
বিকল্প চিকিৎসা ও সুস্থ থাকার নতুন ধারাগুলো নিয়ে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। আর সে কারণেই হার্ডকোর ওয়ার্কআউট বা গতানুগতিক যোগাসনের পাশাপাশি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ভালো থাকার বিকল্প পথগুলো। নৃত্যশিল্পী অর্থী আহমেদ নাচকে কেবল শিল্পের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একে ভালো থাকার অবলম্বন হিসেবে দিয়েছেন ভিন্ন মাত্রা। তাঁর অ্যাডাল্ট বিগিনার্স কোর্সের মাধ্যমে নাচ দিয়ে শরীর ও মনের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলছেন তিনি আমাদের দেশে। নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে সুস্থ থাকার গল্প খুঁজতে তাই ঢুঁ মেরেছিলাম অর্থী আহমেদ ড্যান্স একাডেমিতে। সেই গল্পই থাকছে হাল ফ্যাশনের পাঠকদের জন্য।


শহুরে জীবনে সুস্থ থাকা মানে শুধু ফিট থাকা নয়। সুস্থ থাকা মানে শরীর ও মনের সার্বিক ভালো থাকা, নিজের ভেতরের মানুষটাকে সময় দেওয়া, আর জীবনের ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া আনন্দটুকু আবার খুঁজে পাওয়া। ঠিক এই জায়গাটাতেই নাচ হয়ে উঠছে নতুন সময়ের এক অল্টারনেটিভ ওয়েলবিইং থেরাপি। জানা গেল, অর্থীর কাছে নাচ মানে শুধু ছন্দে আর তালে শরীরের মুভমেন্ট নয়। এর চেয়ে আরও বেশি কিছু। তাঁর এই নৃত্যদর্শনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে নাচকে জীবনচর্চায় রূপান্তর করার এক গভীর ভাবনা।
প্রথমেই নাচের সংজ্ঞা জানতে চেয়েছিলাম অর্থীর কাছে। এক বাক্যে বললেন, নাচ মানে ভালো থাকা, ভালো রাখা ও সবাইকে নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকা।
অর্থীর বয়ানে, নাচ শুধু শিল্প নয়, নাচ জীবনেরই অংশ। বাংলাদেশে নাচকে এখনো অনেক সময় শুধুই বিনোদনের চোখে দেখা হয়। অথচ নাচের আরেকটি গভীর দিক আছে, যেখানে শিল্প, সাধনা আর দর্শন এক হয়ে মানুষের ভেতরের ভাঙনগুলো জোড়া লাগাতে পারে। ছোটবেলা থেকেই নাচ শিখেছেন অর্থী। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাচ তার কাছে শুধু পারফরম্যান্সের বিষয় না থেকে হয়ে উঠেছে আত্ম-অনুসন্ধানের ভাষা। নাচ নিয়ে উচ্চশিক্ষা, গুরুদের সান্নিধ্য, তাদের জীবনধারা ও দর্শন তাঁকে শিখিয়েছে নাচ আসলে একটি জীবনধারা।


আড্ডার ফাঁকে অর্থী জানালেন আমাদের চারপাশের বাস্তবতা বেশ রূঢ়। প্রতিদিনের জীবনে আমরা এমন অনেক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই, যা আমাদের অজান্তেই মনের ভেতর ক্ষত তৈরি করে। একজন নারী রাস্তায় বের হলেই তাঁকে নানা কথা শুনতে হয়। দুর্ঘটনা, সহিংসতা, অকারণ মৃত্যু, হারানোর বেদনা সবকিছু আমাদের মনে অদৃশ্য ক্ষত রেখে যায়। এই ক্ষতগুলো আমরা খুব সহজেই উপেক্ষা করি। কিন্তু জমতে জমতেই এগুলো আমাদের আচরণ, সম্পর্ক আর জীবনবোধে প্রভাব ফেলে। অর্থীর বিশ্বাস, এই ক্ষত সারাতে ওষুধ নয়, দরকার আত্মিক যত্ন। আর সেই সৌন্দর্যের সবচেয়ে জীবন্ত প্রকাশ হতে পারে শিল্পচর্চা। নাচের মতো মাধ্যম তখন হয়ে ওঠে এক নীরব থেরাপি।
অর্থী তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে আত্মবিশ্বাসটা গড়তে চান তা হলো, তিনি কখনো বলেন না যে সবাইকে মঞ্চে উঠে নাচতেই হবে। তাঁর কাছে নাচের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটা মানুষকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে। সেই সঙ্গে নিজের শরীরকে নতুন করে চিনতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়। এই চর্চা যেমন বড়দের জন্য জরুরি, তেমনি শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্যও অপরিহার্য। পড়াশোনার পাশাপাশি শিল্পচর্চা শিশুকে শেখায় অনুভব করতে, প্রকাশ করতে, সংবেদনশীল হতে। নাচ এখানে তাই কোনো প্রতিযোগিতা নয়, বরং নিজের সঙ্গে নিজের সংযোগের একটি সুন্দর উপায়।
বড়দের জন্য নাচের এই স্কুলের মূল ভাবনা একটাই। যেকোনো বয়সে নাচ শুরু করা যায়, বয়স আর বাধা নয়।
আমাদের সমাজে এখনো প্রচলিত একটি ধারণা আছে, নাচ শেখার একটি নির্দিষ্ট বয়স থাকে। সেই বয়স পার হয়ে গেলে নাচ আর শেখা যায় না। অর্থী এই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করেছেন, নতুন করে পরিবর্তনের সূচনা করতে। ২০১৮ সালে দেশে ফিরে তিনি লক্ষ করেন, পরিচিত পরিধির অনেকেই আক্ষেপ করে বলছেন ‘ছোটবেলায় নাচ করতাম, এখন আর হয় না। কোথায় শিখব? বাচ্চাদের সঙ্গে মিলে শিখতে ভালো লাগে না।’ এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় তাঁর উদ্যোগ ‘অ্যাডাল্ট বিগিনার্স ক্লাস’। ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মে বড়রা আসে নিজের মতো করে নাচ শিখতে। এখানে কেউ কাউকে ভালো বা খারাপ হিসেবে বিচার করে না। দারুণ আনন্দময় পরিবেশে নাচ হয়ে ওঠে শুধু আত্মপ্রকাশের নয়, বরং মন ভালো রাখার একটি মাধ্যম। সেই সঙ্গে শরীরচর্চা ও ফিটনেসের বিষয় তো আছেই। আমরা সবাই জানি, নাচের চেয়ে ভালো ব্যায়াম আর হয় না।


অর্থী জানান, আজ শুধু বাংলাদেশ নয়, দেশের বাইরেও এই মডেল অনুসরণ হচ্ছে। কোরিওগ্রাফাররা তাঁর কাছে কারিকুলাম জানতে চান, ফরম্যাট জানতে চান। এতেই প্রমাণ হয়ে যায়, নাচ শেখার কোনো বয়স নেই। একসময় ষাট বছরের কেউ স্টেজে উঠে নাচলে সেটাকে অস্বাভাবিক মনে হতো। আজ সেটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। দর্শক এখন আর নেতিবাচকতা নিয়ে নয়, শিল্পের প্রতি সম্মান নিয়েই সেই পারফরম্যান্স দেখে। আর সেখানেই এই ড্যান্স একাডেমির সার্থকতা।
তবে এই বদল এসেছে ধীরে ধীরে। বহু বিশ্বাস আর শ্রমের মধ্য দিয়ে। আর এই সময়ে এসে অর্থীর ড্যান্স একাডেমির পারফরম্যান্স দেখতে আসে সবাই আগ্রহ ভরে। সামাজিক যোগাযোগধ্যমে প্রশংসিত ও আলোচিত হয় সব বয়সী নারীর সমবেত ও হাস্যোজ্জ্বল নাচের ছবিগুলো। আর এখানে যাঁরা নাচ শেখেন ও নাচেন, তাঁদের ভাষ্য হচ্ছে, এই নাচের মাধ্যমেই তাঁরা ভালো আছেন। শরীরে ও মনে।


