ভাত বাদ নয়, ওজন নিয়ন্ত্রণে অনুসরণ করতে পারেন জাপানিদের ১২ অভ্যাস
শেয়ার করুন
ফলো করুন

জাপানে মোটা হওয়া বেআইনি—এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে। কিন্তু বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়। ২০০৮ সালে জাপানে ৪০ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের বিপাকীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করতে বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু হয়। এটি পরিচিতি পায় ‘মেটাবো আইন’ নামে। এর উদ্দেশ্য ছিল বিপাকীয় সিনড্রোমের ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া। অর্থাৎ, মানুষকে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করাই ছিল মূল লক্ষ্য।

জাপানিদের খাদ্যাভ্যাসই তাদের মোটা হতে দেয় না
জাপানিদের খাদ্যাভ্যাসই তাদের মোটা হতে দেয় না

জাপানিদের খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনের কিছু অভ্যাস ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে। এগুলো কোনো জাদুকরি সূত্র নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনে সহজেই যুক্ত করা যায় এমন কিছু চর্চা। চলুন, জেনে নেওয়া যাক এমন ১২টি অভ্যাস।

বিজ্ঞাপন

১. সকাল শুরু হোক এক কাপ উষ্ণ পানিতে

সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে চা বা কফি না পান করে এক কাপ হালকা গরম পানি পান করা ভাল
সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে চা বা কফি না পান করে এক কাপ হালকা গরম পানি পান করা ভাল

ঘুম থেকে উঠেই চা বা কফি পান করার অভ্যাস অনেকের। এর বদলে এক কাপ উষ্ণ পানি দিয়ে দিন শুরু করতে পারেন। জাপানি জীবনযাপন নিয়ে প্রচলিত নানা আলোচনায় এ অভ্যাসের কথা বলা হয়। তবে উষ্ণ পানি পান করলেই ওজন কমে বা শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বেরিয়ে যায়—এমন দাবির নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

ঘুমের পর শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করাই পানি পানের প্রধান উপকার। উষ্ণ পানি ভালো লাগলে পান করুন, চাইলে যোগ করতে পারেন সামান্য লেবুর রস। তবে পানির তাপমাত্রার চেয়ে নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২. খাবারে রাখুন গাঁজন করা উপাদান

জাপানি খাদ্যসংস্কৃতিতে গাঁজন করা খাবারের বিশেষ স্থান রয়েছে। মিসো, নাত্তো ও বিভিন্ন ধরনের আচার তার উদাহরণ। নাত্তোর গন্ধ ও পিচ্ছিল গঠন প্রথমবার অনেকের কাছে অচেনা মনে হতে পারে। তবে এতে রয়েছে প্রোটিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান। গাঁজন করা কিছু খাবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে সব গাঁজন করা খাবার সমান উপকারী নয়। মিসো ও কিছু আচারজাতীয় খাবারে লবণের পরিমাণ বেশি থাকে। তাই খাবারের ধরন ও পরিমাণ—দুটিই বিবেচনায় রাখা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

৩. ভাত বাদ নয়, পরিমাণে ভারসাম্য

ভাত বাদ নয়, পরিমাণ নিয়ন্ত্রণই উপায়
ভাত বাদ নয়, পরিমাণ নিয়ন্ত্রণই উপায়

জাপানি খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে ভাতের সম্পর্ক গভীর। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে ভাত একেবারে বাদ দিতে হবে, এমন নয়। জাপানের সরকারি খাদ্যনির্দেশিকায়ও শস্যজাতীয় খাবারের পাশাপাশি সবজি, মাছ, অন্যান্য প্রোটিন, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার এবং ফলের ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আমাদের জন্যও বিষয়টি সহজ। ভাত খাবেন, তবে প্লেটে কতটা সবজি, মাছ, ডাল, ডিম বা অন্য প্রোটিন থাকছে, সেদিকেও নজর দিন। একটি সুষম খাবারই হতে পারে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ভিত্তি।

৪. পেট ভরার আগেই খাওয়া থামান

জাপানি সংস্কৃতিতে ‘হারা হাচি বুউ’ নামে একটি ধারণা রয়েছে। এর অর্থ হলো পেট প্রায় ৮০ শতাংশ ভরা পর্যন্ত খাওয়া। বিশেষ করে ওকিনাওয়ার খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে এই অভ্যাসের পরিচিতি রয়েছে।

