
বেশি বয়সে মা হওয়া নিয়েই যত কথা হয়। এদিকে পুরুষেরা অহরহই বাবা হচ্ছেন ৬০-৮০ বছর বয়সে। তারকাদের ক্ষেত্রেও এমন সব সংবাদ চোখে পড়ে আমাদের। হলিউডের রবার্ট ডি নিরো আশির পরে বাবা হয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। আমাদের দেশেও এমন উদাহরণ খুবই কমন। তবে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে মার্কিন ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথের নতুন বক্তব্য।

বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক স্টাডিতে দেখা গেছে, মানুষের ডিম্বাণু বা এগ বয়সজনিত জিনগত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সহনশীল, যেখানে পুরুষদের শুক্রাণুর মান সময়ের সঙ্গে ক্রমাগতভাবে কমে যায়। এই আবিষ্কারটি দীর্ঘদিনের মানসিকতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়, যে বয়স-সম্পর্কিত বন্ধ্যত্ব মূলত নারীদের জৈব ঘড়ির কারণে ঘটে। আর পুরুষেরা শেষ বয়স পর্যন্ত তারুণ্যময় থাকেন।
মানব ডিম্বাণুর সহনশীলতা
২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের বয়স বাড়লেও ডিম্বাণুতে খুব কম জিনগত পরিবর্তন ঘটে। বিপরীতে, শুক্রাণু কোষে পরিবর্তন অনেক বেশি হয়।

জিনগত সুরক্ষা ব্যবস্থা
ডিম্বাণু (oocyte)বহু বছর ধরে ডিম্বাশয়ে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে, এবং এগুলোর ভেতরে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মতো কারণ থেকে জিনগত ক্ষতি প্রতিরোধ করে।
স্থিতিশীল মাইটোকন্ড্রিয়া
আরেকটি গবেষণা (অক্টোবর ২০২৫) বলছে, ডিম্বাণুর মাইটোকন্ড্রিয়া, যা কোষের শক্তিকেন্দ্র, বছরের পর বছর স্থিতিশীল থাকে। যদিও বয়সের সঙ্গে নারীদের প্রজনন ক্ষমতা অন্য কারণে হ্রাস পায়, ডিম্বাণু আসলে অনেক বেশি শক্তিশালী।
শুক্রাণুর মান ও পুরুষ প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস
ডিম্বাণুর বিপরীতে শুক্রাণু সারা জীবন ধরে নতুন করে তৈরি হয়। এই ক্রমাগত পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সময়ের সঙ্গে জিনগত ত্রুটি জমতে থাকে। ফলে বয়স্ক পুরুষদের শুক্রাণুতে ডিএনএ পরিবর্তন ও ভাঙনের হার বেশি দেখা যায়। এই গবেষণায় এমন ৫টি জটিলতার কথা বলা হচ্ছে।
১. বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরুষদের বীর্যের পরিমাণ কমতে থাকে
২. শুক্রাণুর সাঁতার দেওয়ার ক্ষমতা আগের মতো থাকে না বেশি বয়সে
৩. স্বাভাবিক আকারের শুক্রাণুর সংখ্যা কমতে থাকে একটা বয়সের পরে
৪. সন্তানের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি: বয়সজনিত শুক্রাণুর মানহ্রাস অটিজম ও স্কিজোফ্রেনিয়ার মতো বিকাশজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
৫. এছাড়া, বয়স্ক পিতাদের ক্ষেত্রে শুক্রানুর মিউটেশনের কারণে গর্ভাবস্থার জটিলতার ঝুঁকিও বেশি।

এই নতুন তথ্যগুলো দেখায় যে জৈব ঘড়ি শুধু নারীদের জন্য নয়, পুরুষদের জন্যও টিকটিক করে চলতে থাকে সময়ের সঙ্গে, যদিও ভিন্নভাবে।নারীদের ক্ষেত্রে বয়সজনিত সমস্যা বেশি দেখা যায় কোষ বিভাজনের সময় ক্রোমোজোম ত্রুটির কারণে। পুরুষদের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয় শুক্রাণুর জিনে ধীরে ধীরে জমা হওয়া পরিবর্তনের কারণে।
বয়স ও সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি
২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরুষদের শুক্রাণুর মান ও ডিএনএর ক্ষতির পরিমান বাড়লেও নারীর ডিম্বাণু অনেক সময় এই ক্ষতি মেরামত করতে সক্ষম হয়, ফলে প্রাথমিক ভ্রূণ বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা কমে।তবে, ৪৫ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে আইভিএফ বা এআরটি প্রক্রিয়ায় সফল গর্ভধারণ ও জীবিত শিশুর জন্মের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

নারীদের বয়সজনিত বন্ধ্যত্বের মূল কারণ শুধু ডিএনএ পরিবর্তন নয়, আরও অনেক জৈব প্রক্রিয়া এর সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু নতুন গবেষণার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, পুরুষের বয়স সন্তানের জিনগত গুণমানের ওপর আগের ধারণার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। তাই, যারা দেরিতে সন্তান নেওয়ার কথা ভাবছেন, তাঁদের উভয়েরই বয়সজনিত প্রজনন পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
সূত্র: এনএইএইচ (ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ) জার্নাল, সিএনএন
ছবি: জেমিনাই ন্যানো বানানা এআই