মাউথ টেপিং: ঘুমের সময় মুখে টেপ লাগানোর এই অদ্ভুত ট্রেন্ড কি উপকারী নাকি ঝুঁকিপূর্ণ?
শেয়ার করুন
ফলো করুন

নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘মাউথ টেপিং’। ঘুমানোর আগে ঠোঁটে ছোট এক টুকরা টেপ লাগিয়ে ঘুমানোই এই পদ্ধতি। দাবি করা হয়, এতে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস কমে, নাক ডাকা কমে এবং ঘুমের মান ভালো হয়। এমনকি কেউ কেউ মনে করেন, নিয়মিত মাউথ টেপিংয়ে বদলে যেতে পারে মুখের গড়ন বা চোয়ালের আকৃতিও।

আর্লিং হলান্ডও ঘুমানোর সময় এমন পদ্ধতি অনুসরণ করেন—এমন খবর প্রকাশের পর বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে
আর্লিং হলান্ডও ঘুমানোর সময় এমন পদ্ধতি অনুসরণ করেন—এমন খবর প্রকাশের পর বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে

তারকা ফুটবলার আর্লিং হলান্ডও ঘুমানোর সময় এমন পদ্ধতি অনুসরণ করেন—এমন খবর প্রকাশের পর বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এসব দাবির কতটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া উপকারী হলেও ঘুমানোর সময় ঠোঁটে টেপ লাগানো সবার জন্য নিরাপদ বা কার্যকর, এমন প্রমাণ এখনো যথেষ্ট নেই।

বিজ্ঞাপন

নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ঘুমের সময় নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া শরীরের স্বাভাবিক ও উপকারী প্রক্রিয়া। নাক দিয়ে প্রবেশের সময় বাতাস আর্দ্র ও পরিশোধিত হয়। ফলে শ্বাসতন্ত্রে পৌঁছানোর আগে নাক বাতাসকে অনেকটাই প্রস্তুত করে নেয়। যাঁরা অভ্যাসগতভাবে মুখ দিয়ে শ্বাস নেন—বিশেষ করে নাক বন্ধ থাকা বা অন্য কোনো কারণে যাদের এ অভ্যাস তৈরি হয়েছে—তাঁদের ক্ষেত্রে নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে।

ঠোঁটে টেপ লাগিয়ে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ঘুমের সময় নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া হয়
ঠোঁটে টেপ লাগিয়ে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ঘুমের সময় নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া হয়

মাউথ টেপিংয়ের ধারণাটিও মূলত এখান থেকেই এসেছে। ঠোঁটে টেপ লাগিয়ে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ঘুমের সময় নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া হয়।কিন্তু নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া উপকারী—এ কথা থেকে এমনটা বলা যায় না যে ঠোঁটে টেপ লাগিয়ে নাক দিয়ে শ্বাস নিতে বাধ্য করাও সবার জন্য উপকারী।

বিজ্ঞাপন

মাউথ টেপিং নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কতটা শক্ত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার উপকারিতা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা থাকলেও শুধু মাউথ টেপিং ঘুমের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করে, এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো সীমিত।

শুধু মাউথ টেপিং ঘুমের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করে, এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো সীমিত
শুধু মাউথ টেপিং ঘুমের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করে, এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো সীমিত

নাক দিয়ে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়া এবং ঠোঁটে টেপ লাগিয়ে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার পথ বন্ধ করে নাক দিয়ে শ্বাস নিতে বাধ্য করা—দুটি বিষয় এক নয়। এখন পর্যন্ত যেসব গবেষণা হয়েছে, তার বড় অংশ নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে। মুখ বন্ধ রাখার জন্য টেপ ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে কম। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাউথ টেপিংকে নিশ্চিতভাবে ভালো ঘুমের সমাধান হিসেবে তুলে ধরা ঠিক নয়।

নাক বন্ধ থাকলে হতে পারে বিপদ

মাউথ টেপিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো নাক দিয়ে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না করা। কারও যদি দীর্ঘদিন নাক বন্ধ থাকে, নাকের ভেতরে কোনো বাধা থাকে, অ্যালার্জির সমস্যা থাকে অথবা অন্য কোনো কারণে নাক দিয়ে সহজে শ্বাস নিতে না পারেন, তাহলে ঘুমের সময় মুখ বন্ধ করে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

মাউথ টেপিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো নাক দিয়ে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না করা
মাউথ টেপিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো নাক দিয়ে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না করা

কারণ ঘুমের মধ্যে নাক হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া শরীরের একটি স্বাভাবিক বিকল্প ব্যবস্থা। ঠোঁটে টেপ লাগানো থাকলে সেই বিকল্প পথটিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে ভালো ঘুমের জন্য ব্যবহার করা পদ্ধতিই উল্টো ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

নাক ডাকা বন্ধ করতে মুখে টেপ?

মাউথ টেপিং জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ নাক ডাকা। অনেকের ধারণা, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া বন্ধ করতে পারলে নাক ডাকাও কমবে। কিন্তু নাক ডাকা সব সময় সাধারণ কোনো অভ্যাস নয়। কখনো কখনো এটি ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলে শুধু মুখে টেপ লাগিয়ে নাক ডাকা বন্ধ করার চেষ্টা করা উচিত নয়। স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন ক্ষেত্রে মাউথ টেপিং মূল সমস্যাটিকে আড়াল করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি হতে পারে।

মুখের গড়ন বদলানোর দাবি কতটা সত্য?

মাউথ টেপিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও একটি দাবি বেশ জনপ্রিয়—এতে নাকি চোয়ালের আকৃতি বা মুখের সৌন্দর্যে পরিবর্তন আসে। তবে এই দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। শুধু ঘুমানোর সময় ঠোঁটে টেপ লাগানোর মাধ্যমে মুখের গড়ন বদলে যাবে বা চোয়ালের আকৃতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে—এমন ধারণাকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বলা যায় না। ওয়েলনেস ট্রেন্ড হিসেবে কোনো পদ্ধতি জনপ্রিয় হলেই তার সঙ্গে যুক্ত সব দাবি সত্যি হয়ে যায় না। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার চেয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

বলা হয়, মাউথ টেপিং করলে নাকি চোয়ালের আকৃতি বা মুখের সৌন্দর্যে পরিবর্তন আসে
বলা হয়, মাউথ টেপিং করলে নাকি চোয়ালের আকৃতি বা মুখের সৌন্দর্যে পরিবর্তন আসে

কারা মাউথ টেপিং এড়িয়ে চলবেন?

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী, নিচের সমস্যাগুলো থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মাউথ টেপিং করা উচিত নয়—

স্লিপ অ্যাপনিয়া রয়েছে বা এ সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা আছে

দীর্ঘদিন নাক বন্ধ থাকে

অ্যালার্জির কারণে নাক দিয়ে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়

নাকের ভেতরে বাতাস চলাচলে বাধা রয়েছে

অন্য কোনো কারণে স্বাভাবিকভাবে নাক দিয়ে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়

এসব ক্ষেত্রে নিজের মতো করে মুখে টেপ লাগিয়ে ঘুমানোর বদলে প্রথমে সমস্যাটির কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।

তাহলে মাউথ টেপিং কি একেবারেই নয়?

মাউথ টেপিংকে একেবারে অকার্যকর বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এটিকে সবার জন্য নিরাপদ ও প্রমাণিত ঘুমের সমাধান ভাবাও ঠিক নয়। আপনি যদি নিয়মিত মুখ দিয়ে শ্বাস নেন, নাক ডাকেন কিংবা ঘুম থেকে উঠে ক্লান্ত বোধ করেন, তাহলে প্রথমে বোঝা দরকার এর পেছনে কোনো শারীরিক কারণ আছে কি না। নাক বন্ধ থাকা, অ্যালার্জি, নাকের ভেতরের গঠনগত সমস্যা কিংবা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো কারণ থাকলে সঠিক চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

মাউথ টেপিংকে অকার্যকর বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এটিকে সবার জন্য নিরাপদ ভাবাও ঠিক নয়
মাউথ টেপিংকে অকার্যকর বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এটিকে সবার জন্য নিরাপদ ভাবাও ঠিক নয়

ভালো ঘুমের জন্য তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় কোনো কৌশল অনুসরণ করার আগে নিজের শরীরের সংকেত বোঝা জরুরি। মুখে টেপ লাগিয়ে ঘুমানো দেখতে সহজ একটি ওয়েলনেস কৌশল হতে পারে। কিন্তু শ্বাস নেওয়ার মতো মৌলিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ‘ট্রেন্ডি’ হওয়ার চেয়ে নিরাপদ থাকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ৩০
বিজ্ঞাপন