পেট ঠিক কতটা ভরেছে, তা শতাংশে মাপার প্রয়োজন নেই। বরং খাওয়ার মাঝখানে একটু বিরতি নিন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, সত্যিই কি আরও ক্ষুধা আছে, নাকি অভ্যাসবশত খেয়ে যাচ্ছেন? শরীরের তৃপ্তির সংকেত বুঝতে শেখা অতিরিক্ত খাওয়া কমাতে সহায়ক হতে পারে।

৫. ছোট পাত্রে সাজান খাবার

জাপানিদের মতো ছোট ছোট পাত্রে খাবার নিতে হবে
জাপানিদের মতো ছোট ছোট পাত্রে খাবার নিতে হবে

জাপানি খাবার পরিবেশনের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো ছোট ছোট বাটি ও পাত্রে বিভিন্ন পদ সাজিয়ে দেওয়া। এতে একই খাবারে নানা ধরনের উপাদান রাখার সুযোগ তৈরি হয়।

এই অভ্যাস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের খাবারও ছোট পাত্রে ভাগ করে পরিবেশন করতে পারেন। একটিতে ভাত, অন্যটিতে সবজি, আরেকটিতে মাছ বা ডাল। এতে খাবারের বৈচিত্র্য বজায় রাখা সহজ হয়।

তবে ছোট প্লেট ব্যবহার করলেই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম খাওয়া হবে, তা নয়। কতটা খাবার নিচ্ছেন এবং ক্ষুধা মিটেছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

৬. ধীরে ধীরে খান, স্বাদ উপভোগ করুন

কাজের ফাঁকে, মুঠোফোন হাতে কিংবা টেলিভিশন দেখতে দেখতে দ্রুত খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই আছে। এতে কখন পেট ভরে গেছে, তা বুঝতে দেরি হতে পারে।
ধীরে খেলে খাবারের স্বাদ ও গন্ধ ভালোভাবে উপভোগ করা যায়। পাশাপাশি শরীরের তৃপ্তির সংকেত বোঝারও সুযোগ পাওয়া যায়। এ জন্য চপস্টিক ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। খাবার মুখে দিয়ে ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া এবং মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়াই যথেষ্ট। খাবার কোনো প্রতিযোগিতা নয়। একটু সময় নিয়ে খেলে খাবারের আনন্দও বাড়ে।

৭. হাঁটাকে করে তুলুন দৈনন্দিন অভ্যাস

হাঁটার বিকল্প নেই
হাঁটার বিকল্প নেই

ওজন ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ব্যায়ামের জন্য আলাদা সময় বের করা নয়, দৈনন্দিন জীবনে হাঁটা ও নড়াচড়ার সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।

জাপানে গবেষণাভিত্তিক একটি পদ্ধতি হলো ইন্টারভ্যাল ওয়াকিং। এতে তিন মিনিট দ্রুত হাঁটার পর তিন মিনিট ধীরে হাঁটা হয়। এভাবে কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করা যায়। গবেষণায় এই পদ্ধতি শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক বলে দেখা গেছে। তবে সবার শরীরের সক্ষমতা এক নয়। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটা শুরু করুন এবং ধীরে ধীরে সময় ও গতি বাড়ান।

৮. স্বাস্থ্যকর খাবার রাখুন হাতের কাছে

ক্ষুধা লাগলে হাতের কাছে যা পাওয়া যায়, তা খাওয়ার প্রবণতা অনেকেরই রয়েছে। তাই বিস্কুট, চিপস বা মিষ্টি যদি সব সময় চোখের সামনে থাকে, সেগুলো খাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। অন্যদিকে ফল, বাদাম, সেদ্ধ ডিম কিংবা সহজে খাওয়া যায় এমন স্বাস্থ্যকর খাবার হাতের কাছে রাখলে ভালো বিকল্প বেছে নেওয়া সহজ হয়। খাবারের পরিবেশে ছোট পরিবর্তনও দৈনন্দিন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। সব সময় ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর না করে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করুন।

৯. সবজি ও উদ্ভিজ্জ খাবার বাড়ান

জাপানি খাদ্যসংস্কৃতিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি, মাশরুম, সয়া ও সামুদ্রিক শৈবাল ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। এসব খাবার খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনে এবং অনেক ক্ষেত্রে আঁশসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে। জাপানি খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বড় পরিসরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত জাপানি খাদ্যনির্দেশিকার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক ছিল কম সামগ্রিক ও হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুঝুঁকির সঙ্গে। আমাদের দেশে সামুদ্রিক শৈবাল নিয়মিত খাওয়ার প্রচলন নেই। সেটি না খেলেও সমস্যা নেই। বরং প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ডাল, মটরশুঁটি ও সয়াজাতীয় খাবার রাখতে পারেন।

নিয়মিত শাকসবজি ও মাছ খেতে হবে
নিয়মিত শাকসবজি ও মাছ খেতে হবে

১০. নিয়মিত খান মাছ

জাপানি খাদ্যসংস্কৃতিতে মাছের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। মাছ প্রোটিনের ভালো উৎস। তেলযুক্ত কিছু মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও থাকে, যা হৃৎস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
তবে মাছ খেলেই ওজন কমবে, এমন নয়। মাছ কীভাবে রান্না করছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং পুরো খাবারের ভারসাম্য কেমন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত তেলে ভাজার বদলে ঝোল, সেদ্ধ, গ্রিল বা কম তেলে রান্না করা মাছ বেছে নিতে পারেন। দেশি মাছ দিয়েও সহজে স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করা সম্ভব।

১১. খাবারের সঙ্গে রাখুন এক বাটি স্যুপ

জাপানি খাবারের পরিচিত পদ মিসো স্যুপ। খাবারের সঙ্গে এক বাটি স্যুপ রাখলে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য বাড়ে। সবজি, মাশরুম বা অন্যান্য উপাদান দিয়েও পুষ্টিকর স্যুপ তৈরি করা যায়। তবে স্যুপ মানেই কম ক্যালরির খাবার নয়। এতে কী উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে, কতটা তেল বা লবণ দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর পুষ্টিমান নির্ভর করে। বিশেষ করে মিসো ও প্রস্তুত স্যুপে লবণের পরিমাণ বেশি হতে পারে। তাই স্যুপকে ওজন কমানোর বিশেষ উপায় না ভেবে সুষম খাবারের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করুন।

১২. খাবারের ক্রমে আনুন সচেতনতা

খাবার কোন ক্রমে খাচ্ছেন, তা নিয়েও পুষ্টিবিজ্ঞানে গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ভাত বা অন্য শর্করাজাতীয় খাবারের আগে সবজি ও প্রোটিন খেলে খাবারের পর রক্তে শর্করা বৃদ্ধির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা হতে পারে। তবে ফল ব্যক্তি ও খাবারের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই প্রথমে সবজি, এরপর মাছ, ডিম, ডাল বা অন্য প্রোটিন এবং তারপর ভাত খাওয়ার অভ্যাস চেষ্টা করে দেখতে পারেন। তবে খাবারের ক্রমের চেয়ে পুরো দিনের খাদ্যতালিকা, খাবারের পরিমাণ ও পুষ্টির ভারসাম্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পরিমিতিই সবচেয়ে বড় অভ্যাস

জাপানিদের খাদ্যাভ্যাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে ভাত, নুডলস কিংবা মিষ্টি—সবই রয়েছে। তবে ঐতিহ্যবাহী খাদ্যধারার একটি বৈশিষ্ট্য হলো মাছ, সবজি, সয়া, সামুদ্রিক শৈবাল, গাঁজন করা খাবার, গ্রিন টিসহ নানা ধরনের খাবারের সমন্বয়।

৯২ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা একটি জাপানি গবেষণায় প্রচলিত খাদ্যনির্দেশিকার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে কম সামগ্রিক ও হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুঝুঁকির সঙ্গে। তবে এ ধরনের গবেষণা থেকে সরাসরি বলা যায় না যে কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবার বা অভ্যাসই এর একমাত্র কারণ।

সুস্থ থাকতে রাতারাতি জাপানি হয়ে ওঠার প্রয়োজন নেই। নিজের প্রতিদিনের খাবারে একটু বেশি সবজি রাখুন, ভাতের পরিমাণে ভারসাম্য আনুন, মাছ বা অন্য প্রোটিন খান, ধীরে খাবার গ্রহণ করুন এবং নিয়মিত হাঁটুন। পর্যাপ্ত পানি পান করুন, শরীরের ক্ষুধা ও তৃপ্তির সংকেত বুঝতে শিখুন।

সবচেয়ে বড় কথা, খাবারকে শত্রু মনে না করে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করুন। কারণ, সুস্থ থাকার গল্পটি কোনো একটি খাবারের নয়; বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের গল্প। ধারাবাহিকভাবে সেই সিদ্ধান্তগুলোই জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

তথ্যসূত্র: জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং জাপানি খাদ্যাভ্যাসবিষয়ক গবেষণা।

ছবি: এআই ও পেকেজলসডটকম

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন