
অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার ক্ষতি নিয়ে বহু বছর ধরেই কথা হচ্ছে। আপনি সচেতন হয়ে ভাতের পাতে বা টক ফলের সঙ্গে আলগা লবণ খাওয়া বন্ধও করে দিয়েছেন। কিন্তু তারপরেও আপনি আছেন ঝুঁকিতে। তার কারণ চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলসসহ সকল প্রসেসড জাংক ফুডে থাকা লুকানো লবণ স্বাদকোরকে তৃপ্তি দিলেও হৃদযন্ত্র থেকে কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে। এ কারণেই মূলত দেশে প্রতিবছর ২৪০০০ হাজার মানুষ মারা যায়।

সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে কিংবা কাজের ফাঁকে যখনই আমাদের মস্তিষ্ক খাবারের বিষয়ে সংকেত দেয়, তখনই আমরা হাত বাড়াই কোনো না কোনো স্ন্যাকসের দিকে। বিশেষ করে রাত জাগা, ওয়েব সিরিজ দেখা বা কাজ করতে করতে হুটহাট বিঞ্জ ইটিং এখন অনেকেরই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আর সেই তালিকায় সবচেয়ে বেশি থাকে রঙিন প্যাকেটের মুখরোচক ঝালমুড়ি, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, স্যুপ, বিস্কুট কিংবা এক প্যাকেট ক্রিসপি চিপস।
স্বাদে তৃপ্তি দিলেও এসব প্রক্রিয়াজাত খাবারের ভেতরে লুকিয়ে থাকে অতিরিক্ত লবণ, সোডিয়াম, ট্রান্স ফ্যাট এবং নানা ধরনের প্রিজারভেটিভ, যা ধীরে ধীরে শরীরের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত লবণ শরীরে পানি ধরে রাখে, রক্তচাপ বাড়ায় এবং হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন এমন খাদ্যাভ্যাস চলতে থাকলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা এবং স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯ গ্রাম লবণ গ্রহণ করেন। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী একজন মানুষের দৈনিক ৫ গ্রামের বেশি লবণ খাওয়া উচিত নয়। অথচ প্রয়োজনের প্রায় দ্বিগুণ লবণ আমাদের শরীরে প্রবেশ করে।বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে উঠে আসে ঝালমুড়ি, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, স্যুপ, বিস্কুট, চিপসের মতো লবণযুক্ত খাবারের কারণেই দেশে প্রতিবছর ২৪ হাজার মানুষ মারা যায়।
কেন অতিরিক্ত লবণ বিপজ্জনক?
অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে পানি ধরে রাখে। এতে রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং হৃদযন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে দেখা দিতে পারে—
উচ্চ রক্তচাপ
হৃদরোগ
স্ট্রোক

কিডনি জটিলতা
পানি জমে যাওয়া
হাড় ক্ষয় হওয়ার ঝুঁকি
চিকিৎসকদের মতে, উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় “সাইলেন্ট কিলার” কারণ অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি শরীরের ক্ষতি করতে থাকে।
কোন খাবারে লুকিয়ে থাকে অতিরিক্ত লবণ?
আমরা অনেকেই মনে করি শুধু রান্নার লবণই ক্ষতিকর। কিন্তু বাস্তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি আসে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার থেকে। যেমন— চিপস,চানাচুর,ইনস্ট্যান্ট নুডলস,স্যুপ পাউডার,বিস্কুট,ফাস্টফুড, সস, কেচাপ ও ফ্রোজেন খাবার। এসব খাবারে শুধু লবণ নয়, থাকে অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট ও প্রিজারভেটিভও, যা হৃদরোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।স্বাদে তৃপ্তি দিলেও এসব প্রক্রিয়াজাত খাবারের ভেতরে লুকিয়ে থাকে অতিরিক্ত লবণ, সোডিয়াম, ট্রান্স ফ্যাট এবং নানা ধরনের প্রিজারভেটিভ, যা ধীরে ধীরে শরীরের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না ঠিক কতটা লবণ প্রতিদিন শরীরে প্রবেশ করছে। কারণ শুধু রান্নার লবণ নয়, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস ও ইনস্ট্যান্ট খাবারেও থাকে বিপজ্জনক মাত্রার সোডিয়াম। রাতের ক্ষণিকের “কমফোর্ট ফুড” ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে তৈরি করতে পারে নীরব ক্ষয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। বর্তমানে শিশুদের মধ্যেও চিপস ও প্যাকেটজাত স্ন্যাকস খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ছোটবেলা থেকেই অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার অভ্যাস ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের খাবারে স্বাভাবিক ও কম লবণযুক্ত খাবারের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
কীভাবে কমাবেন লবণ?
স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য কিছু ছোট পরিবর্তনই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
১. প্যাকেটজাত খাবার কম খান। প্রতিদিনের স্ন্যাকস হিসেবে ফল, বাদাম বা ঘরে তৈরি খাবার বেছে নিন।
২. খাবারের লেবেল পড়ুন সোডিয়াম-এর পরিমাণ দেখে খাবার কিনুন।

৩. বাড়তি লবণ খাওয়া বন্ধ করুন। অনেকে খাবারের উপর আলাদা করে লবণ ছড়িয়ে খান। এই অভ্যাস ধীরে ধীরে কমাতে হবে।
৪. বেশি পানি পান করুন। পর্যাপ্ত পানি শরীরের সোডিয়াম ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
সূত্র: ভেরি ওয়েল ফিট, হেলথলাইন, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ওয়েবসাইট
ছবি: পেকজেলস, ইন্সটাগ্রাম