
একসময় বয়ঃসন্ধি মানেই ছিল কৈশোরের শুরু। কিন্তু এখন অনেক শিশুর শরীরে সেই পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে আরও কম বয়সে। এসব পরিবর্তন কখনো কখনো বাবা-মাকে অপ্রস্তুত করে দিচ্ছে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সাধারণত বয়ঃসন্ধি শুরু হতো কৈশোরের শেষ দিকে। ১৯৬০-এর দশকে ছেলেদের বয়ঃসন্ধি শুরুর গড় বয়স ছিল ১৫ বছর। বর্তমানে বয়ঃসন্ধি শুরুর গড় বয়স আরও কমে এসেছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে ৮ থেকে ৯ বছর এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ৯ থেকে ১০ বছর। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৮০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত বিভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণির মেয়েদের প্রথম মাসিক শুরু হওয়ার গড় বয়স প্রতি দশকে প্রায় চার মাস করে কমেছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মেয়েদের ক্ষেত্রে ৮ বছর এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ৯ বছরের আগে বয়ঃসন্ধির শারীরিক পরিবর্তন শুরু হলে তাকে অকাল বয়ঃসন্ধি বলা হয়। এখন প্রশ্ন উঠছে, কেন এমন হচ্ছে? গবেষণা ও চিকিৎসাবিষয়ক তথ্য বলছে, এর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। জিনগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি শিশুর ওজন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, ঘুম, মানসিক চাপ এবং পরিবেশে থাকা কিছু রাসায়নিকও বয়ঃসন্ধির সময়কে প্রভাবিত করতে পারে।
অতিরিক্ত ওজনের ভূমিকা
অল্প বয়সে বয়ঃসন্ধি শুরু হওয়ার সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন ও শরীরে চর্বি জমার একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বেশি দেখা যায়।
শরীরে চর্বির পরিমাণ বাড়লে ‘লেপটিন’ নামের একটি হরমোনের মাত্রাও বাড়ে। এই হরমোন মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসকে শরীরের পরিপক্বতার বিষয়ে সংকেত দিতে পারে।

ফলে বয়ঃসন্ধির প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে আগেই শুরু হতে পারে। অতিরিক্ত ওজনের মেয়েদের ক্ষেত্রে ১২ বছর বয়সের আগেই শারীরিক বিকাশ ও মাসিক শুরু হওয়ার ঝুঁকি বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। ছেলেদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার সঙ্গে অল্প বয়সে অণ্ডকোষের বৃদ্ধি ও যৌনাঙ্গের আশপাশে লোম গজানোর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
খাবারের প্লেটেও থাকতে পারে সমস্যা
শিশুর খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। ফাস্টফুড, ভাজাপোড়া, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনিযুক্ত পানীয় নিয়মিত খেলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমে ওজন বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বিপাকীয় স্বাস্থ্য ও হরমোনের ভারসাম্যে।

আবার দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা সকালের নাশতা বাদ দেওয়ার পর একসঙ্গে বেশি খাবার খাওয়ার অভ্যাসও শরীরে চর্বি জমার ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। কিছু খাবারে থাকা ফাইটোইস্ট্রোজেন ও বিভিন্ন খাদ্যসংযোজক শরীরের প্রাকৃতিক হরমোনের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে—যদিও এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
স্ক্রিনের আলো, কম ঘুম
স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও কম্পিউটারের ব্যবহার এখন শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। বিশেষ করে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে নীল আলোর সংস্পর্শ বাড়ে।

কৃত্রিম আলো ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোন মেলাটোনিনের নিঃসরণে প্রভাব ফেলতে পারে। ঘুমের ঘাটতি ও অনিয়মিত ঘুম শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক ছন্দেও প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেলিভিশন দেখা বা কম্পিউটার ব্যবহারের ফলে শারীরিক পরিশ্রম কমে যায়, যা ওজন বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
চারপাশের রাসায়নিকের প্রভাব
শিশুরা প্রতিদিন যেসব জিনিস ব্যবহার করে, সেখান থেকেও কিছু রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসতে পারে। প্লাস্টিক, প্রসাধনী, সুগন্ধি, ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রী ও খাবারের প্যাকেজিংয়ে থ্যালেট, প্যারাবেন ও বিসফেনল (বিপিএ)-এর মতো রাসায়নিক পাওয়া যেতে পারে।

এসবকে বলা হয় ‘এন্ডোক্রাইন-ডিসরাপ্টিং কেমিক্যাল’ বা হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা দিতে পারে এমন রাসায়নিক। কিছু গবেষণায় এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শের সঙ্গে বয়ঃসন্ধির সময় পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে কোন রাসায়নিক কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
মানসিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ
শিশুর দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপও শরীরের হরমোনগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। পারিবারিক অস্থিরতা, আর্থসামাজিক চাপ কিংবা বন্ধু ও সমবয়সীদের চাপ থাকে এখন অনেক বেশি। এমন বিভিন্ন কারণে শিশুর মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে।

মানসিক চাপের সময় অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে বিভিন্ন হরমোন নিঃসৃত হয়। এসব পরিবর্তন শরীরের স্বাভাবিক হরমোনগত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

সাধারণভাবে, বয়ঃসন্ধির সময় কিছুটা আগে-পরে হওয়া সব সময় অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ৮ বছরের আগে মেয়েদের বা ৯ বছরের আগে ছেলেদের শরীরে বয়ঃসন্ধির লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ অকাল বয়ঃসন্ধি আপনার শিশুকে শারীরিক ও মানসিক নানা প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিতে পারে। আর অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন সমস্যাও তৈরি হতে পারে এতে।
সূত্র: ভেরি ওয়েল ফিট, হেলথলাইন
ছবি: পেকজেলস, এআই