
ওজন কমার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের শক্তির চাহিদাতেও পরিবর্তন আসে। ফলে শুরুতে যে খাবার ও ব্যায়ামের রুটিনে ভালো ফল মিলছিল, কিছুদিন পর সেটিই একই রকম ফল নাও দিতে পারে।

ওজন কমানোর প্রথম কয়েক সপ্তাহে শরীরে জমে থাকা গ্লাইকোজেনের পরিমাণ কমতে থাকে। গ্লাইকোজেনের সঙ্গে পানি জমা থাকে, তাই এটি কমলে শরীরের পানির পরিমাণও কমে যায়। ফলে শুরুতেই দাঁড়িপাল্লায় বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। এর সঙ্গে কিছুটা চর্বিও কমে, তবে চর্বি কমার গতি সাধারণত তুলনামূলক ধীর। অর্থাৎ, প্রথম দিকে যে ওজন কমছে তার পুরোটাই কিন্তু চর্বি নয়। শরীরের অতিরিক্ত পানিও এই দ্রুত পরিবর্তনের একটি অংশ।

একজন মানুষের ওজন যত বেশি, তার শরীরকে নড়াচড়া করাতে তত বেশি শক্তি প্রয়োজন হয়। হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা কিংবা প্রতিদিনের সাধারণ কাজেও বেশি ক্যালরি খরচ হয়। কিন্তু কয়েক কেজি ওজন কমে গেলে একই কাজ করতে আগের চেয়ে কম শক্তি লাগে। এমনকি বিশ্রামের সময়ও শরীর তুলনামূলক কম শক্তি খরচ করতে শুরু করে।
ধরা যাক, কারও ওজন আগে ছিল ৯০ কেজি, পরে তা কমে হয়েছে ৮০ কেজি। দু’সময় একই গতিতে হাঁটলেও ৮০ কেজি ওজনের শরীর তুলনামূলক কম ক্যালরি খরচ করবে। তাই শুরুতে যে খাবারের পরিমাণে ওজন দ্রুত কমছিল, পরে একই খাবার হয়তো তেমন ঘাটতি তৈরি করছে না।

এখানেই শেষ নয়। ওজন কমানোর সময় ক্ষুধা ও পেট ভরা থাকার অনুভূতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। শরীরের ক্ষুধা ও তৃপ্তি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনগুলো এই সময়ে ভিন্নভাবে কাজ করতে পারে। ফলে আগের মতো একই খাবার খেলেও পেট ভরা অনুভূতি কম হতে পারে। এর সঙ্গে ঘুমের অভাব ও দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ যোগ হলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে অস্বাস্থ্যকর ও বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপও খাওয়ার অভ্যাসে প্রভাব ফেলতে পারে।

ওজন কমা থেমে গেছে মনে হলেও শরীরে পরিবর্তন চলতে পারে। শরীরের পানির পরিমাণ, লবণ খাওয়া, কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ কিংবা হজমের অবস্থার কারণে প্রতিদিনের ওজনে কিছুটা ওঠানামা হওয়াই স্বাভাবিক। নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক চক্রের সঙ্গে সাময়িক পানি জমার কারণেও ওজন বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত স্ট্রেংথ ট্রেনিং করলে শরীরে পেশি তৈরি বা ধরে রাখা সম্ভব, একই সময়ে চর্বি কমতেও পারে। ফলে কোমরের মাপ কমলেও দাঁড়িপাল্লায় খুব বেশি পরিবর্তন নাও দেখা যেতে পারে। তাই ওজনের পাশাপাশি কোমরের মাপ, শারীরিক শক্তি, দৈনন্দিন নড়াচড়া, রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মতো বিষয়ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ভালো ছবি দিতে পারে।

ওজন কমানোর একটি পর্যায়ে এসে আগের রুটিনে ছোটখাটো পরিবর্তন আনা জরুরি হতে পারে। শরীরের ওজন কমার সঙ্গে সঙ্গে খাবার ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনাও নতুন করে দেখা দরকার। খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওজন কমানোর সময় এটি পেশি ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি শাকসবজি, ফল, ডাল ও পূর্ণ শস্য থেকে পর্যাপ্ত ফাইবার পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
শুধু হাঁটার ওপর নির্ভর না করে স্ট্রেংথ ট্রেনিং যোগ করা যেতে পারে। নিয়মিত হাঁটা ও অন্যান্য নড়াচড়াও দৈনিক শক্তি খরচ বাড়াতে সাহায্য করে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ওজন একই জায়গায় থাকলে খাবারের পরিমাণ বা পোরশনও নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার হতে পারে।

ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য থাকা জরুরি। সবার জন্য একই ‘আদর্শ’ ওজন নেই। শরীরের গঠন, কোমরের মাপ, বয়স, বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর স্বাস্থ্যকর ওজন নির্ভর করে। তাই দাঁড়িপাল্লায় সবচেয়ে কম সংখ্যাটি দেখাই সবসময় সেরা লক্ষ্য নয়।

একই জায়গায় ওজন আটকে গেলে হতাশ হয়ে হঠাৎ খুব কম খাওয়া বা চরম ডায়েটে চলে যাওয়া সমাধান নয়। দীর্ঘদিন ওজন কমার গতি থেমে থাকলে এর পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। থাইরয়েডের সমস্যা, কিছু ওষুধ, ঘুমের সমস্যা কিংবা হরমোনজনিত কারণ ওজন নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কারণটি খুঁজে বের করাই নিরাপদ পথ।
ওজন কমানোর যাত্রায় তাই প্রথম কয়েক কেজি দ্রুত কমে যাওয়াকে যেমন সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি ভাবা ঠিক নয়, তেমনই পরের কয়েক কেজি ধীরে কমছে বলে হতাশ হওয়ারও কারণ নেই। শরীর বদলালে তার প্রয়োজনও বদলায়। সঠিক খাবার, নিয়মিত নড়াচড়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রুটিনে ছোট পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে সুস্থভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণের পথটা সেখানেই।
সূত্র: হেলথলাইনডটকম
ছবি: এআই