রোজায় যেভাবে নিজেকে সতেজ ও সুস্থ রাখবেন
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ রোজা। রোজা মানুষকে শারীরিক, মানসিক ও আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ করে। অথচ আমরা এই ইবাদতকে খাবারের মাস মনে করে বেহুঁশ হয়ে খেয়ে যাই। সাধারণত আমরা রোজা রেখে যখন পানিশূন্যতায় থাকি, তখন অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার খেয়ে সেই পানিশূন্যতার বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করি। উপরন্তু এ সময়ে আমরা সাধারণ সময়ের চেয়ে বেশি খেয়ে রোজার ধর্মীয় আদেশ অনুসরণও করি না। অথচ নির্দেশ আছে, রোজা রাখলে শরীর পরিশুদ্ধ হয়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে উল্টোটি ঘটে।

রোজা রাখার আছে নানা সুফল
রোজা রাখার আছে নানা সুফল

দীর্ঘ সময় রোজা (যেমন পবিত্র রমজানের ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টার ফাস্টিং) রাখার সময় শরীরকে সুস্থ ও ফিট রাখতে সঠিক খাবার নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি। বৈজ্ঞানিক গবেষণা (যেমন ব্রিটিশ নিউট্রিশন ফাউন্ডেশন ও পিএমসির স্টাডি) দেখায় যে, সুষম খাবার খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে, পানিশূন্যতা এড়ানো যায়, পেশি ভাঙন কমে এবং শক্তি ধরে রাখা যায়।

বিজ্ঞাপন

রোজা রাখার উপকারিতা

• ওজন ও চর্বি কমে এবং বেশির ভাগ মানুষের ওজন শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৫ কেজি কমে (বিশেষ করে পেটের চর্বি)। এটি ক্যালরি কম খাওয়ার কারণে ঘটে।
• ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ে, রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ ভালো হয়, টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে।
• লিপিড প্রোফাইল উন্নত হয়। অনেক স্টাডিতে দেখা গেছে, এলডিএল (খারাপ কোলেস্টেরল) ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমে, এইচডিএল (ভালো কোলেস্টেরল) বাড়ে।
• রক্তচাপ কমে। গবেষণায় (যেমন আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের স্টাডি) রমজানে রক্তচাপ কমার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
• প্রদাহ কমে, আইএল–৬, টিএনএফ–জাতীয় প্রদাহজনক উপাদান কমে, হৃদ্‌রোগ, মেটাবলিক সিনড্রোমের ঝুঁকি কমে।
• অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমে, অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট সিস্টেম শক্তিশালী হয়।
• অটোফেজি প্রক্রিয়া চালু হয়, শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত কোষ পরিষ্কার হয় (এটি নোবেল বিজয়ী গবেষণার বিষয়)।
• ইমিউন সিস্টেমের উন্নতি। অনেক রিভিউয়ে বলা হয়েছে, রোজা ইমিউন ফাংশনের জন্য উপকারী।
• কিছু ক্যানসারের মেটাবলিক রিস্ক স্কোর কমে (যেমন লাং, কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকিসংক্রান্ত মার্কার)।
রোজায় এমন উপকারিতা সত্ত্বেও আমরা সেটা নিতে পারি না শুধু ভুল খাবারের কারণে। ইফতারে বেশুমার ভাজাপোড়া ও প্রসেসড ফুডের বাহার, সাহ্‌রিতে সুষম খাদ্যের অভাবের কারণে ভালো হওয়ার চেয়ে স্বাস্থ্য খারাপের দিকে যেতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

কেমন হওয়া উচিত রোজা রেখে ইফতারি

ফল ও সালাদ খাওয়া উত্তম
ফল ও সালাদ খাওয়া উত্তম

রোজা ভাঙার পর শরীর সংবেদনশীল থাকে, তাই হালকা ও পুষ্টিকর খাবার দিয়ে শুরু করুন। এতে রক্তে শর্করা দ্রুত স্থিতিশীল হয় এবং পেট খারাপ হয় না। যেমন
• তিন থেকে পাঁচটি খেজুরের সঙ্গে এক গ্লাস পানি (প্রথমে): খেজুরে প্রাকৃতিক ফ্রুক্টোজ ও পটাশিয়াম থাকে, যা দ্রুত শক্তি দেয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল করে। পটাশিয়াম ইলেকট্রোলাইট ব্যালান্স করে ক্লান্তি কমায়।
• ফল ও সালাদ (কলা, আপেল, পেঁপে, শসা–টমেটো সালাদ): উচ্চ পানি ও ফাইবারযুক্ত ফল পানিশূন্যতা পূরণ করে এবং ফাইবার হজম ভালো রাখে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
• সবজি স্যুপ বা মসুর ডালের স্যুপ: হালকা খাবার পেট ভরায় ধীরে ধীরে, পুষ্টি দেয় এবং হাইড্রেশন বাড়ায়।
• প্রোটিন গ্রিলড মুরগি বা মাছ, সেদ্ধ ছোলা, দই বা ডিম: প্রোটিন পেশি রক্ষা করে এবং দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তি দেয়। রোজায় প্রোটিন খেলে মেটাবলিজম ভালো থাকে।
• কমপ্লেক্স কার্ব: যবের ছাতু, ওটস: স্লো রিলিজ কার্বোহাইড্রেট রক্তে শর্করা স্থিতিশীল রাখে এবং পরের দিনের জন্য শক্তি জমা করে।

