যে অনুভূতিকে আমরা এড়িয়ে চলি, সেটিই হতে পারে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা
শেয়ার করুন
ফলো করুন

চাকরির ইন্টারভিউ ভালো হয়েছে, তবু নির্বাচিত হলেন না। অনেক দিন ধরে পরিকল্পনা করা একটি সম্পর্ক প্রত্যাশিত পরিণতি পেল না। কিংবা নিজের সেরাটা দেওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল এল না। এমন মুহূর্তে হতাশা যেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। বেশির ভাগ মানুষই তখন এই অনুভূতিকে দ্রুত ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হতাশাকে এড়িয়ে যাওয়ার বদলে বোঝার চেষ্টা করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

দীর্ঘদিন ধরে হতাশা নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুভূতি আসলে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্বের ফল। আমরা অনেক সময় কোনো ঘটনার ফলাফল পাওয়ার আগেই মনে মনে একটি ভবিষ্যৎ কল্পনা করে ফেলি। সেই কল্পিত ভবিষ্যৎ বাস্তবে না এলে জন্ম নেয় হতাশা।

প্রত্যাশা যত বড়, হতাশাও তত গভীর

গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলে আমরা প্রায়ই ফলাফল নিয়ে আগাম কল্পনা শুরু করি। নতুন চাকরি, পদোন্নতি, পরীক্ষার ফল বা সম্পর্ক। যাই হোক না কেন, প্রত্যাশা যত বেশি তৈরি হয়, বাস্তবতা ভিন্ন হলে হতাশাও তত তীব্র হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় আমরা শুধু একটি সুযোগ হারাই না, বরং সেই সুযোগকে ঘিরে গড়ে তোলা স্বপ্নটিও হারিয়ে ফেলি। আর সেই হারানোর অনুভূতিই আমাদের বেশি কষ্ট দেয়।

সাফল্যও কখনো হতাশার কারণ হতে পারে

শুনতে অবাক লাগলেও অতীতের সাফল্য অনেক সময় ভবিষ্যতের হতাশার ভিত্তি তৈরি করে। একবার ভালো ফল করলে পরেরবার নিজের কাছেও প্রত্যাশা বেড়ে যায়, আশপাশের মানুষের কাছেও।

কর্মক্ষেত্রে যেমন একটি লক্ষ্য অতিক্রম করলে পরবর্তী সময়ে আরও বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও মানুষ ধীরে ধীরে অন্যদের কাছে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে পরিণত হয়। ফলে সামান্য ব্যর্থতাও তখন বড় হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

নিজেকে দোষারোপ করবেন না

হতাশার পর অনেকেই ভাবতে শুরু করেন, ‘আমি যথেষ্ট ভালো নই’ অথবা ‘আমি আরও চেষ্টা করলে পারতাম।’ অন্যদিকে কেউ কেউ সব দায় চাপিয়ে দেন অন্যদের ওপর।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই অনেক সময় মূল সমস্যাকে আড়াল করে। কারণ হতাশার পেছনে সব সময় ব্যক্তিগত ব্যর্থতা কাজ করে না। অনেক সময় সমস্যাটি থাকে অবাস্তব প্রত্যাশা বা ভুল ধারণার মধ্যে।

বিজ্ঞাপন

কেন বেশি কষ্ট হয়?

একটি বিষয়ে যত বেশি সময়, শ্রম ও আবেগ বিনিয়োগ করি, সেটি আমাদের কাছে তত বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় ‘আইকিয়া ইফেক্ট’। নিজের হাতে তৈরি আসবাবের প্রতি যেমন আলাদা টান তৈরি হয়, তেমনি নিজের পরিশ্রমে গড়ে তোলা কোনো কাজ, সম্পর্ক বা স্বপ্নের প্রতিও গভীর আবেগ জন্ম নেয়।
তাই কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে শুধু একটি লক্ষ্যই হারিয়ে যায় না, আঘাত লাগে আত্মপরিচয় ও আত্মবিশ্বাসেও।

বাস্তববাদী হওয়াই সবচেয়ে বড় শক্তি

বিশেষজ্ঞদের মতে, হতাশা পুরোপুরি এড়িয়ে চলার চেষ্টা না করে বরং সেটিকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। কোনো কাজ শুরু করার সময় আদর্শ ফলাফল নয়, বরং বাস্তবসম্মত ফলাফল কী হতে পারে সেটিও ভাবা উচিত।
সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। সব সময় নিখুঁত কিছু প্রত্যাশা করলে ভালো সম্পর্কও অনেক সময় অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে।

হতাশাকে গুরুত্ব দিন

গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের অনুভূতিকে চিহ্নিত করে তার নাম দেওয়া গেলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়। তাই হতাশা অনুভব করলে সেটিকে অস্বীকার না করে স্বীকার করা জরুরি।

হতাশা কখনো সুখকর নয়। তবে এটি আমাদের শেখায় আমরা কী চাই, কোন বিষয়গুলো আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং কোথায় আমাদের প্রত্যাশা বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। সেই অর্থে হতাশা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং নিজেকে আরও ভালোভাবে বোঝার একটি সুযোগ।

জীবনে হতাশা আসবেই। কিন্তু সেটিকে ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে না দেখে শেখার একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করতে পারলে, সেই অনুভূতিই হয়তো আমাদের সামনে খুলে দিতে পারে নতুন সম্ভাবনার দরজা।

ছবি: এআই

বিজ্ঞাপন
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন