট খেলে মানুষ সেটিকে একা খাওয়ার তুলনায় বেশি সুস্বাদু মনে করতে পারেন।
এর পেছনে সামাজিক যোগাযোগের আনন্দ বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ, একই খাবার হলেও পরিবেশ ও সঙ্গ বদলে দিলে খাওয়ার অভিজ্ঞতাও বদলে যেতে পারে।

একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাসের সঙ্গে মস্তিষ্কের সুস্থতারও যোগ থাকতে পারে। ২০২৫ সালের একটি জাপানি গবেষণায় দেখা যায়, যারা নিয়মিত একা খাবার খান, তাদের মস্তিষ্কের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশে তুলনামূলক কম আয়তন দেখা গেছে। এর মধ্যে ছিল কগনিটিভ বা চিন্তাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু অঞ্চল এবং হিপোক্যাম্পাস, যা স্মৃতি ও শেখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকেরা অবশ্য সরাসরি বলেননি যে একা খাওয়াই মস্তিষ্কের আকার কমিয়ে দেয়। কারণ যারা একা খান, তাদের খাদ্যাভ্যাসেও কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। তবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বেশি স্ট্রেস এবং কম মানসিক উদ্দীপনাও দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খাবারের টেবিলে গল্প করা, অন্যের কথা শোনা, হাসাহাসি কিংবা দিনের নানা ঘটনা নিয়ে আলোচনা, এসবই মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখার এক ধরনের সামাজিক অনুশীলন হতে পারে।

খাবারের সঙ্গে মানুষের সামাজিক সম্পর্কের ইতিহাস অনেক পুরোনো। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে একসঙ্গে খাওয়াকে বন্ধুত্ব, পরিবার ও সম্প্রদায়ের বন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়।
ইতালিতে যেমন খাবার শুধু খাওয়ার বিষয় নয়; রান্না করা, খাবার সাজানো এবং একসঙ্গে টেবিলে বসাও সংস্কৃতির অংশ। দেশটির ‘স্লো ফুড মুভমেন্ট’-ও দ্রুত খাবারের সংস্কৃতির বিপরীতে ধীরস্থিরভাবে রান্না ও একসঙ্গে খাওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে।
অর্থাৎ, খাবারের আনন্দ শুধু প্লেটে কী আছে, তার ওপর নির্ভর করে না। প্লেটের চারপাশে কারা বসেছেন, সেটিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
সবসময় পরিবারের সদস্য বা কাছের বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়া সম্ভব নয়। অনেকেই একা থাকেন, কেউ কাজের কারণে ব্যস্ত, আবার কারও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ কম।
তবু সপ্তাহে কয়েকটি খাবার অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। সহকর্মীর সঙ্গে লাঞ্চ, বন্ধুর সঙ্গে কফি ও স্ন্যাকস, কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দিনের অন্তত একটি খাবার, ছোট উদ্যোগও সামাজিক সংযোগ তৈরি করতে পারে।
এমনকি পরিচিত কাউকে খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিও যতটা কঠিন মনে হয়, বাস্তবে হয়তো ততটা নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আমরা প্রায়ই ধরে নিই অন্যরা আমাদের সঙ্গে সময় কাটাতে খুব একটা আগ্রহী নন। অথচ বাস্তবে তারা হয়তো একটি সাধারণ আমন্ত্রণের অপেক্ষাতেই থাকেন।

দিনের ব্যস্ততা, ফোন, কাজ আর নানা চিন্তার মধ্যে একটি অভ্যাস খুব সহজেই ফিরিয়ে আনা যায় ‘একসঙ্গে খাওয়া’।
প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে কয়েকবার ফোন দূরে রেখে, টিভি বন্ধ করে, তাড়াহুড়ো না করে কারও সঙ্গে বসে খাবার খাওয়া যেতে পারে। এতে শুধু খাবারের স্বাদই নয়, কথোপকথনের সুযোগও বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন মানেই শুধু কী খাচ্ছেন, কত ক্যালরি খাচ্ছেন বা কতক্ষণ ব্যায়াম করছেন, তা নয়। কার সঙ্গে বসে খাচ্ছেন, সেটিও আপনার ভালো থাকার গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।