সাহ্‌রিতে কেমন খাওয়া উচিত

দুধ বা দই দিয়ে ওটস কেবল উপাদেয়ই নয়, কার্যকরও
দুধ বা দই দিয়ে ওটস কেবল উপাদেয়ই নয়, কার্যকরও

সাহ্‌রি সারা দিনের জ্বালানি। এ সময়ে ফাইবার ও প্রোটিন–সমৃদ্ধ খাবার খান, যাতে সারা দিন ক্ষুধা না লাগে।
• সবজি–ভাত সবচেয়ে উত্তম: ভাত এক অংশ আর তিন অংশ মিক্সড সবজি (এখন শীতের হরেক রকম সবজি আছে, যা খুবই ভালো।
• ওটস বা সিরিয়াল: দুধ বা দইয়ের সঙ্গে ওটস, ফল কমপ্লেক্স কার্ব ও ফাইবার ধীরে শক্তি দেয় এবং রক্তে শর্করা বৃদ্ধি প্রতিরোধ করে।
• প্রোটিন: সেদ্ধ ডিম, টক দই বা পনির প্রোটিন স্যাটায়েটি বাড়ায় এবং পেশির ভাঙন রোধ করে। রোজায় প্রোটিন খেলে শক্তি ধরে রাখা সহজ হয়।
• স্বাস্থ্যকর ফ্যাট: বাদাম (আলমন্ড, কাজু), চিয়াসিড বা অলিভ অয়েল হেলদি ফ্যাট দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তি দেয় এবং হরমোন ব্যালান্স করে।

যা মানতে হবে

• ধীরে ধীরে খান, অতিরিক্ত খাবেন না।
• প্রচুর পানি (দিনে ২–৩ লিটার) এবং ইলেকট্রোলাইট–সমৃদ্ধ খাবার খান।
• সাহ্‌রি না খেয়ে রোজা রাখবেন না, এটি সারা দিনের ভিত্তি।
• ভাজা, অতিরিক্ত মিষ্টি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন (এগুলো তৃষ্ণা বাড়ায় এবং হজমে ব্যাঘাত ঘটায়)।

রোজায় ডাবের পানি অনেক উপকারি
রোজায় ডাবের পানি অনেক উপকারি

রোজায় পানিশূন্যতা সবচেয়ে বড় সমস্যা

• পানি: ইফতার থেকে সাহ্‌রি পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ গ্লাস।
• পানীয়: ডাবের পানি, লেবু–মধু পানি, ফলের শরবত (চিনি ছাড়া)।
• ফল: শসা, আঙুর (৯০ শতাংশ + পানি)।
পানি ও ইলেকট্রোলাইট (পটাশিয়াম ও সোডিয়াম) শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং কিডনির কার্যকারিতা ঠিক রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত পানি খেলে রোজায় ক্লান্তি ৫০ শতাংশ কমে।
এড়িয়ে চলুন
• ভাজা বা তেলযুক্ত: বেগুনি, পাকোড়া, ফ্রাই—এগুলো পেট গরম করে এবং তৃষ্ণা বাড়ায়।
• অতিরিক্ত মিষ্টি: রসগোল্লা ও মিষ্টি দই রক্তে শর্করা স্পাইক করে পরে ক্র্যাশ হয়।
• ক্যাফেইন: চা–কফি অতিরিক্ত ডিহাইড্রেট করে।
• লবণাক্ত: চিপস ও আচার তৃষ্ণা বাড়ায়।
প্রত্যেক মানুষের গঠন ভিন্ন থাকে, রোগ অনুযায়ী খাবারের ভিন্নতা হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা ক্রনিক রোগ নিয়ে আছেন, তাঁদের নানা ধরনের ওষুধ সেবন করতে হয়। তাই যাঁর যাঁর দেহের প্রয়োজন অনুযায়ী একটা ডায়েট প্ল্যান রাখুন। এই প্ল্যান অনুসরণ করলে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে, শক্তি বাড়বে এবং রোজা সহজ হবে। ভালোভাবে রোজা রাখুন। সুস্থ থাকুন!
লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র

ছবি: পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন