
ঘুম আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি দূর করতে দরকার হয় ঘুম। এ ছাড়া সুস্থ শরীর ও মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে পর্যাপ্ত ঘুম জরুরী। কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘুম অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম শরীরের প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট। কম ঘুমানো যেমন একটি সমস্যা তেমনি অতিরিক্ত ঘুমও উদ্বেগের আরেকটি কারণ। আর এখন এই শীতের দিনে যখন তখন লেপকম্বল মুড়ি দিয়ে বেশি বেশি ঘুমানোর প্রবণতা দেখা যায় অনেকের মাঝেই। অভ্যাসটি বেশ আরামের হলেও এতে দেখা দিতে পারে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি।

দিনের পর দিন দীর্ঘক্ষণ ঘুমালে শারীরিক কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং তা একাধিক রোগের জন্ম দিতে পারে। গবেষণা বলছে, নিয়মিত প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঘুমের অভ্যাস শরীর ও মনে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, অতিরিক্ত ঘুম শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যেসব ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
অতিরিক্ত ঘুম শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া দীর্ঘসময় ঘুমানোর কারণে শরীরে বিপাকক্রিয়া সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না, যা রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বাড়াতে কাজ করে।

যাঁরা অতিরিক্ত ঘুমান, তাঁদের মধ্যে ওজন বৃদ্ধির প্রবণতা বেশি দেখা যায়। দীর্ঘসময় বিছানায় থাকার ফলে শারীরিক কার্যকলাপ কমে যায়, যা ফলে পর্যাপ্ত ক্যালরি বার্ন হতে পারে না। শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত ঘুম হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। যা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে ব্যাঘাত ঘটায়। যার ফলে ঘন ঘন খাওয়ার আকাঙ্খা বৃদ্ধি পায়।
অতিরিক্ত ঘুম আর ডিপ্রেশনের মধ্যে একটি দ্বিমুখী সম্পর্ক রয়েছে। মানসিক চাপ বা হতাশার কারণে অনেকে দীর্ঘসময় ঘুমান। অন্যদিকে, অতিরিক্ত ঘুম হতাশাকে আরও তীব্র করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঘুম মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বেশ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত ঘুম হার্টের সমস্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। যাঁরা দৈনিক ৯ ঘন্টার বেশি ঘুমান, তাঁদের হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। সেই সঙ্গে অতিরিক্ত ঘুম রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল মাত্রা বাড়াতে পারে, যা হৃদরোগের কারণ।
অতিরিক্ত ঘুমানোর আরেকটি সাধারণ সমস্যা হলো শরীরে ব্যথা ও অস্বস্তি। দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থানে ঘুমালে পিঠ, ঘাড় এবং জয়েন্টে চাপ পড়ে, যা ব্যথার কারণ হতে পারে। বিশেষত, অস্বাস্থ্যকর বিছানা বা বালিশ ব্যবহারে এই সমস্যা আরও তীব্র হয়। মেরুদণ্ডে অতিরিক্ত চাপ পড়লে তা দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যার রূপ নিতে পারে। পাশাপাশি, দীর্ঘক্ষণ ঘুমানোর ফলে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়ে পেশিতে টান ধরতে পারে এবং ঘাড়ের মাংসপেশি অনমনীয় হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এই সমস্যা এড়াতে সঠিক বিছানা ও বালিশ ব্যবহার এবং ঘুমের আগে হালকা স্ট্রেচিং বা ব্যায়ামের অভ্যাস কার্যকর হতে পারে।

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন এবং শারীরিক পরিশ্রম বাড়ান। ঘুমের পরিবেশ আরামদায়ক করুন, যেন ভালো ঘুম হয়। ঘুম ভালো হলে দীর্ঘসময় ঘুমানোর প্রয়োজন পড়ে না। মানসিক চাপ কমানোর জন্য মেডিটেশন বা মনোযোগ বৃদ্ধির চর্চা করতে পারেন। পরিমিত ঘুম জীবনের গুণগত মান বৃদ্ধি করে। তাই সুস্থ থাকার জন্য ঘুমের সময়ের প্রতি সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
ছবি: পেকজেলসডটকম