
ওজন কমাতে আমরা সাধারণত খাবারের তালিকা বদলাই, জিমে যাই কিংবা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক পদক্ষেপ হাঁটার লক্ষ্য ঠিক করি। কিন্তু এসবের মাঝেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে পর্যাপ্ত ঘুম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। নিয়মিত ছয় ঘণ্টার কম ঘুম হলে শরীর শুধু ক্লান্তই হয় না, ভেতরে ভেতরে এমন কিছু হরমোনগত পরিবর্তন শুরু হয়, যা ওজন বাড়িয়ে দিতে পারে।

চিকিৎসকদের ভাষায়, ঘুমের অভাব শুধু জীবনযাপনের সমস্যা নয়; এটি একটি বিপাকীয় সমস্যাও।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে ‘কর্টিসল’ বা মানসিক চাপের হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই হরমোন শরীরকে বিশেষ করে পেটের চারপাশে চর্বি জমাতে উৎসাহিত করে। একই সঙ্গে রক্তে শর্করার মাত্রাও বাড়তে শুরু করে।
ফলে শরীর এমন এক অবস্থায় পৌঁছে যায়, যেখানে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে।

কম ঘুমের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনে। ‘ঘ্রেলিন’, যা ক্ষুধার অনুভূতি বাড়ায়, তার মাত্রা বেড়ে যায়। অন্যদিকে ‘লেপটিন’, যা মস্তিষ্ককে জানায় পেট ভরে গেছে, তার পরিমাণ কমে যায়।
ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠেই বেশি ক্ষুধা লাগে। স্বাস্থ্যকর খাবারের বদলে বিস্কুট, মিষ্টি চা, ভাজাপোড়া বা কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে অতিরিক্ত ক্যালরি শরীরে জমে ওজন বাড়তে শুরু করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুমের অভাব ইনসুলিনের কার্যকারিতাও কমিয়ে দেয়। তখন অগ্ন্যাশয়কে আরও বেশি ইনসুলিন তৈরি করতে হয়।
দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে দেখা দিতে পারে–
* ফ্যাটি লিভার
* টাইপ-২ ডায়াবেটিস
* ইনসুলিন প্রতিরোধ
* পেটের মেদ বৃদ্ধি
* বিপাকীয় নানা জটিলতা
অর্থাৎ, নিয়মিত কম ঘুম শুধু ওজনই বাড়ায় না, ভবিষ্যতের নানা অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।

ঘুমের অভাব শরীরের প্রজনন হরমোনের ওপরও প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের অনিয়ম দেখা দিতে পারে। আর পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গিয়ে ক্লান্তি, শক্তি হ্রাস ও কর্মক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

গভীর ঘুমের সময় শরীর পেশি মেরামত ও সংরক্ষণের কাজ করে। কিন্তু নিয়মিত ঘুম কম হলে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে ধীরে ধীরে পেশির পরিমাণ কমতে পারে। পেশি কমে গেলে শরীর রক্তের গ্লুকোজ ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না, যা ভবিষ্যতে বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকি আরও বাড়ায়।

অনেকেই ভাবেন, সপ্তাহজুড়ে কম ঘুম হলেও ছুটির দিনে বেশি ঘুমিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। সপ্তাহান্তের অতিরিক্ত ঘুম সাময়িক ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করলেও দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতির সব ক্ষতি পূরণ করতে পারে না।

সুস্থ জীবনযাপনের তিনটি প্রধান ভিত্তি হলো সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুম। চিকিৎসকদের পরামর্শ, যদি নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পরও ওজন না কমে, তাহলে নিজের ঘুমের সময় ও মানের দিকে নজর দিন।
ফিটনেস শুধু জিমে কাটানো সময়ের ওপর নির্ভর করে না। প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম আপনার শরীরকে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে, হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সুস্থ, ফিট ও প্রাণবন্ত থাকতে খাবার আর ব্যায়ামের পাশাপাশি ঘুমকেও দিন সমান গুরুত্ব।
সূত্র: হেলথলাইন
ছবি: এআই