চিয়া সিডস নয়, আমাদের এই চিরচেনা পথ্যটিকেই বলা হচ্ছে ডায়াবেটিসের নতুন মহৌষধ
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এতদিন চিয়া সিডস নিয়ে খুবই হাইপ চলে এসেছে। লাইফস্টাইল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত চিয়া সিডস গ্রহণ করলে তা ব্লাড সুগার কমাতে কার্যকর বলে অনেক গবেষণায় এসেছে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এতদিন চিয়া সিডস নিয়ে খুবই হাইপ চলে এসেছে
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এতদিন চিয়া সিডস নিয়ে খুবই হাইপ চলে এসেছে

এই চিয়া সিডসের ক্রেজ খুব বেশিদিন হয় নি আমাদের দেশে শুরু হয়েছে। বরঞ্চ ইসবগুলের ভুসি বা সাইলিয়াম হাস্ক আমাদের এক চিরচেনা পথ্য। এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর প্রাকৃতিক সম্পূরক হিসেবে কাজ করে। কেবল কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতেই নয়, বরং রক্তে শর্করার মাত্রা বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত হচ্ছে এখন। বলা হচ্ছে চিয়া সিডসের চেয়েও এর কার্যকারিতা বেশি।

বিজ্ঞাপন

নিচে ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় এর ভূমিকা ও ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইসবগুলের ভুসি কীভাবে কাজ করে?

ইসবগুলের ভুসি মূলত এক ধরণের দ্রবণীয় ফাইবার । যখন এটি পানির সংস্পর্শে আসে, তখন এটি জেলের মতো একটি আঠালো পদার্থে পরিণত হয়। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এটি দুইভাবে কাজ করে:

খাবারের আগে বা সাথে ইসবগুলের ভুসি খেলে তা ওই খাবারের সামগ্রিক গ্লাইসেমিক লোড কমিয়ে দেয়
খাবারের আগে বা সাথে ইসবগুলের ভুসি খেলে তা ওই খাবারের সামগ্রিক গ্লাইসেমিক লোড কমিয়ে দেয়

১. কার্বোহাইড্রেট শোষণের গতি কমানো: খাবার গ্রহণের পর আমাদের শরীর শর্করাকে চিনিতে রূপান্তর করে রক্তে মিশিয়ে দেয়। ইসবগুলের ভুসি পাকস্থলীতে থাকা খাবারের সাথে মিশে একটি আস্তরণ তৈরি করে, যা শর্করা বা গ্লুকোজ শোষণের গতিকে ধীর করে দেয়। এর ফলে খাবার খাওয়ার পর হঠাৎ করে রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে যায় না।

২. গ্লাইসেমিক ইনডেক্স হ্রাস: উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সম্পন্ন খাবারগুলো দ্রুত রক্তে সুগার বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু খাবারের আগে বা সাথে ইসবগুলের ভুসি খেলে তা ওই খাবারের সামগ্রিক গ্লাইসেমিক লোড কমিয়ে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদী সুগার নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

বিজ্ঞাপন

বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব ও উপকারিতা

গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত ইসবগুলের ভুসি সেবন করলে তিন মাসের গড় সুগার এবং খালি পেটে সুগার উল্লেখযোগ্য হারে কমে।

ডায়াবেটিস রোগীদের আরও কিছু বাড়তি সুবিধা দেয় এই ফাইবার:

ফাইবার সমৃদ্ধ ডায়েট শরীরের ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে
ফাইবার সমৃদ্ধ ডায়েট শরীরের ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে

ওজন নিয়ন্ত্রণ: এটি পাকস্থলীতে দীর্ঘক্ষণ থাকে এবং পেট ভরা রাখার অনুভূতি দেয়। ফলে ঘনঘন খাওয়ার প্রবণতা কমে, যা ওজন কমিয়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ সহজ করে।

হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস: ডায়াবেটিস রোগীদের হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। ইসবগুলের ভুসি শরীরের ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল কমিয়ে হার্ট ভালো রাখতে সাহায্য করে।

ইনসুলিন সংবেদনশীলতা: ফাইবার সমৃদ্ধ ডায়েট শরীরের ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।

ব্যবহারের সঠিক নিয়ম

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য ইসবগুলের ভুসি খাওয়ার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে:

সময়: সুগার নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি সাধারণত ভারী খাবারের ঠিক আগে বা খাবারের সাথে খাওয়া সবচেয়ে বেশি কার্যকর। তবে চিকিৎসকের পরামর্শে দিনের যে কোনো সময় খাওয়া যেতে পারে।

সাধারণত ভারী খাবারের ঠিক আগে বা খাবারের সাথে খাওয়া সবচেয়ে বেশি কার্যকর
সাধারণত ভারী খাবারের ঠিক আগে বা খাবারের সাথে খাওয়া সবচেয়ে বেশি কার্যকর

পরিমাণ: শুরুতে ৫ গ্রাম বা এক চা-চামচ দিয়ে শুরু করা উচিত। ধীরে ধীরে শরীরের সহ্যক্ষমতা অনুযায়ী এটি দিনে ১০-১৫ গ্রাম পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।

প্রণালি: এক গ্লাস পানিতে ভুসি মিশিয়ে সাথে সাথেই খেয়ে ফেলতে হবে। ভিজিয়ে রেখে এটি জেল হয়ে গেলে খাওয়ার চেয়ে সাথে সাথে পান করা সুগার নিয়ন্ত্রণে বেশি কার্যকর।

সতর্কতাসমূহ

১. পর্যাপ্ত পানি: ইসবগুলের ভুসি প্রচুর পানি শোষণ করে। তাই এটি খাওয়ার পর সারাদিন পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। অন্যথায় কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেট ফাঁপার সমস্যা হতে পারে।

২. ঔষধের সাথে ব্যবধান: আপনি যদি ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো ঔষধ সেবন করেন, তবে ভুসি খাওয়ার অন্তত ১ ঘণ্টা আগে বা ২-৪ ঘণ্টা পরে ঔষধ খাওয়া উচিত। কারণ এটি ঔষধের শোষণ কমিয়ে দিতে পারে।

৩. প্রাকৃতিক উৎস: চিনি বা কৃত্রিম স্বাদযুক্ত প্যাকেটজাত ভুসি এড়িয়ে একদম সাধারণ বা ন্যাচারাল ইসবগুলের ভুসি বেছে নিন।

একদম সাধারণ বা ন্যাচারাল ইসবগুলের ভুসি বেছে নিন
একদম সাধারণ বা ন্যাচারাল ইসবগুলের ভুসি বেছে নিন

অন্যান্য উপকারিতা

ইসবগুলের ভুসি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে, হজম প্রক্রিয়া উন্নত করতে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ব্যবহৃত হয়। এটি অন্ত্রের পানি শোষণ করে মল নরম করে এবং পায়খানা পরিষ্কার করে। এছাড়া ডায়রিয়া, অ্যাসিডিটি, ওজন কমানো এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে এটি অত্যন্ত কার্যকর

ইসবগুলের ভুসির প্রধান কিছু উপকারিতা

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে: নিয়মিত সেবনে পেট পরিষ্কার থাকে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর হয়

হজম ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য: অন্ত্রের বর্জ্য পদার্থ বের করে দেয় এবং হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে

ডায়রিয়া নিরাময়: দইয়ের সাথে মিশিয়ে খেলে ডায়রিয়া দ্রুত কমে

অ্যাসিডিটি ও বুক জ্বালাপোড়া: পাকস্থলীতে একটি প্রলেপ তৈরি করে অ্যাসিডিটি কমায়

ইসবগুলের ভুসি ডায়াবেটিস নিরাময়ের কোনো বিকল্প নয়, বরং এটি সুষম খাদ্যতালিকা ও ব্যায়ামের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী সহায়ক উপাদান। আপনি যদি এটি আপনার নিয়মিত রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করতে চান, তবে আপনার বর্তমান সুগারের মাত্রা অনুযায়ী ডোজ ঠিক করতে একজন ডাক্তার বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

তথ্য: হেলথলাইন

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০১: ২৭
বিজ্ঞাপন