জিজ্ঞেস করেছিলাম এই দারুণ যাত্রার স্মৃতিময় গল্পগুলোর কথা। অর্থী হেসে বললেন, এই যাত্রায় গল্পের অভাব নেই। ছেলে তার মাকে স্কুটারে বসিয়ে ক্লাসে নিয়ে আসে। বউ-শাশুড়ি একসঙ্গে নাচ শেখে। স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে তাল মেলায়। নানি, মা আর নাতনি তিন প্রজন্ম একসঙ্গে নাচ শেখে। কেউ কেউ এমন জায়গা থেকে এসেছে, যেখানে বেঁচে থাকার ইচ্ছাই হারিয়ে গিয়েছিল। নাচ শুরু করে তারা আবার জীবনের স্বপ্ন দেখতে শিখেছে। এখন তাদের জীবনের লক্ষ্য শুধু বেঁচে থাকা নয়, ভালোভাবে বেঁচে থাকা। সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স সারভাইভ করা নারীরা, হ্যারাসমেন্টের পর নিজের শরীরকে ঘৃণা করতে শেখা মানুষগুলো নাচের মধ্য দিয়ে আবার নিজের শরীরকে ভালোবাসতে শিখেছে। এই জায়গাটাই নাচকে কেবল শিল্প নয়, থেরাপিতে রূপ দেয়।
আড্ডার ফাঁকে কথা হয় ‘অ্যাডাল্ট বিগিনার্স ক্লাসের’ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। অধ্যাপিকা নোভা আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ান। তিনি ও তাঁর স্বামী দুজনই নাচ শেখেন। নোভা দুই বছর আগে বন্ধুদের সঙ্গে নাচের ক্লাসে যোগ দিয়েছিলেন। নাচের প্রথম দিনগুলোতে নোভা নিজেকে পাথরের মতো শক্ত মনে করতেন, নড়াচড়া করতে পারতেন না। তবু সবাই যখন নাচছিল, তিনি নিজেও সেই আনন্দের অংশ হতে চেয়েছিলেন। ‘যদিও আমি পারিনি, লাজুক ছিলাম, তবু আনন্দের মধ্যে থাকা অসাধারণ লাগছিল।’ তিনি জানান, গান আর তাল অনুসরণ করতে করতে কখনো কখনো গানের টিউন মাথায় ঘুরতে থাকে। এটা কেবল শারীরিক নাচ নয়, বরং মনের এক আনন্দময় মুক্তি, যেখানে বয়স বা পারিপার্শ্বিক বিষয় কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। ‘সবাই ছোট, আমি বড়—তারপরও এই অভিজ্ঞতা আমাকে এতখানি আনন্দ দিয়েছে, যা বলার মতো নয়। এখানে কেউ কাউকে বিচার করে না, সবাই মিলেমিশে আনন্দে ভেসে যায়,’ নোভা যোগ করেন।

চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাজকন্যা বলেন, ‘নাচ আমার জন্য শুধু তালের খেলা নয়; এটা আমার শান্তি, আমার মুক্তি। ছোটবেলায় যে স্বপ্ন পূরণ হয়নি, আজ এখানে সেই আনন্দ আমি পুরোপুরি উপভোগ করি। শ্বাস-প্রশ্বাস, তাল, প্রতিটি পদক্ষেপ আমাকে শিখিয়েছে নিজের সঙ্গে ভালোবাসা করতে। এই নাচের স্কুল আমার দ্বিতীয় ঘর, যেখানে আমি নতুন রূপে নিজেকে আবিষ্কার করি এবং নিজেকে ভালোবাসতে শিখি।’
ড্যান্স একাডেমিতে নাচ শিখতে আসা ফার্মাসিস্ট সিনথিয়া বলেন, ‘ছোটবেলায় বন্ধ হওয়া নাচের স্বপ্ন আবার জীবন্ত হয়েছে। এখানে সব বয়সের মানুষ একসঙ্গে আনন্দে নাচে, একে অপরকে সহায়তা করে, এটাই আমাকে আবার শুরু করার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।’
অল্টারনেটিভ ওয়েলবিইং প্রসঙ্গে অর্থী বলেন, আজকের লাইফস্টাইলে সবাই অল্টারনেটিভ ওয়েলবিইং খুঁজছে। কেউ জিমে যাচ্ছে, কেউ পাহাড়ে, কেউ মেডিটেশনে। কিন্তু ছোটবেলার অপূর্ণ ইচ্ছাগুলো পূরণ করাও তো একধরনের মেডিটেশন। অর্থীর বার্তা খুব সহজ। জীবন ছোট। এই ছোট জীবনে কোনো আফসোস রেখে চলে যাওয়া উচিত না। নাচ হোক, গান হোক, গিটার বা পিয়ানো যেকোনো শিল্পচর্চাই হোক, শুরু করাটাই সবচেয়ে বড় সাহস। সবাই পারফেক্ট হবে না। কিন্তু শুরু না করলে নিজের কাছেই হার মানা হয়।

নাচ তাই শুধু নাচ নয়। নাচ মানে নিজেকে ভালোবাসা। নাচ মানে নিজের শরীরকে আবার আপন করে নেওয়া। নাচ মানে জীবনের ভেতর হারিয়ে যাওয়া আনন্দটাকে আবার ফিরিয়ে আনা। নাচ মানে শরীর ও মনকে ভালো রাখা। এই কারণেই আজ নাচ, লাইফস্টাইলের এক নতুন থেরাপি।
ছবি: অর্থী আহমেদ ড্যান্স অ্যাকাডেমি