ঝাল খাবার খেলে শরীরের ভেতরে আসলে কী ঘটে?
শেয়ার করুন
ফলো করুন

মরিচের ঝালের জন্য দায়ী প্রধান উপাদান হলো ক্যাপসাইসিন। এই উপাদান শরীরের তাপ ও ব্যথা অনুভবকারী নির্দিষ্ট স্নায়ুগ্রাহকের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে মস্তিষ্ক এমন একটি সংকেত পায়, যেন শরীরের ওই জায়গায় অতিরিক্ত তাপ বা জ্বালাপোড়া তৈরি হয়েছে। ঝাল খাওয়ার পর যে ‘আগুন’ অনুভূত হয়, সেটি বাস্তব আগুনে পোড়ার মতো নয়। ক্যাপসাইসিন মূলত শরীরের ব্যথা ও তাপ অনুভবের ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে। তাই ব্যথাটা সত্যি, অস্বস্তিটাও সত্যি, কিন্তু সেখানে আগুনে পুড়ে যাওয়ার মতো তাপজনিত ক্ষত তৈরি হওয়া জরুরি নয়। এই কারণেই ঝাল মরিচ খাওয়ার পর অনেকের ঘাম হয়, নাক দিয়ে পানি পড়ে, হৃদস্পন্দন কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। শরীর যেন হঠাৎ পাওয়া সেই সংকেতের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।

তাহলে ঝাল খেয়ে ভালো লাগে কেন?

আমাদের মস্তিষ্ক মজার এক কারণে আমরা ঝালের তীব্রতা অনুভব করি।  ব্যথা বা অস্বস্তির প্রতিক্রিয়ায় শরীর কিছু প্রাকৃতিক রাসায়নিক, বিশেষ করে এন্ডোরফিন, নিঃসরণ করতে পারে। এগুলো শরীরের স্বাভাবিক ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও ভালো লাগার অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ঝাল খাবার খাওয়ার পর কারও কারও মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা বা ভালো লাগা তৈরি হয়। প্রথমে চোখে পানি এলেও কিছুক্ষণ পর আবার মরিচের দিকে হাত বাড়ানোর পেছনে এই অনুভূতিও ভূমিকা রাখতে পারে। ঝালপ্রিয় মানুষের কাছে তাই ঝাল শুধু স্বাদের বিষয় নয়, এক ধরনের অনুভূতির অভিজ্ঞতাও।

পেটে গিয়ে কী করে ক্যাপসাইসিন?

Kevin yung

মুখে ঝালের অনুভূতি তৈরি হলেও ক্যাপসাইসিনের প্রভাব সেখানেই শেষ হয় না। পরিপাকতন্ত্রেও এটি বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অন্ত্রের চলাচল দ্রুততর হওয়ার মতো অনুভূতি হতে পারে।একারণে খুব ঝাল খাবার খাওয়ার পর কারও কারও দ্রুত বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। মলত্যাগের সময়ও ঝাল বা জ্বালাপোড়ার অনুভূতি হতে পারে। এর পেছনেও ক্যাপসাইসিনের একই ধরনের স্নায়বিক প্রভাব কাজ করতে পারে।  মরিচ খাওয়ার পর মুখে যে ঝাল অনুভব করি, শরীরের নিচের দিকেও তার কিছুটা পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ঝাল খাবার কি পেটে আলসার করে?

ঝাল খাবার নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি হলো, বেশি ঝাল খেলেই নাকি পাকস্থলীতে আলসার হয় কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। পাকস্থলীর আলসারের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি বা এইচ. পাইলোরি নামের একটি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যথানাশক ওষুধের ঘন ঘন ব্যবহার। তাই শুধু ঝাল খাবারকে আলসারের মূল কারণ হিসেবে দায়ী করা ঠিক নয়। ক্যাপসাইসিন পাকস্থলীর আবরণে কিছু প্রতিরক্ষামূলক প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ক্যাপসাইসিনের কিছু জীবাণুরোধী বৈশিষ্ট্যও গবেষণায় দেখা গেছে। তবে এসব সম্ভাব্য উপকারকে ঝাল খাবারকে কোনো রোগের চিকিৎসা হিসেবে দেখার কারণ নেই।

তবে সবার শরীর ঝাল একইভাবে নেয় না, এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো ব্যক্তিভেদে ঝালের সহনশীলতা আলাদা। যাদের পাকস্থলী বা পরিপাকতন্ত্র আগে থেকেই সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে ঝাল খাবার অস্বস্তি বাড়াতে পারে। বুকজ্বালা, অম্লতা, পেটে জ্বালাপোড়া কিংবা পেটের অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অন্ত্রের সমস্যার উপসর্গও ঝাল খাবারে বেড়ে যেতে পারে। তাই ঝাল খাবার আলসার তৈরি না করলেও আগে থেকেই থাকা কোনো সমস্যা বা সংবেদনশীলতার কারণে অস্বস্তি বাড়িয়ে দিতে পারে। এখানে শরীরের নিজের সংকেতটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একদিন ঝাল খেয়ে সামান্য অস্বস্তি হওয়া আর প্রতিবার ঝাল খেলেই পেটে জ্বালা, ব্যথা বা বুকজ্বালা হওয়া এক বিষয় নয়।

ঝাল খেলে কি বিপাকক্রিয়া বাড়ে?

ক্যাপসাইসিনকে ঘিরে বিপাকক্রিয়া বা শক্তি ব্যয়ের ওপর প্রভাব নিয়েও বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় সাময়িকভাবে বিপাকক্রিয়ায় সামান্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা গেছে। মরিচে ভিটামিন সি ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও থাকে। নিয়মিত মরিচ খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্স্বাস্থ্যসহ কিছু স্বাস্থ্যগত সুবিধার সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়েও গবেষণা চলছে। তবে এসব তথ্যের অর্থ এই নয় যে বেশি ঝাল খেলেই ওজন কমবে বা রোগ প্রতিরোধ হবে।

একটি খাবারের উপকারিতা বিচার করতে হলে পুরো খাদ্যাভ্যাস, পরিমাণ এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিতে হয়।

বিজ্ঞাপন

ঝাল খাওয়ার অভ্যাস কি সত্যিই তৈরি হয়?

হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রেই ঝাল সহ্য করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। নিয়মিত ঝাল খাবার খেলে ক্যাপসাইসিনের প্রতি শরীরের কিছু ব্যথা ও তাপ অনুভূতকারী স্নায়ুগ্রাহকের প্রতিক্রিয়া কমে আসতে পারে। ফলে যে ঝাল একসময় অসহ্য মনে হতো, পরবর্তীতে সেটিই তুলনামূলক সহজে খাওয়া সম্ভব হয়। তাই একজনের কাছে যে মরিচে চোখে পানি চলে আসে, আরেকজন হয়তো সেটি দিব্যি খেয়ে ফেলেন, এটি শুধু সাহসের বিষয় নয়, শরীরের অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তাহলে ঝাল খাবার খাবেন কি না?

Markus Winkler

সুস্থ মানুষের জন্য পরিমিত ঝাল খাবার সাধারণত খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। মরিচ নিজে কোনো ‘খারাপ’ খাবার নয়। বরং স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি এতে ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে। তবে ঝাল খেলেই যদি নিয়মিত বুকজ্বালা, পেটের অস্বস্তি, ব্যথা বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে শুধু সহ্যশক্তি বাড়ানোর জন্য ঝাল খেয়ে যাওয়া ঠিক নয়। পরিমাণ কমিয়ে শরীরের প্রতিক্রিয়া দেখা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো। সবশেষে বলা যায়, ঝাল খাবার খেয়ে যে আগুনের অনুভূতি হয়, তা শরীরের ভেতরে সত্যিকারের আগুন জ্বলে ওঠার গল্প নয়। মরিচের ক্যাপসাইসিন আমাদের ব্যথা ও তাপ অনুভবের ব্যবস্থাকে এমনভাবে সক্রিয় করে যে মস্তিষ্ক বিপদের সংকেত পায়। সেই সংকেত থেকেই আসে ঝাল, জ্বালাপোড়া, ঘাম, অস্বস্তি, আবার অনেকের ক্ষেত্রে এক ধরনের আনন্দও।

ঝাল আদতে স্বাদ, স্নায়ু, মস্তিষ্ক এবং শরীরের প্রতিক্রিয়ার এক অদ্ভুত মিথস্ক্রিয়া।

ছবি: পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন