প্রাকৃতিক উপায়ে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে   কেন এই বিশেষ ধরনের খাবার সবচেয়ে ভালো
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে মানুষের মধ্যে বাদাম খাওয়ার ঝোঁক বেশ বেড়েছে। মানুষ বুঝে হোক বা না বুঝে হোক, বাদাম খান। নানা ধরনের বাদাম খাচ্ছেন। সময় বুঝে এই বাদাম খেলে সেটা উপকারে আসবে। নয়তো শুধু মুখের স্বাদের জন্য খাওয়া হয়ে উঠবে। যাঁরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাঁরা বাদাম খাচ্ছেন।

বাদাম অত্যন্ত উপকারী
বাদাম অত্যন্ত উপকারী

জেনে রাখা ভালো, ডায়াবেটিস (বিশেষত টাইপ-২) রোগীদের জন্য বাদাম একটি অত্যন্ত উপকারী খাবার। বাদামে কার্বোহাইড্রেট খুব কম, প্রচুর স্বাস্থ্যকর ফ্যাট (আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট), ফাইবার, প্রোটিন, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন ‘ই’ ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট থাকে। এগুলো রক্তে সুগারের স্পাইক কমায়, ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি উন্নত করে, প্রদাহ কমায় ও হার্টের ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস করে।

বিজ্ঞাপন

বাদাম কেন ভালো

বাদামে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কম
বাদামে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কম

লো গ্লাইসেমিক প্রভাব: বেশির ভাগ বাদামের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স খুব কম বা নেই বললেই চলে। কারণ, কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কম। ফাইবার ও প্রোটিন হজমকে মন্থর করে কার্বোহাইড্রেটের শোষণ কমায়।
• ইনসুলিন ও গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ: মেটা-অ্যানালাইসিস ও আরসিটিতে দেখা গেছে, নিয়মিত বাদাম খেলে ফাস্টিং গ্লুকোজ, ‘HbA1c’ ও ফাস্টিং ইনসুলিন কমে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিদিন ৫০-৬০ গ্রাম বাদাম (বিশেষ করে পিস্তাচিও বা আমন্ড) ১২ সপ্তাহ খেলে ‘HbA1c’ উল্লেখযোগ্য কমেছে।
• হার্টের সুরক্ষা: ডায়াবেটিস রোগীদের হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি। বাদাম এলডিএল (খারাপ) কোলেস্টেরল কমায়, এইচডিএল (ভালো) বাড়ায়, ট্রাইগ্লিসারাইড কমায় এবং ইনফ্লামেশন হ্রাস করে। একটি বিস্তৃত গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে ৫ সার্ভিং বাদাম খেলে কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি ১৭ শতাংশ কমে।
• ওজন নিয়ন্ত্রণ: ক্যালরি বেশি হলেও বাদাম খেলে তৃপ্তি বেশি হয়, অতিরিক্ত খাওয়া কমে এবং ওজন বাড়ার সম্ভাবনা কম (বিশেষ করে আখরোট ও কাঠবাদাম)।
• অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট: ভিটামিন ‘ই’ ও পলিফেনল অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমিয়ে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমায়।

বিজ্ঞাপন

ডায়াবেটিসের জন্য সেরা বাদাম

ডায়াবেটিসের জন্য আদর্শ
ডায়াবেটিসের জন্য আদর্শ

• চিনাবাদাম: সস্তা ও সহজলভ্য। প্রোটিন ও ফাইবারে সমৃদ্ধ, সুগার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
• কাঠবাদাম বা আমন্ড: সবচেয়ে ভালো। রক্তে সুগার ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে, হার্টের জন্য উপকারী।
• আখরোট বা ওয়ালনাট: ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ। ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি বাড়ায় এবং প্রদাহ কমায়।
• পেস্তা বা পিস্তাশিও: ফাইবার ও প্রোটিন বেশি। ‘HbA1c’ ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমায়।
• অন্যান্য: কাজু, হ্যাজেলনাট, পেকান পরিমিত খাওয়া যায়।

কখন খাওয়া ভালো

খাওয়া যেতে পারে স্ন্যাক হিসেবে
খাওয়া যেতে পারে স্ন্যাক হিসেবে

• স্ন্যাকস হিসেবে: দুপুরের মাঝামাঝি বা বিকেলে, যখন ক্ষুধা লাগে বা অস্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস খাওয়ার ইচ্ছা হয়। এতে রক্তে শর্করা স্থিতিশীল থাকে।
• খাবারের সঙ্গে: উচ্চ কার্বোহাইড্রেট খাবারের (ভাত, রুটি) সঙ্গে মিশিয়ে খেলে খাবারের পর শর্করা বৃদ্ধি কম হয়।
• সকালে: কয়েকটি ভেজানো আমন্ড বা আখরোট সকালের নাশতায়।
• রাতে: কম পরিমাণে (বেডটাইম স্ন্যাকস), রাতভর শর্করা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
• সেরা সময়: অনেক বিশেষজ্ঞ বিকেল বা সন্ধ্যার স্ন্যাকস হিসেবে সুপারিশ করেন। কারণ, তখন অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার প্রবণতা থাকে।

প্রতিদিন কতটা খাবেন

খাওয়া উচিৎ নিয়ম মেনে
খাওয়া উচিৎ নিয়ম মেনে

• চিনাবাদাম হলে ৫০ গ্রাম, কাঠবাদাম হলে ২০ থেকে ২৫টি, কাজুবাদাম হলে ১০ থেকে ১৫টি আর আখরোট হলে ৫টি যথেষ্ট প্রতিদিন।
• সপ্তাহে ৩-৫ দিন খাবেন (মোট ১৪০-১৫০ গ্রাম)।

কীভাবে খাবেন

• কাঁচা হলে ২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে খাবেন, নয়তো ড্রাই রোস্টেড (তেল/লবণ ছাড়া) খান।
• খাবারের সঙ্গে যোগ করুন: সালাদ, দইয়ের সঙ্গে, স্মুদিতে বা ফলের সঙ্গে (যেমন আপেল ও বাদাম)।
• সকালের নাশতা বা বিকেলের স্ন্যাক হিসেবে খেলে সুগার স্থিতিশীল থাকে।
সতর্কতা
• ক্যালরি বেশি। তাই অতিরিক্ত খেলে ওজন বাড়তে পারে, পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
• বাদাম অ্যালার্জি থাকলে খাবেন না।
• চিনি, চকলেট বা মধু মাখানো বাদাম এড়িয়ে চলুন।
• কিডনি সমস্যা থাকলে (বিশেষ করে উচ্চ পটাশিয়ামযুক্ত বাদাম) চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
• গবেষণা অনুসারে বাদাম খেলে দীর্ঘ মেয়াদে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও হার্টের স্বাস্থ্য ভালো হয়, কিন্তু সামগ্রিক ডায়েট ও ব্যায়ামের সঙ্গে সমন্বয় করুন।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে পরিমিত পরিমাণে, সঠিক সময়ে এবং স্বাস্থ্যকরভাবে বাদাম খেলে অনেক উপকার পাবেন, রক্তে শর্করা স্থিতিশীল থাকবে, ক্ষুধা কমবে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো হবে। নিয়মিত খান, কিন্তু অতিরিক্ত নয়।

লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ০২ মে ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন