
ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর জ্বালানির খোঁজে থাকে। সারা রাতের দীর্ঘ উপবাসের পর মস্তিষ্ক প্রথমেই খুঁজতে থাকে দ্রুত শক্তি পাওয়ার উপায়, আর চিনির চেয়ে দ্রুত শক্তি জোগায় এমন কিছু নেই। তাই সকাল সকাল শরীর নিজে থেকেই আমাদের ফিসফিসিয়ে বলে, “কিছু মিষ্টি খাও, তাড়াতাড়ি!”

সকালে ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই শরীরে কর্টিসল নামের হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই কর্টিসলই আসলে আমাদের জাগিয়ে রাখে এবং সচেতন করে তোলে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি লিভারে গ্লুকোজ উৎপাদনও বাড়ায়, যাতে মস্তিষ্ক কিছুটা শক্তি পায় ঘুমের পর।
সমস্যা হয় এরপর। এই শক্তি বা গ্লুকোজের প্রভাব থাকে খুব অল্প সময়। আপনি যদি ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকক্ষণ কিছু না খান, ইনসুলিন কাজ শুরু করে রক্তে চিনির মাত্রা কমিয়ে ফেলে। ফলাফল। হঠাৎই ক্লান্তি, রাগ, মন খারাপ বা মিষ্টি খাওয়ার প্রবল ইচ্ছে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কর্টিসল শুধু ক্ষুধাই বাড়ায় না, আমাদের স্বাদের অনুভূতিকেও বদলে দেয়। তখন মস্তিষ্ক বেশি পছন্দ করতে শুরু করে ক্যালরি-সমৃদ্ধ, শক্তিদায়ক খাবার। বিশেষ করে মিষ্টি। অর্থাৎ সকালে আপনি যখন স্ট্রেসড বা ঘুম কম হয়, তখন আপনার শরীর নিজেই চিনির দিকে ঠেলে দেয় আপনাকে।
চাপের সময়ে মস্তিষ্ক সবচেয়ে সহজ শক্তির উৎস হিসেবে গ্লুকোজকেই বেছে নেয়। কারণ শরীর স্বয়ংক্রিয়ভাবে, সংকটের সময় দ্রুত শক্তি সংগ্রহ করে। তাই সকালে ক্লান্ত বা মানসিকভাবে চাপে থাকলে এক কাপ কফির সঙ্গে চকলেট ক্রসোঁটা যেন একেবারেই অপ্রতিরোধ্য মনে হয়।

চিনি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে এমন নয়। বরং এমনভাবে খাবার পরিকল্পনা করতে হবে যাতে রক্তে চিনির মাত্রা হঠাৎ বাড়ে না আবার দ্রুত কমেও না যায়। একটু ভারসাম্য রাখলেই এই সকালবেলার চিনির টান অনেকটাই কমে যাবে।
১. ঘুম থেকে ওঠার ৩০-৬০ মিনিটের মধ্যে কিছু খান
প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও ফাইবারযুক্ত নাশতা দিনের শুরুতে রাখুন। যেমন সাওয়ারডো ব্রেডের সঙ্গে পোচড ডিম ও অ্যাভোকাডো, কিংবা দইয়ের সঙ্গে বাদাম ও ফল। এতে রক্তে গ্লুকোজের ওঠানামা কম হবে, দীর্ঘক্ষণ পেট ভরাও থাকবে।
২. খাওয়ার পর কফি পান করুন, আগে নয়
কফি নিজেও কর্টিসল বাড়ায়। তাই খালি পেটে কফি খেলে শরীরে কর্টিসল আরও বেড়ে গিয়ে চিনির ওঠানামা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের হজমে সমস্যা বা উদ্বেগের প্রবণতা আছে, তাঁদের জন্য সকালে খাবারের আগে কফি একদম না খাওয়াই ভালো।

৩. পানি পান করুন, তারপর মিষ্টি খান
শরীরে পানির অভাব অনেক সময় ক্ষুধা বা ক্লান্তির মতো অনুভূতি তৈরি করে। সকালে এক গ্লাস পানি বা ডাবের পানি খেয়ে তারপর খাবার শুরু করুন। এতে শরীরের সংকেতগুলো স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবেন।
৪. ‘নেকেড কার্ব’ খাবেন না
টোস্ট, সিরিয়াল বা শুধু ফলের মতো কার্বোহাইড্রেট খেলে রক্তে চিনি দ্রুত বেড়ে যায়। তাই প্রতিবার কার্বোহাইড্রেটের সঙ্গে প্রোটিন বা ফ্যাট রাখুন। যেমন টোস্টের সঙ্গে আলমন্ড বাটার, বা ফলের সঙ্গে এক টুকরো চিজ। এতে চিনির শোষণ ধীর হবে, স্থিতি থাকবে বেশি সময়।

সকালের মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা কোনো দুর্বলতা নয়। এটা শরীরের ভাষা। কিন্তু সেই ভাষা বোঝারও কৌশল আছে। একটু সচেতনভাবে খাবারের সময় ও উপাদান বদলালেই সকালে “কিছু মিষ্টি চাই” এই ইচ্ছাটা হারিয়ে যাবে। বরং সারা দিন থাকবে স্থিতিশীল শক্তি, পরিষ্কার মন আর একদম প্রাকৃতিক গ্লো।
সূত্র: বিবিসি লাইস্টাইল
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি